ঠাকুরগাঁও শহরের মুন্সির হাট এলাকার বাসিন্দা আকালী বেগম। লিভারকেন্দ্রিক জটিলতা নিয়ে গত ৫ আগস্ট ঠাকুরগাঁও জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি হন। চিকিৎসক প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে তাকে রংপুর মেডিকেল কলেজ (রমেক) হাসপাতালে রেফার করেন। পরামর্শ অনুযায়ী স্বজনরা তাকে ওইদিনই রমেক হাসপাতালে নিয়ে যান। কিন্তু সেখানে গিয়ে দীর্ঘ অপেক্ষার পরও চিকিৎসকের সাক্ষাৎ পাওয়া যায়নি। পরে বাধ্য হয়ে তাকে রংপুরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়।
ঠাকুরগাঁও শহরের কলেজপাড়ার ফারজুল ইসলামের অভিজ্ঞতা আরও খারাপ। হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত বাবাকে প্রথমে জেলার সদর হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে ছিলেন। তাকেও রংপুর মেডিকেলে রেফার করা হয়। কিন্তু সেখানে নেওয়ার পর আইসিইউ বেড খালি পাওয়া যায়নি। শেষ পর্যন্ত তিনি তার বাবাকে বাঁচাতে পারেননি।
ঠাকুরগাঁওসহ রংপুর বিভাগের আট জেলার মানুষের উন্নত চিকিৎসার শেষ ভরসার নাম রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। প্রতিদিন এখানে গড়ে তিন হাজারের বেশি রোগী ভর্তি থাকেন। নতুন করে ভর্তি হন আরও অন্তত ৫০০ জন। কিন্তু বিপুলসংখ্যক মানুষের ভরসার জায়গাটি এখন ভোগান্তির কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। এখানে চিকিৎসা নিতে এসে মানুষকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা চিকিৎসকের অপেক্ষায় থাকতে হয়। শয্যা না পেয়ে বারান্দায় সেবা নেওয়া এখানকার নিত্যদিনের ঘটনা। শৌচাগারের বেহাল পরিবেশ সেবাপ্রার্থীদের আরও অসুস্থ করে তোলে। ‘চায়ের টাকা’ না দিলে মেলে না ট্রলি কিংবা হুইল চেয়ারের সুবিধা। অনেকে বেসরকারি হাসপাতাল বা ক্লিনিকের শরণাপন্ন হন। তবে যাদের সামর্থ্য নেই, তাদের বাধ্য হয়ে বারান্দায় শুয়ে বৃষ্টিতে ভিজতে হয়। যদিও কর্তৃপক্ষের দাবি, আন্তরিকতার ঘাটতি না থাকলেও নানা সংকটের কারণে তারা প্রত্যাশিত সেবা দিতে পারেন না। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।
সরেজমিনে গত ৮ আগস্ট রাত ৮টা থেকে ১২টা পর্যন্ত রমেক হাসপাতালে অবস্থান করে দেখা যায়, মেডিসিন (পুরুষ ও নারী) ওয়ার্ডে শয্যা সংখ্যা ৩০টি করে। কিন্তু পুরুষ ওয়ার্ডে তখন ভর্তি ছিলেন ৬৫ জন, নারী ওয়ার্ডে ৬১ জন। যারা শয্যা পাননি তাদের ম্যাট্রেস ছাড়াই বারান্দায় থাকতে দেওয়া হয়েছে। কোনো কোনো ওয়ার্ডে বারান্দায় জায়গা না হওয়ায় রোগীদের অন্য ওয়ার্ডে স্থানান্তর করা হয়েছে। একদিকে রোগীর চাপ অন্যদিকে ভ্যাপসা গরম, দুই সংকট মিলিয়ে রোগীদের অবস্থা কাহিল। সেবা দিতে গিয়ে অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসক ও সেবিকাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে দালালরা রোগী ভাগানোর কাজ করছে।
রমেক থেকে বেসরকারি ক্লিনিকে যাওয়া এক রোগীর স্বজন তাসলিমা জাহান বলেন, ‘আমরা জানতাম সরকারি হাসপাতালে ভালো চিকিৎসা হয়। কিন্তু ওখানে থাকার পরিবেশ নেই। একদিকে গরম অন্যদিকে রোগীর চাপ। এতে রোগীরা আরও অসুস্থ হয়ে পড়েন। বাধ্য হয়ে সেখান থেকে রোগীকে বেসরকারি ক্লিনিকে নিয়ে যাই। এতে একটু স্বস্তি পাই।
রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার কুর্শা ইউনিয়নের বাওচন্ডী থেকে মেয়ের চিকিৎসা করাতে এসেছেন খাদিজা বেগম। কিন্তু শয্যা না পেয়ে তাকে বিপাকে পড়তে হয়েছে। তিনি বলেন, ‘দুই দিন আগে মেয়েকে ভর্তি করিয়েছি। এখনো বেড পাইনি। বারান্দায় পড়ে আছি। বৃষ্টিতে ভিজতে হচ্ছে। উন্নত চিকিৎসার আশায় এখানে এসে বেকায়দায় পড়েছি। নাবালক মেয়েকে নিয়ে ভয়ে ভয়ে থাকতে হচ্ছে।
রংপুরের মিঠাপুকুর-শঠিবাড়ী থেকে চাচাকে নিয়ে এসেছেন রাহিদুল ইসলাম শিমুল। তাকে হাসপাতালের ওয়ার্ড পর্যন্ত পৌঁছাতে হুইল চেয়ার ভাড়া বাবদ ৩০০ টাকা দিতে হয়েছে। ইচ্ছের বিরুদ্ধে টাকা দিতে হওয়ায় তিনি খুবই বিরক্ত। বলেন, ‘ওরা ৫০০ টাকা চেয়েছিল। আমি ২০০ দিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু ওরা মানেনি। বাধ্য হয়ে ৩০০ টাকা দিয়েছি। এই সিন্ডিকেট ভাঙা দরকার।’ হুইল চেয়ারের ভাড়া বাবদ টাকা নেওয়ার বিষয়ে আশরাফুল ইসলাম নামে এক কর্মচারী বলেন, ‘আমরা টাকা চাই না। রোগীর স্বজনরা চা খাওয়ার জন্য টাকা দেন। তাতেই আমরা খুশি।
রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের রেজিস্ট্রার ডা. সাদিকুল ইসলাম বলেন, ‘দিন যত যাচ্ছে রোগীর সংখ্যাও বাড়ছে। কিন্তু শয্যা বাড়ছে না। রোগীর চাপের কারণে চিকিৎসা দিতে হিমশিম খেতে হয়। তারপরও আমাদের জায়গা থেকে আমরা চেষ্টা করছি।
রমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আশিকুর রহমান বলেছেন, একদিকে শয্যা সংকট অন্যদিকে রোগীর চাপ— এসব কারণে রোগীদের অসুবিধা হয়। বিষয়টি আমাদের নজরে আছে। আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে এগুলো জানিয়েছি। চিকিৎসক বাড়ানোর প্রস্তাবনাও পাঠানো হবে।’ [প্রতিবেদনটি করতে ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি নবীন হাসান সহায়তা করেছেন]