ছেলে হারানোর শোকে পাথর হয়ে গেছেন সামিউল করিমের মা রেশমা বেগম। প্রায় বাকরুদ্ধ বাবা রেজাউল করিম। কান্না থামছে না বোন স্নেহা করিমের। ছোট সামিউলের অকাল মৃত্যুতে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। তার লাশ নিয়ে এলে শত শত মানুষ এক নজর দেখতে তাদের বাড়িতে ভিড় জমায়। সামিউলের লাশবাহী কফিনকে ঘিরে পুরো এলাকায় শোকাবহ পরিবেশ তৈরি হয়। এ দৃশ্য বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জের দেশখাগকাটা গ্রামের চেয়ারম্যান বাড়ির। এই বাড়ির সন্তান সামিউল রাজধানীর উত্তরার মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ত। সোমবার (২১ জুলাই) একটি প্রশিক্ষণ বিমান ওই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিধ্বস্ত হয়। ওই দুর্ঘটনায় মারা যায় সামিউল করিম।
সামিউলের বাবা রেজাউল করিম বলেন, ‘সামিউলকে নিয়ে আমাদের অনেক স্বপ্ন ছিল। সব স্বপ্নই পুড়ে গেল। আমার সব শেষ হয়ে গেল।’ এসব কথা বলতে বলতে তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন। জানাজার আগে ছেলের জন্য দোয়া চাইতে গিয়েও তিনি কান্না করেন। তিনি তার ছেলের জন্য সবার কাছে দোয়া চান।
রেজাউল বিলাপ করে বলেন, ‘আমার ছেলেটা আগুনে জ্বলছিল। আমি কিছুই করতে পারিনি। চোখের সামনে চলে গেল। কত যন্ত্রণা পেল ছেলেটা। আমি কীভাবে ওকে ছাড়া থাকব। ওর যে মৃত্যুযন্ত্রণা দেখেছি, তা কীভাবে ভুলব। সব শেষ হয়ে গেল।’
তিনি বলেন, ‘প্রতিদিন ছেলে-মেয়েকে স্কুলে দিয়ে আসি। আবার বাসায় নিয়ে আসি। প্রতিদিনের মতো সোমবারও দুপুর ১টার দিকে স্কুলের গেটে অপেক্ষা করছিলাম। স্কুল ছুটি হয়েছে তখন। সামিউল কাঁধে ব্যাগ নিয়ে আমার দিকে আসছিল। ঠিক ওই সময় বিধ্বস্ত বিমানের একটি জ্বলন্ত অংশ এসে সামিউলের পেছনে আঘাত করে।’
রেজাউল বলেন, ‘‘আমি তখন সামিউলকে জড়িয়ে ধরি। ঝলসে যাওয়া ছেলেটা তখন বুকের মধ্যে ছটফট করছিল। ছেলেটাকে বাঁচানোর জন্য মানুষের কাছে আকুতি করছিলাম। একজন সেনা বাহিনীর সদস্য এসে তার গায়ের পোশাক খুলে দেওয়ায় তা পেঁচিয়ে বুকের মধ্যে জড়িয়ে রাখি। কিছুক্ষণ পরে সামরিক হেলিকপ্টারে সিএমএইচে নিয়ে যাই। সেখানে নেওয়ার আধা ঘণ্টা পর অপারেশন থিয়েটারের ভেতর থেকে একজন এসে বললেন, ‘দুঃখিত, আমরা আপনার ছেলের জন্য কিছু করতে পারিনি।’’
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সামিউলের বাবা রেজাউল করিম রাজধানীর একটি বায়িং হাউসের মালিক। মেহেন্দিগঞ্জের চানপুর ইউনিয়নের এক সময়ে জনপ্রিয় ইউপি চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা মোস্তফা কামালের নাতি সামিউল। তার মা রেশমা বেগম মেহেন্দিগঞ্জের মুক্তিযোদ্ধা মোস্তফা কামাল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা। ছেলে-মেয়ের লেখাপড়ার কারণে তিনিও রাজধানীর উত্তরায় বসবাস করছিলেন। এক ভাই ও এক বোনের মধ্যে সামিউল ছোট। বোন স্নেহা করিম মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এ বছর এসএসি পরীক্ষা পাস করেছে।
মঙ্গলবার সকাল ১০টায় মোস্তফা কামাল মাধ্যমিক বিদ্যালয় মাঠে সামিউলের জানাজা নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। পরে তার নানা সাবেক ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মোস্তফা কামালের কবরের পাশে তাকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়। জানাজা নামাজে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন। এর আগে ভোররাতে সামিউলের লাশ ঢাকা থেকে গ্রামের বাড়িতে নিয়ে আসা হয়।
স্থানীয়রা জানান, সামিউলের পৈতৃক নিবাস ছিল মেহেন্দিগঞ্জ সদর ইউনিয়নের রুকুন্দি গ্রামে। নদীভাঙনে পরে তার বাবা রেজাউল করিম শ্বশুরবাড়িতে ঘর নির্মাণ করেন। তাদের পরিবার রাজধানীর উত্তরায় বসবাস করছিল। গত সপ্তাহে সামিউল বাবা-মায়ের সঙ্গে গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে এসেছিল। পাঁচ দিন থাকার পর রবিবার সকালে ঢাকায় চলে যায়। সোমবার স্কুলে গিয়ে বিমান দুর্ঘটনায় নিহত হয়।
সামিউলের নানা মোস্তফা কামালের ভাই আবু জাহের বলেন, ‘গ্রাম থেকে যাওয়ার দুই দিন পার না হতেই সামিউল এভাবে ফিরে আসবে তা বুঝতে পারিনি। বুঝতে পারলে ওকে রবিবার ঢাকা যেতে দিতাম না। ও আমার সবচেয়ে আদরের নাতি ছিল।’ কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘আমার নাতিকে যেভাবে হারিয়েছি, আর যেন কাউকে এভাবে হারাতে না হয়। সরকারকে জানাতে চাই, জনবসতিপূর্ণ এলাকায় এভাবে প্রশিক্ষণ বিমান চালানো অন্যায়।’
বীর মুক্তিযোদ্ধা মোস্তফা কামাল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক মাসুদ আহমেদ বলেন, ‘আমাদের সবাইকে এক সময় এই দুনিয়া ছেড়ে যেতে হবে। এটা নির্ধারিত। সব মৃত্যুই আমাদের মেনে নিতে হয়। কিন্তু এত ছোট একটি বাচ্চা আমাদের মাঝ থেকে অকালে হারিয়ে যাওয়া খুবই দুঃখজনক। আমরা সামিউলসহ উত্তরায় বিমান দুর্ঘটনায় নিহত মাইলস্টোন স্কুলের সব শিক্ষার্থীর আত্মার মাগফেরাত কামনা করি।