রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার চেংমারী গ্রামের মো. ছবিরের জীবন শুরু হয়েছিল অভাব-অনটনের মধ্য দিয়ে। বাবা হোসেন আলী ছিলেন গরিব। পরিবারে ছিল নিত্য অভাব। তাই ছোটবেলাতেই দিনমজুরির কাজ শুরু করেন ছবির। পড়াশোনার সুযোগ হয়নি। শৈশবেই সংসারের হাল ধরতে হয় তাকে।
দীর্ঘ ২০ বছর আগে ভাগ্য ফেরাতে শহরমুখী হন ছবির। পুঁজি ছিল শুধু পরিশ্রম আর ইচ্ছাশক্তি। শুরু করেন তাল শাঁস বিক্রি। ওই আয় থেকেই কিনেছেন জমি, দুই মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন।
ছবির প্রতিদিন গড়ে ১ হাজার টাকা আয় করেন। এক সময়ে যার পেটে ঠিকমতো ভাত জুটত না, এখন তিনি স্বচ্ছল। প্রতিদিন ভোরে ১২ কিলোমিটার পথ প্যাডেল চালিয়ে শহরে আসেন। রংপুর শহরের বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে বিক্রি করেন কচি তালের শাঁস। সন্ধ্যায় ফেরেন বাড়ি।
সম্প্রতি রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে তাল শাঁস বিক্রি করছিলেন ছবির। তাকে ঘিরে ছিলেন নার্স, শিক্ষার্থী ও রোগীর স্বজনরা। শক্ত খোলস কেটে শাঁস বের করে দিচ্ছিলেন তিনি। আর তা খাচ্ছিলেন ক্রেতারা পরম তৃপ্তিতে।
মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থী নাহিদ সরকার বলেন, ‘ছবির মামা শান্ত স্বভাবের মানুষ। দুই বছর ধরে তাকে এখানে তাল শাঁস বিক্রি করতে দেখছি। পরিচ্ছন্ন থাকেন। প্রাকৃতিক ও স্বাস্থ্যকর হওয়ায় আমরা বন্ধুরা মিলে এখানে তাল শাঁস খেতে আসি। এতে ক্যালসিয়াম, লৌহ, আঁশ ও ক্যালরির পরিমাণ অনেক বেশি।’
ক্রেতা শিপুল ইসলাম বলেন, ‘গত বছর ৫ টাকায় একটা তাল শাঁস খাইছিলাম। এবার ১০ টাকার নিচে পাওয়া যায় না। তীব্র গরমে শরীর ঠাণ্ডা করতে তাল শাঁস খেতে এসেছি। ভিড় দেখে অপেক্ষা করছি।’
ছবির জানান, চার ভাই ও দুই বোনের মধ্যে তিনি তৃতীয়। অভাবের কারণে পড়াশোনা হয়নি। ছোটবেলা থেকেই দিনমজুরের কাজ করেছেন। ২০০০ সালে বিয়ের পর দেখা দেয় টানাটানি। ২০০৫ সালে কাজের সন্ধানে শহরে আসেন। মাত্র ১৫০ টাকায় কচি তাল কিনে শুরু করেন শাঁস বিক্রি। পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি আর।
এই আয়েই পাঁচ শতক জমি কিনে বাড়ি করেছেন। দুই মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন। বন্ধক নিয়েছেন আবাদি জমি। গোয়ালে আছে তিনটি দুধেল গাভি। তালের শাঁস বিক্রিতে প্রতিদিন ২ হাজার টাকার মূলধনে তার লাভ থাকে প্রায় ১ হাজার টাকা। ছবির বলেন, ‘দেড় টাকায় তাল শাঁস বিক্রি শুরু করেছি। গত বছর পাঁচ টাকায় বেচেছি। এবার প্রতি পিস দাম ১০ টাকা। কারণ আড়তে দাম বেশি। এই আয়ের টাকায় দুই মেয়েকে ৫ লাখ টাকা খরচ করে বিয়ে দিয়েছি। নিজের জমিতে বাড়ি করেছি। ছোট মেয়েকে মাদ্রাসায় পড়াচ্ছি। দিনে শেষে পকেটে ১ হাজার বা ১ হাজার ২০০ টাকা থাকে।’ তাল শাঁসের মৌসুম শেষ হলে ভ্যানে করে মৌসুমি ফল বিক্রি করেন তিনি। শহরে তার পরিচিত ক্রেতার সংখ্যাও অনেক।
ছবিরের জীবনসংগ্রাম শহরের ব্যস্ত জনজীবনের মাঝেও এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। সীমিত আয়ে, সীমাহীন পরিশ্রমে আর অদম্য মানসিকতায় তিনি গড়ে তুলেছেন সুন্দর জীবন। প্রতিটি তাল শাঁসের ভেতর যেন লুকিয়ে আছে শত প্রতিকূলতা জয় করার গল্প।