হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার রঘুনন্দন পাহাড়ের পাদদেশ থেকে অবৈধ ড্রেজার বসিয়ে অবাধে বালু তোলা হচ্ছে। এতে সংরক্ষিত বনের কয়েকটি টিলা মারাত্মক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। বনের পরিবেশ-প্রতিবেশ ধ্বংসের পাশাপাশি নষ্ট হচ্ছে জনচলাচলের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রঘুনন্দন সংরক্ষিত বন মূলত চুনারুঘাট ও মাধবপুর উপজেলায় অবস্থিত। এই বনের গাধাছড়া এলাকার পানছড়ি অংশে দীর্ঘদিন ধরে ডজনখানেক ড্রেজার মেশিন বসিয়ে উত্তোলন করা হচ্ছে লাখ লাখ ঘনফুট সিলিকা বালু। এসব বালু পাচার করা হচ্ছে কয়েকটি শিল্প প্রতিষ্ঠানসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে। অবৈধভাবে পাহাড় কেটে বালু উত্তোলন ও পাচার করে অল্প দিনে আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়ে উঠেছে বালুমাফিয়া চক্রটি।
তবে স্থানীয় লোকজন শক্তিশালী বালুখেকো চক্রের বিরুদ্ধে মুখ খুলতে সাহস পান না। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক ব্যক্তি জানান, পানছড়ি এলাকার আমজত উল্লাহর নেতৃত্বে চলে পাহাড় কাটার এই মহোৎসব। তার ভাতিজা সরকারের যুগ্ম সচিব হওয়ায় তার নাম ব্যবহার করে অবাধে করে যাচ্ছেন বালু উত্তোলন। কেউ প্রতিবাদ করতে গেলে তাকে হামলা মামলার ভয় দেখানো হয়। তার এই বালু উত্তোলন কাজে প্রত্যক্ষ সহযোগী হিসেবে কাজ করছেন একই এলাকার মাহফুজ মিয়া, বাবলু মিয়া, কাউসার মিয়া এবং সাইদুর রহমান। আর এসব বালু বিভিন্ন স্থানে পাচারের নেতৃত্ব দিচ্ছেন মহিমাউড়া গ্রামের কালাম মিয়া, স্থানীয় ইউপি সদস্য ফরিদ মিয়ার ছেলে ফয়েজ মিয়া, বশির মিয়াসহ কয়েকজন।
সরেজমিনে গাধাছড়ায় গিয়ে দেখা যায়, বিকট শব্দে চলছে অর্ধডজন ড্রেজার মেশিন। প্রায় বিশ একর জায়গাজুড়ে চলছে দানবীয় ড্রেজার মেশিনের তাণ্ডব। ভাঙন দেখা দিয়েছে পার্শ্ববর্তী একাধিক টিলায়। বসতভিটা হারানোর শঙ্কায় আছেন কয়েকটি চা শ্রমিক পরিবার।
বালু উত্তোলন কাজে থাকা শ্রমিকরা জানান, আমজত উল্লাহ, মাহফুজ মিয়া এবং বাবলু মিয়ার অধীনে তারা দৈনিক হাজিরা ভিত্তিতে বালু উত্তোলনের কাজ করছেন। এ সময় মেশিন দিয়ে উত্তোলিত বালু ট্রাক্টরে লোড করতেও দেখা যায় কয়েকজন শ্রমিককে।
একই সময় আমজত উল্লাহ, মাহফুজ মিয়া এবং বাবলু মিয়ার সঙ্গে কথা হলে তারা অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করার বিষয়টি অবলীলায় স্বীকারও করেন। বালু পাচারের দ্বায়িত্বে থাকা কালাম মিয়া বলেন, ‘কিছু একটা করে চলতে হবে, তাই বালু ব্যবসা করতেছি।’
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) হবিগঞ্জ শাখার সাধারণ সম্পাদক তোফাজ্জল সোহেল বলেন, ‘বহু বছর ধরে হবিগঞ্জের চুনারুঘাটসহ কয়েকটি উপজেলায় পাহাড়-টিলা কেটে পরিবেশ বিধ্বংসী কার্যক্রম চলছে। এতে সার্বিক পরিবেশ-প্রতিবেশ ও প্রকৃতির ওপর যে বিরূপ প্রভাব পড়ছে সেটা অপূরণীয় ক্ষতির কারণ।’
তিনি বলেন, ‘উচ্চ আদালত থেকে পাহাড়-টিলা রক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করার নির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু এগুলো রক্ষায় কার্যকর কোনো পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না। যা অত্যন্ত দুঃখজনক। যার ফলে পাহাড় ও টিলা কাটা দিনদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে আর ধ্বংস হচ্ছে আমাদের প্রাণ-প্রকৃতি। দায়ীদের চিহ্নিত করে আইন প্রয়োগের মাধ্যমে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থাসহ পাহাড়-টিলাকে সুরক্ষিত রাখার ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি।’
এ বিষয়ে চুনারুঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আয়েশা আক্তার বলেন, ‘আমরা এসব এলাকায় নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছি।’