২৫ নভেম্বরের হিমেল বাতাসে যখন বিশ্বজুড়ে নারী নির্যাতন প্রতিরোধের কমলা রঙের বার্তা ছড়িয়ে পড়ছে, তখন বাংলাদেশের হাজারো বন্ধ দরজার ওপাশে গুমরে মরছে নারীর কান্নার শব্দ। ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টে আমরা ২০২৫ সালে পা রেখেছি এবং উন্নয়নের মহাসড়কে হাঁটছি। কিন্তু নারীর জন্য এই বদ্বীপ আজও নিরাপদ হয়নি। প্রগতির মোড়কে আমরা শুধু সহিংসতার ধরন বদলেছি মাত্র। সরকারি খাতা বা মানবাধিকার সংস্থার ফাইলে বন্দি হাজারো পরিসংখ্যান শুধু সংখ্যা নয় বরং প্রতিটি সংখ্যা একেকটি দীর্ঘশ্বাস এবং ভেঙে যাওয়া স্বপ্ন আর রাষ্ট্র বা সমাজের কাছে হেরে যাওয়া একেকটি জীবন।
শৈশব থেকে মেয়েদের শেখানো হয় ঘরই নারীর সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়। কিন্তু নির্মম বাস্তবতা সেই মিথকে চূর্ণ করে দেয়। ২০২৪ সালের মাত্র প্রথম সাত মাসেই স্বামীর হাতে খুন হয়েছেন ১৩৩ জন নারী। যে হাত ভালোবাসার স্পর্শ দেওয়ার কথা সেই হাতই যখন প্রাণ কেড়ে নেয় তখন আস্থার ভিত্তি ধসে পড়ে। টাঙ্গাইলের সখীপুরের কাকলি আক্তার জানতেন না যে তার সন্তানদের সামনেই তাকে রক্তাক্ত হতে হবে জীবনসঙ্গীর হাতে। যৌতুকের অভিশাপ আর পুরুষতান্ত্রিক আধিপত্যের জাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে ২০২৩ সালে যে ৬৪ জন নারী প্রাণ দিলেন তাদের দায় কেউ নেয়নি।
এই ঘনঘোর অন্ধকারের বিপরীতে পাঁচ দশক ধরে অবিচল প্রহরীর মতো দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ। নারীর প্রতি সহিংসতার বিরুদ্ধে এই সংগঠনটি শুধু একটি নাম নয় বরং এক নিরন্তর আন্দোলনের প্রতিচ্ছবি। যখন সমাজ আক্রান্ত নারীকে কলঙ্কিত আখ্যা দিয়ে একঘরে করে দেয় তখন মহিলা পরিষদই ভুক্তভোগীর হাত ধরে আদালতের বারান্দায় কড়া নাড়ে। সহিংসতা দমনে রাষ্ট্রের পাশাপাশি যে সামাজিক শক্তির প্রয়োজন মহিলা পরিষদ তা জিইয়ে রেখেছে তৃণমূল পর্যায় থেকে। কেবল বিবৃতি দেওয়াই নয়, আসকের পাশাপাশি তারাও নিয়মিত সহিংসতার পরিসংখ্যান প্রকাশ করে রাষ্ট্রের চোখের সামনে আয়না তুলে ধরছে। পারিবারিক নির্যাতন প্রতিরোধ ও সুরক্ষা আইন এবং বহুপ্রতীক্ষিত অভিন্ন পারিবারিক আইন প্রণয়নের দাবিতে তাদের আন্দোলন আজও রাজপথে সরব। ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালে যখন বিচারহীনতার সংস্কৃতি জেঁকে বসেছে তখন মহিলা পরিষদের আইনজীবীরা হাজারো অসহায় নারীর জন্য বিনামূল্যে আইনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। মূলত তাদের এই নিরলস চাপ প্রয়োগের ফলেই অনেক চাঞ্চল্যকর মামলা ধামাচাপা পড়ে যাওয়া থেকে রক্ষা পেয়েছে।
প্রযুক্তির উৎকর্ষ আমাদের বিশ্বকে হাতের মুঠোয় এনেছে কিন্তু নারীর জন্য তৈরি করেছে নতুন এক নরক। সাইবার স্পেসে সহিংসতার শিকার ৯৭ শতাংশই নারী ও শিশু। রাজশাহীর সেই তরুণীর কথা ভাবা যায়, যার ব্যক্তিগত মুহূর্তের ছবি ছড়িয়ে দিয়ে ব্ল্যাকমেইল করা হয়েছিল। ডিজিটাল এই সহিংসতা নারীকে কোণঠাসা করে ফেলছে এবং বাধ্য করছে নিজেকে গুটিয়ে নিতে।
অন্যদিকে বিচার ব্যবস্থা যেন এক গোলকধাঁধা। মাগুরার শিশু আছিয়া ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় আদালত মাত্র ২১ দিনে রায় দিয়ে এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে সত্য কিন্তু এটি নিয়ম নয় বরং ব্যতিক্রম। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে চিত্রটি পিরোজপুরের শিশু ফাতেমার মতো।
ধর্ষণের পর হত্যা এবং এরপর নিম্ন আদালতে মৃত্যুদণ্ড হলেও উচ্চ আদালতে গিয়ে সেই সাজা কমে যায়। এই দীর্ঘসূত্রতা অপরাধীদের আস্ফালনকে আরও বাড়িয়ে দেয়। তার ওপর পারিবারিক সহিংসতার ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক মধ্যস্থতার নতুন আইনি বিধান নারীর ন্যায়বিচার প্রাপ্তির পথকে আরও সংকুচিত করেছে বলে মনে করেন নারী নেত্রীরা।
আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবসে আমাদের অঙ্গীকার শুধু সভা বা সেমিনারে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের এই রক্তমাখা অধ্যায়গুলো আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে গলদটা আসলে শিকড়ে। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ এবং অন্যান্য মানবাধিকার সংগঠনের মশাল হাতে এগিয়ে চলা আমাদের পথ দেখাচ্ছে, কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছাতে হলে প্রয়োজন সামষ্টিক জাগরণ। পুলিশ থেকে বিচারক এবং শিক্ষক থেকে অভিভাবক অর্থাৎ প্রত্যেককে জেন্ডার সংবেদনশীলতার চশমায় পৃথিবীকে দেখতে হবে। যেন এমন এক সমাজ গড়া যায় যেখানে নারীকে তার পোশাক বা তার রাতবিরেতে চলাফেরা কিংবা তার কণ্ঠস্বরের জন্য কোনো কৈফিয়ত দিতে হবে না।
বিচারহীনতার এই আদিম সংস্কৃতি নিপাত যাক আর নারীর পৃথিবী হয়ে উঠুক শরতের আকাশের মতোই নির্মল ও নির্ভীক। যেখানে কোনো সংকোচ ছাড়াই নারী হেঁটে যাবে দিগন্তের পথে আর তার পায়ের আওয়াজে কেঁপে উঠবে না কোনো শঙ্কার দেয়াল বরং রচিত হবে সমতা ও সম্মানের এক নতুন ভোরের উপাখ্যান।
/এস লুপিন
.jpg)