বরিশালের নরোত্তমপুর গ্রামের কোলঘেঁষা সবুজ প্রকৃতির মাঝে ১৮৯৭ সালের ১৮ নভেম্বর জন্মেছিলেন মনোরমা রায়। যিনি পরবর্তী সময়ে ‘মনোরমা বসু মাসিমা’ নামে পরিচিত হন। দারিদ্র্য, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার অভাব কিংবা পারিবারিক সীমাবদ্ধতা কোনো কিছুই তার অদম্য মানসিক শক্তি ও সমাজ পরিবর্তনের তাগিদকে রুখতে পারেনি।
জীবনের প্রথম থেকেই তিনি বঞ্চনা, অন্যায়, নিপীড়ন দেখেছিলেন এবং এই অভিজ্ঞতাই তাকে এক কঠোর সংগ্রামী নারী হিসেবে গড়ে তুলেছিল। মাত্র আট বছর বয়সে স্বদেশি আন্দোলনের ‘হলুদ রাখি’ হাতে বেঁধে এবং ১১ বছরে ক্ষুদিরামের আত্মবলিদান দেখে তিনি রাজনীতির প্রতি আকৃষ্ট হন, যা পরবর্তী জীবনে তাকে বাংলার অন্যতম সংগ্রামী নারী-অধিকার নেত্রী হিসেবে প্রতিষ্ঠা দেয়।
১৪ বছর বয়সে মনোরমার বরিশালের বিপত্নীক জমিদার চিন্তাহরণ বসুর সঙ্গে বিয়ে হয়। কিন্তু এই বিবাহ তার পথ রুদ্ধ করেনি। বরং স্বামীর সমর্থন তাকে স্বদেশি আন্দোলন, রাজনৈতিক কর্মসূচি ও সমাজসেবার কাজে আরও এগিয়ে দেয়। তিনি বুঝেছিলেন, নারীর ক্ষমতায়ন ও স্বনির্ভরতা ছাড়া স্বাধীনতার স্বপ্ন বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। এই উপলব্ধি থেকেই তিনি বরিশালে গড়ে তোলেন ‘মাতৃমন্দির আশ্রম’, যেখানে অনাথ, নিপীড়িত ও দুস্থ নারীরা আশ্রয় পেতেন। নারীদের জন্য এটি শুধু নিরাপদ ঠিকানা ছিল না; ছিল শিক্ষা, কাজ শেখা, পুনর্বাসন ও আত্মমর্যাদা ফিরে পাওয়ার কেন্দ্র।
১৯২১-২২ সালের খদ্দর আন্দোলনে নারীদের চরকা শেখানো থেকে শুরু করে নিজের গহনা মহাত্মা গান্ধীর তহবিলে দান করেন মনোরমা বসু। তিনি স্বদেশি আন্দোলনের এক সাহসী মুখ। সরোজনলিনী দত্তের স্মরণে প্রতিষ্ঠিত ‘সরোজনলিনী মহিলা সমিতি’র বরিশাল শাখা তিনিই প্রথম গঠন করেন, যা ছিল এ অঞ্চলের প্রথম সংগঠিত নারী আন্দোলনের প্ল্যাটফর্ম। নারীরা তখনো ঘরছাড়া হতে দ্বিধায় ভুগত; সেখানে মনোরমা নারীদের ঘরে ঘরে গিয়ে সংগঠিত করেছেন, নেতৃত্ব দিয়েছেন, তাদের রাজনৈতিক চেতনায় উজ্জীবিত করেছেন।
১৯৩২ সালে আইন অমান্য আন্দোলনে অংশ নিয়ে তিনি ছিলেন প্রথম কারাবরণকারী তিন নারী নেত্রীর একজন। বহরমপুর জেলে তার সহবন্দি ছিলেন উর্মিলা দেবী ও জ্যোতির্ময়ী দেবী- এখানে তিনি আরও দৃঢ় রাজনৈতিক দীক্ষা লাভ করেন। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, নারীমুক্তি, প্রান্তিক মানুষের অধিকার ও সামাজিক পুনর্বাসনের কাজে তিনি নিজের সবটুকু শক্তি নিয়োজিত করেন।
তিরিশের দশকের শেষে তিনি যুক্ত হন কমিউনিস্ট পার্টিতে। ১৯৪৩-৪৪ সালের দুর্ভিক্ষে লঙ্গরখানা, উদ্ধার আশ্রম, চিকিৎসাকেন্দ্র গঠন করে হাজারো মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। ১৯৪৮ সালে বরিশালের খাদ্য আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য তিনি এক বছর সশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করেন এবং পরে জননিরাপত্তা আইনে আরও তিন বছর বন্দি থাকেন। বারবার কারাবরণ সত্ত্বেও তার সংগ্রাম থামেনি। বরং তিনি কারাগারের ভেতরেও সংগঠন গড়েছেন, বন্দিদের শিক্ষার ব্যবস্থা করেছেন- এ যেন দেশের প্রতিটি প্রান্তে নীরব বিপ্লবের প্রহরী।
স্বামী চিন্তাহরণ বসুর মৃত্যুর পর কিছুদিন নীরব থাকলেও দ্রুতই তিনি কাজে ফিরে আসেন। মাতৃমন্দিরের কাজ, নারী শিক্ষা, সামাজিক পুনর্বাসন ও সাংগঠনিক কার্যক্রমে তিনি নিজেকে আরও গভীরভাবে জড়িয়ে ফেলেন। ১৯৬২, ১৯৬৪ ও ১৯৬৯ সালের গণ-আন্দোলনে নারীদের সংগঠিত করতে তার নেতৃত্ব ছিল প্রশংসনীয়। আর ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে মনোরমা বসু ছিলেন বরিশালের অন্যতম অগ্রগামী নারী নেত্রী।
মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী বাংলাদেশেও তিনি থেমে থাকেননি। বরিশালে গড়ে তোলেন আদর্শ প্রাথমিক বিদ্যালয়, পল্লিকল্যাণ অমৃত পাঠাগার ও শিশুদের জন্য ‘মুকুল মিলন খেলাঘর’। দেশে নারীমুক্তি আন্দোলনের অগ্রদূত হিসেবে তিনি বাংলাদেশের মহিলা পরিষদের সহ-সভানেত্রীর দায়িত্ব পালন করেন দীর্ঘদিন। সমাজসেবার প্রতি অসীম ভালোবাসা থেকে তিনি নিজের সব সম্পত্তি দান করেন মানবকল্যাণে।
১৯৮৬ সালের ১৬ অক্টোবর বরিশালের কাউনিয়ায় নিজের প্রতিষ্ঠিত মাতৃমন্দিরে তার জীবনাবসান ঘটে। মৃত্যুর পর তার নামে গঠিত হয় ‘মনোরমা বসু মাসিমা স্মৃতি ট্রাস্ট’। আজ মাতৃমন্দির আশ্রমটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে তার স্মৃতির বুকে।
দেশ ও মানুষের প্রতি তার আজীবন নিবেদন, নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় তার অগ্রণী ভূমিকা এবং পরাধীনতার বিরুদ্ধে তার অকুতোভয় সংগ্রাম তাকে বাঙালি নারীর দুর্বার প্রতীক হিসেবে অমর করে রেখেছে। তার অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি মরণোত্তর শের-ই-বাংলা পদক (১৯৯৭) এবং বেগম রোকেয়া পদক (১৯৯৯) লাভ করেন । সাহিত্যিক সত্যেন সেনও তার জীবন সংগ্রামকে অমর করে রেখেছেন ‘মনোরমা মাসিমা’ গ্রন্থে।
মনোরমা বসু মাসিমা শুধু একজন নারী নেত্রী নন; তিনি ছিলেন বাংলার নারী জাগরণের এক উজ্জ্বল আলোকশিখা, যার পথচলা আজও অনুপ্রাণিত করে অসংখ্য নারীকে। তার জীবন ছিল সংগ্রামের, ত্যাগের, ভালোবাসার আর সেই কারণেই তিনি আজও ইতিহাসের পাতায় অমর।
/এসএল
.jpg)