একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে বিজ্ঞান আর মহাকাশ গবেষণায় নারীর যে অগ্রযাত্রা, তাকে একটি ‘নীরব বিপ্লব’ ছাড়া অন্য কোনো নামে ডাকা যায় না। এ পথ কখনো মসৃণ ছিল না- ছিল ধুলায় ভরা অরবিট, ছিল সংশয়, বৈষম্য আর অবজ্ঞার কঠিন প্রাচীর। সেই প্রাচীর টপকে আজ নারীরা কেউ আলো নিয়ে, কেউবা আগুন নিয়ে এগিয়ে চলেছেন মানব ইতিহাসের নতুন দিগন্ত উন্মোচনের পথে। তাদের এই যাত্রায় রয়েছে অদম্য মেধা, ধৈর্য আর লিঙ্গভিত্তিক বাধা ভেঙে দেওয়ার ইস্পাত কঠিন সংকল্প।
মহাকাশ গবেষণায় নারীর উপস্থিতি এখন শুধু ‘অংশগ্রহণ’ নয়, বরং নেতৃত্বের প্রতীক। নাসা ইসরো, ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সি থেকে শুরু করে স্পেসএক্স সিদ্ধান্তের টেবিলে নারীদের কণ্ঠস্বর এখন আগের চেয়ে অনেক জোরাল।
চাঁদে যাওয়ার উচ্চাভিলাষী আর্টেমিস মিশনে নারী কমান্ড, নারী পাইলট ও নারী বিজ্ঞানী- এ যেন ভবিষ্যতের এক রোডম্যাপ। ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ইসরোর মঙ্গলযান এবং চন্দ্রযান-৩-এর মতো সফল মিশনেও নারী বিজ্ঞানীদের অবদান অনস্বীকার্য। ইসরোর ১৬ হাজার কর্মীর মধ্যে ২৫ শতাংশই নারী, যারা ভিআর ললিথম্বিকা ও ঋতু করিধালের মতো মহীয়সীদের নেতৃত্বে মহাকাশ প্রযুক্তিতে ভারতকে বিশ্বমঞ্চে এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছেন।
এক্ষেত্রে শুধু শারীরিক সক্ষমতা নয়, নারীদের সূক্ষ্ম মনোযোগ এবং দীর্ঘ অভিযানের জন্য তাদের বিশেষ অভিযোজন ক্ষমতা আজ গবেষণায় গুরুত্ব পাচ্ছে। এর শুরুটা করেছিলেন ভ্যালেন্টিনা তেরেশ কোভার মতো অগ্রদূতরা, যিনি ১৯৬৩ সালে প্রথম নারী হিসেবে মহাকাশ জয় করেছিলেন। আর আধুনিক বিজ্ঞানের এক উজ্জ্বল উদাহরণ হলেন কেটি বোম্যান। ব্ল্যাক হোলের প্রথম ছবি তোলার পেছনে তার তৈরি অ্যালগরিদম প্রমাণ করেছে যে নারীরাই পারেন অন্ধকারের সবচেয়ে রহস্যময় দিকটি উন্মোচন করতে, যা গণিত ও কম্পিউটার বিজ্ঞানে নারীর দক্ষতার এক শক্তিশালী প্রমাণ।
তবে এই গৌরবগাথার পেছনের গল্পে লুকিয়ে আছে কিছু কঠিন সত্য। বিজ্ঞানক্ষেত্রে আজও লিঙ্গবৈষম্য প্রবল। অনেক নারী বিজ্ঞানীর গবেষণা আজও ‘কম মূল্যবান’ হিসেবে বিবেচিত হয়। একই কাজের জন্য ভিন্ন বেতন, প্রজেক্ট নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে পুরুষের অগ্রাধিকার এবং ছোটবেলা থেকে গেঁথে দেওয়া ‘স্পেস, রকেট, গণিত এগুলো ছেলেদের বিষয়’ জাতীয় স্টেরিওটাইপগুলো আজও বড় বাধা।
দীর্ঘ গবেষণা সময় এবং মহাকাশ প্রশিক্ষণের কঠোরতা নারীর ওপর থাকা সামাজিক চাপের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে ওঠে। একজন পুরুষ বিজ্ঞানী বাবা হলে তাকে ‘আরও পরিশ্রমী’ মনে করা হয়, অথচ একজন নারী বিজ্ঞানী মা হলে তার দায়িত্ব পালনের ক্ষমতা নিয়ে ওঠে প্রশ্ন। এই মানসিক বাধা ও কাঠামোগত বৈষম্য পেরোনোই তাদের পথচলার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
বিশ্বের এই বিপ্লবে পিছিয়ে নেই বাংলাদেশ। সরাসরি মহাকাশচারী না হলেও, আন্তর্জাতিক গবেষণায় বাংলাদেশি নারীরা আজ নিজেদের জায়গা তৈরি করে নিয়েছেন।
.jpg)
ক্যাপশন : ‘বাংলাদেশী জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞানী তনিমা তাসনিম অনন্যা ও ভারতীয়-আমেরিকান নভোচারী কল্পনা চাওলা’
এর উজ্জ্বল উদাহরণ তনিমা তাসনিম অনন্যা, যিনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে ব্ল্যাক হোলের পূর্ণাঙ্গ মানচিত্র তৈরির কাজ করে বিশ্বব্যাপী সাড়া ফেলেছেন এবং সায়েন্স নিউজ পত্রিকার সেরা ১০ জন উদীয়মান বিজ্ঞানীর তালিকায় স্থান পেয়েছেন। অন্যদিকে, বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মাহনাজ আহমেদ নাসার ‘মার্স ২০২০’ মিশনে কাজ করেছেন, যা পারসিভারেন্স রোভারকে মঙ্গলে পাঠানোর জটিল প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই সাফল্যের পথ তৈরি করে দিয়েছেন সেঁজুতি সাহা এবং ফিরদৌসী কাদরীর মতো অণুজীব বিজ্ঞানীরা, যারা বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেশের পতাকা বহন করছেন।
/এস লুপিন
.jpg)