দেশের অর্থনীতির লাইফলাইন খ্যাত ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে প্রতিদিন হাজারও গাড়ি চলাচল করে। চার লেনের এই সড়কটি দূরপাল্লার গাড়ির পাশাপাশি আন্তজেলার যোগাযোগেও ব্যবহার হয়ে থাকে। ভারী যানবাহনের সঙ্গে এই পথে তিন চাকার গাড়িও চলতে দেখা যায়। এতে প্রায়ই ঘটে দুর্ঘটনা। বাড়তে থাকে মৃত্যুর মিছিল। তবে শুধু ধীরগতির তিন চাকার যান নয়, দুর্ঘটনার পেছনে রয়েছে আরও একাধিক কারণে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চালক-পথচারীদের অসাবধানতা, ফুটওভারব্রিজ ব্যবহারে অনীহা, ট্রাফিক আইন অমান্য, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, উল্টো পথে চলাচলসহ নানা অনিয়ম ও প্রশাসনের দুর্বল নজরদারির কারণেই কুমিল্লার সড়কে দুর্ঘটনা বেড়ে চলেছে।
গত ২২ আগস্ট দুপুরে কুমিল্লার পদুয়া বাজার বিশ্বরোডের ইউটার্নে এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় থেমে গেছে একটি পরিবারের স্বপ্ন। চট্টগ্রাম থেকে ঢাকাগামী মালবোঝাই ট্রাক উল্টে কনটেইনারের নিচে চাপা পড়ে একই পরিবারের মা, বাবা ও দুই ভাই নিহত হন। এক মুহূর্তে নিভে যায় চারটি তাজা প্রাণ। কুমিল্লার বরুড়ার হোসেনপুরে কৃষিজমির পাশে মা-বাবার সঙ্গে চিরনিদ্রায় শায়িত এখন দুই ভাই। বড় ভাই ছিলেন ব্যাংক কর্মকর্তা, ছোট ভাই বেসরকারি চাকরিজীবী। দুর্ঘটনার পর আটক হয় ট্রাক ও বাসের চালক।
সম্প্রতি বিষয়টি নিয়ে কথা হলে নিহত পরিবারের স্বজন আবুল কালাম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘এক মুহূর্তে ভাই, ভাবি ও দুই ভাতিজাসহ চারজন মানুষ চলে গেল। ওই দিন সকালে ভাইয়ের সঙ্গে শেষবার কথা বলেছিলাম। বলেছিল ঢাকা থেকে বাড়িতে আসছেন। নামাজের আগে বড় ভাতিজার সঙ্গে কথা হয়, জানায় তারা রাস্তায় আছে, বাড়ির পথে। নামাজের পর পরই ভাতিজার মোবাইল ফোনে কল দিলে পুলিশ জানায় তারা চারজনই সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন।’ তিনি বলেন, ‘আমরা বিচার চাই, কিন্তু তার চেয়েও বেশি চাই আর কোনো পরিবারে যেন এমন সর্বনাশ না নেমে আসে।’
হাইওয়ে পুলিশ কুমিল্লা রিজিয়নের তথ্যমতে, গত ৯ মাসে শুধু ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কেই ঘটেছে ৪৬৫টি দুর্ঘটনা। এতে প্রাণ হারিয়েছেন ২৮৪ জন, আহত হয়েছেন ৫০৯ জন। পুরো রিজিয়নে ৮৪২টি দুর্ঘটনায় প্রাণ গেছে ৫২৫ জনের, আহত ১ হাজার ২১০ জন। পঙ্গু হয়েছেন বহু চালক ও যাত্রী।
দেশের অর্থনীতির লাইফলাইন খ্যাত ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে প্রতিদিন হাজারও ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান, লরি ছুটে চলে বন্দর নগরী চট্টগ্রাম থেকে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে। দুই লেন থেকে ১৫ বছর আগে মহাসড়কটি চার লেনে উন্নীত হলেও নিরাপত্তাব্যবস্থার উন্নতি ঘটেনি। যানবাহনের সংখ্যা কয়েক গুণ বেড়ে গেলেও সড়ক সম্প্রসারণের উদ্যোগ না থাকায় যানজট ও দুর্ঘটনা বেড়েছে উদ্বেগজনকভাবে। কুমিল্লার ১০৪ কিলোমিটার অংশজুড়ে রয়েছে ৮৪টি ইউটার্ন, যার বেশির ভাগই এখন পরিণত হয়েছে মৃত্যুফাঁদে।
অপরিকল্পিত ইউটার্নের পাশাপাশি উল্টো পথে চলা যানবাহন, নিষিদ্ধ থ্রি-হুইলারের দৌরাত্ম্য এবং সড়ক বিভাজক ভেঙে পারাপার হওয়া পথচারীরাও বড় ঝুঁকি তৈরি করছে। নিরাপদ পারাপারের জন্য মহাসড়কজুড়ে রয়েছে ৫৫টি ফুটওভারব্রিজ, কিন্তু সেগুলোর বেশির ভাগই ব্যবহারহীন। চান্দিনা, গৌরীপুর, দাউদকান্দি, সুয়াগাজী, মিয়াবাজার ও চৌদ্দগ্রাম এলাকায় প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ ডিভাইডার টপকে সড়ক পার হচ্ছেন।
সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালক রফিক মিয়া বলেন, ‘আমরা জানি এই সড়কে ওঠা ঠিক না, কিন্তু যাত্রী তো এখানেই নামতে চান। পুলিশ ধরলে জরিমানা দিতে হয়, না ধরলে রোজগার চলে। সবাই যদি নিয়ম মেনে চলে, আমরাও পারব।’
কুমিল্লার ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় ফুটওভারব্রিজ থাকার পরও ঝুঁকি নিয়ে মহাসড়ক পার হচ্ছিলেন হাজেরা বেগম নামে এক নারী। তার মতো আরও অনেককেই দেখা গেল এভাবেই মহাসড়ক পার হতে। ঝুঁকির বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে গেলে হাজেরা বেগম বলেন, ‘ফুটওভারব্রিজ আছে ঠিকই, কিন্তু উঁচুতে ওঠা অনেক কষ্টের। তাই বাধ্য হয়ে ঝুঁকি নিয়েই সড়ক পার হতে হয়।’
পথচারীদের অনেকেই জানালেন, ফুটওভারব্রিজের জায়গায় যদি আন্ডারপাসের ব্যবস্থা করা যায়, তাহলে সচেতনতা বাড়বে। ফুটওভারব্রিজ ব্যবহারের ভয়ে তাড়াহুড়ো করে তারা নিচ দিয়ে পার হচ্ছেন।
হাইওয়ে পুলিশ কুমিল্লা রিজিয়নের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ শাহিনুর আলম খান বলেন, ‘দুর্ঘটনার মূল কারণ অসচেতনতা, উল্টো পথে যান চলাচল, তিন চাকার যান এবং ত্রুটিপূর্ণ সড়ক ব্যবস্থা। আইন প্রয়োগ করেও অনিয়ম ঠেকানো যাচ্ছে না। দুর্ঘটনা কমাতে হলে প্রতিটি মহাসড়কে সার্ভিস লেন করা জরুরি।’
অন্যদিকে বিআরটিএ কুমিল্লার সহকারী পরিচালক ফারুক আলম বলেন, ‘সড়ক নিরাপত্তা বাড়াতে চালকদের প্রশিক্ষণ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সচেতনতা কার্যক্রম এবং ফিটনেসবিহীন যানবাহনের বিরুদ্ধে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হচ্ছে। গত এক বছরে পরিচালিত ৫৬৭ মামলায় ১ কোটি ৩৫ লাখ টাকা জরিমানা আদায় হয়েছে।’