১৫ আগস্টে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে গিয়ে অনেকেই হেনস্তার শিকার হয়েছেন। আটকও হয়েছেন কেউ কেউ। ফুলের তোড়া নিয়ে সেখানে গেলে উপস্থিত লোকজনের রোষানলে পড়ে কেউ কেউ মারধরের শিকারও হন। ফলে স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৫০তম মৃত্যুবার্ষিকীতে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে আনুষ্ঠানিক শ্রদ্ধা জানাতে পারেননি কেউ। কেউ যাতে শ্রদ্ধা জানাতে না পারেন, সে জন্য আওয়ামী লীগবিরোধী বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী ও সমর্থকরা সেখানে সোচ্চার ভূমিকা রাখেন। তবে ফেসবুকে বঙ্গবন্ধুর প্রতি বিপুলসংখ্যক মানুষের শোক-শ্রদ্ধা নিবেদন চোখে পড়ে।
এদিকে অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে ধানমন্ডির ওই এলাকায় কঠোর নিরাপত্তাবলয় গড়ে তুলেছিল আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। বৃহস্পতিবার (১৪ আগস্ট) রাত থেকে শুক্রবার (১৫ আগস্ট) সন্ধ্যার পর এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত সেখানে বিপুলসংখ্যক পুলিশ, র্যাব, আনসারসহ যৌথ বাহিনীর সদস্যকে অবস্থান করতে দেখা যায়। সেখানে অবস্থান নেন ছাত্র-জনতাও। যারাই শ্রদ্ধা জানাতে গিয়েছিলেন, তাদের সবাইকে আওয়ামী লীগের দোসর আখ্যা দিয়ে হেনস্তা করা হয়েছে। মারধরের পর পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। পুলিশ সেখান থেকে বেশ কয়েকজনকে ফিরিয়ে দেয় এবং কয়েকজনকে আটক করে থানায় নিয়ে যায়।
ধানমন্ডি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ক্য শৈন্যু খবরের কাগজকে বলেন, ‘ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে ছাত্র-জনতা নানা সন্দেহে কয়েকজনকে আটক করে। তাদের মধ্যে কাউকে মোবাইল চোর সন্দেহে, কাউকে ছিনতাইকারী, কাউকে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কর্মী সন্দেহে আটক করে পুলিশ। বৃহস্পতিবার রাতে পাঁচজন আটক ছিলেন। শুক্রবার সকালেও কয়েকজন আটক হন। আমরা তাদের সবাইকে থানা হেফাজতে নিয়ে এসেছি। তাদের বিষয়ে যাচাই-বাছাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
গতকাল সরেজমিন দেখা যায়, ধানমন্ডি ৩২ নম্বর সড়কের দুই পাশেই পুলিশের ব্যারিকেড দেওয়া ছিল। ছাত্র-জনতার হামলায় বিধ্বস্ত হওয়া শেখ মুজিবুর রহমানের বাড়ির সামনে কয়েকজন পুলিশ সদস্য পাহারায় ছিলেন। গণমাধ্যমকর্মীদের ভেতরে প্রবেশের সুযোগ দেওয়া হয়। আর ব্যারিকেডের বাইরে দুই পাশেই ছাত্রদল, ছাত্রশিবিরসহ আওয়ামী লীগবিরোধী অন্য রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের উপস্থিতি ছিল। বঙ্গবন্ধুর প্রতি যারা শ্রদ্ধা জানাতে এসেছিলেন, মূলত তাদের প্রতিহত করার জন্য সমবেত হয়েছিলেন বলে জানান তারা। সকাল সোয়া ৯টায় ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের সড়কের পশ্চিম পাশে তিন সন্তানসহ শ্রদ্ধা জানাতে এসে ওয়ালিউল্লাহ ও তার স্ত্রী রোষানলে পড়েন। বাগ্বিতণ্ডার একপর্যায়ে পুলিশ ওই দম্পতিকে সেখান থেকে সরিয়ে দেয়।
জুতা ব্যবসায়ী ওয়ালিউল্লাহ উপস্থিত সাংবাদিকদের বলেন, ‘বাংলাদেশের জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অনেক অবদান। তাই তাকে অনেক শ্রদ্ধা করি ও ভালোবাসি। এর জন্যই শ্রদ্ধা জানাতে এসেছি।’
সকাল ১০টার দিকে শেরেবাংলা নগর থেকে ফুল নিয়ে শ্রদ্ধা জানাতে এসেছিলেন হালিমা নামে এক নারী। এ সময় তাকেও হেনস্তা করেন সেখানে উপস্থিত উৎসুক জনতা। এর পর পরই সড়কের পূর্ব পাশে দুই ব্যক্তি শ্রদ্ধা জানাতে এলে তারাও হেনস্তার শিকার হন। রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী ও উৎসুক জনতা মিলে তাদের চড়-থাপ্পড় মারেন। গালাগালিও করেন। পরে পুলিশ সেখান থেকে তাদের ছাড়িয়ে নিয়ে যায়।
দুপুর ১২টা ১০ মিনিটে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে একটি ফুলের তোড়া নিয়ে আসেন একজন রিকশাচালক। আজিজুর নামে ওই রিকশাচালকও সেখানে হামলার শিকার হন। উপস্থিত লোকজন তাকেও গণধোলাই দেন। ওই সময় তিনি বারবার চিৎকার করে বলছিলেন, ‘আমি কোনো দল করি না। আমার নিজের উপার্জনের হালাল টাকায় ফুল কিনে বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে এসেছি।’ কিন্তু এতেও রেহাই মেলেনি তার। পরে পুলিশ তাকে সেখান থেকে উদ্ধার করে থানা হেফাজতে নিয়ে যায়। ফুলের তোড়ার মাঝে একটি কাগজে লেখা ছিল- ‘১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবস। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৫১তম মৃত্যুবার্ষিকীতে সাধারণ রিকশাওয়ালা হিসেবে বঙ্গবন্ধুকে ভালোবেসে শ্রদ্ধা জানাতে নিজের সৎ উপার্জনের টাকা দিয়ে ফুল কিনে এসেছি। আমি কোনো দল করি না। শুধু বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ভালোবাসি।’
দুপুরে জুমার নামাজের পর বেলা ২টা ৩৫ মিনিটে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে একটি ছোট ট্রাকে স্থাপন করা স্ক্রিনে বিভিন্ন গান বাজানো হয়। এর মধ্যেই বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনি মেজর ডালিমের দেওয়া ভাষণও প্রচার করা হচ্ছিল। ব্যারিকেডের বাইরে বেশ কিছুসংখ্যক ছাত্র-জনতার উপস্থিতি চোখে পড়ে।
ব্যারিকেডের বাইরে থাকা ছাত্রদলের এক কর্মী বলেন, ‘ধানমন্ডিতে মানুষ যাতে শান্তিতে থাকতে পারেন, আওয়ামী লীগের কেউ যাতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে না পারে, সে জন্য পুলিশের পাশাপাশি আমরাও সতর্ক অবস্থানে রয়েছি। আওয়ামী লীগের কয়েকজন এসেছিলেন। আমরা তাদের সরিয়ে দিয়েছি।’
ফেসবুকে বিপুল মানুষের শোক-শ্রদ্ধা
বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে বৃহস্পতিবার (১৪ আগস্ট) ১২টার পর থেকেই বিপুলসংখ্যক মানুষকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে শোক প্রকাশ ও শ্রদ্ধা জানাতে দেখা যায়। কেউ বঙ্গবন্ধুর ছবি দিয়ে, কেউ কবিতা লিখে, কেউ বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে গানের পংক্তি লিখে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে বঙ্গবন্ধুকে স্মরণ করেন। আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের বাইরেও দলটির রাজনীতি করেন না এমনও নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের সদস্যদের নির্মমভাবে হত্যার সেই শোকাবহ ১৫ আগস্টকে স্মরণ করেন।