নড়াইলের লোহাগড়ায় অসময়ে মধুমতী নদীর ভাঙনে দিশেহারা হয়ে পড়েছে শতাধিক পরিবার। কাশিপুর, মাকড়াইল, রামচন্দ্রপুর ও নওখোলা এলাকায় ফসলি জমি, বসতভিটা, বিদ্যালয়, মসজিদ ও সড়ক নদীতে বিলীন হচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, নিয়ম না মেনে বালু উত্তোলনের ফলে আগাম ভাঙন শুরু হয়েছে। তারা দ্রুত টেকসই বাঁধ নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন। প্রশাসন বালুমহালের ইজারা বাতিল ও অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ করলেও ভাঙন এখনো অব্যাহত।
স্থানীয়রা জানান, অনেক বছর ধরে এ অঞ্চলে বর্ষা মৌসুমে মধুমতী নদীর তীর ভাঙছে। তবে কয়েক বছর ধরে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) কিছু স্থানে বালুর বস্তা ফেলে বাঁধ দেওয়ায় ভাঙন কিছুটা কমছিল। কিন্তু ড্রেজার মেশিন বসিয়ে ইজারা করা এবং ইজারাবহির্ভূত বিভিন্ন স্থান থেকে বালু উত্তোলন করায় বাঁধের অনেক জায়গা ভেঙে নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। সে জন্য এ বছর অসময়ে ভাঙন শুরু হয়েছে। সম্প্রতি অভিযোগ দিলে ইজারাবহির্ভূত এলাকায় প্রশাসন বালু উত্তোলন বন্ধ করে দিয়েছে।
এ ছাড়া চলতি বছরে ওই এলাকার বালুমহাল ইজারা দেওয়াও বন্ধ করে দিয়েছে প্রশাসন। তবে এলাকাবাসীর দাবি, এটি যেন স্থায়ীভাবে করা হয়।
সম্প্রতি কাশিপুর, মাকড়াইল, রামচন্দ্রপুর ও নওখোলা গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে, মধুমতী নদীতে পানি কম, ঢেউ নেই, তবু চলছে ভাঙন। এসব এলাকার কিছু স্থানে পাউবোর দেওয়া বালুর বস্তা সরে গিয়ে নদীতে তলিয়ে গেছে। এতে বাঁধ ভেঙে নতুন করে ভাঙছে নদীতীর।
মাকড়াইল গ্রামের ফজলুল মৃধা বলেন, ‘আমাদের কয়েক একর জমি নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। ভাঙন-আতঙ্কে আমার এক ভাই ইতোমধ্যে এলাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছে। নদী থেকে যত্রতত্র বালু উত্তোলনের কারণে আমার বাড়ির সামনের অংশে ভাঙন শুরু হয়েছে। বাড়ির পাশে ব্রিটিশ আমলে প্রতিষ্ঠিত স্কুলটিও ভাঙন-হুমকির মধ্যে আছে।’
নদীতীরের বাসিন্দা মর্জিনা বেগম বলেন, ‘আগে দুবার নদীতে আমাগের বাড়ি ভাঙিছে, কষ্ট করে নতুন করে বাড়ি করিছি। মেলা জমি নদীতে চলে গেছে। এখনকার বাড়িও ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে।’
কাশিপুর গ্রামের শামসুন্নাহার বেগম বলেন, ‘শুধু বালু ওঠানোর কারণে আমার বাড়ি ভাঙছে। আমি গরিব-অসহায়। অন্য কোথাও যে বাড়ি করব, সে সামর্থ্যও আমার নেই। আমার স্বামী নেই। একটা ছেলে নেই। চারটা মেয়ে আছে। এখন আমি কী করব? বৃষ্টি-বাদল হচ্ছে না। তখন আমার বসতভিটা ভাঙছে। ভিটের বাকি অংশ এখনো ভাঙছে। বৃষ্টি এলেই একেবারে সব ভেঙে চলে যাবে। আমার যাওয়ারও কোনো জায়গা নেই। আমার বাড়ির সামনে নদী যে অংশ আছে, সেখান থেকে ড্রেজার বসিয়ে বালু উত্তোলন করা হয়। বাড়ির পেছনে সেই বালু স্তূপ করে রাখা হয়। বালু উত্তোলন করায় বাড়ির সামনে থাকা বাঁধের বস্তা নদীতে চলে যাচ্ছে। স্তূপ করে রাখা বালুর পানির টানে আমার বাড়ির কিছু অংশ নদীতে বিলীন হয়ে গেছে।’
লোহাগড়া উপজেলা নির্বাহী (ইউএনও) কর্মকর্তা আবু রিয়াদ বলেন, ইতোমধ্যে নদীভাঙনের কারণে ওই এলাকার বালুমহালের ইজারা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এখন অবৈধভাবে কেউ বালু উত্তোলন করলে তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নড়াইল জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী অভিজিৎ কুমার সাহা বলেন, ‘নিয়ম না মেনে বালু উত্তোলন করায় নদীতীরের প্রতিরক্ষা বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইতোমধ্যে প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলে
নিয়মবহির্ভূতভাবে বালু উত্তোলন ও ওই এলাকার বালুমহালগুলোর ইজারা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তা ছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ সংস্কারে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।