২৫ বছর বয়সী রাকিব (ছদ্মনাম) প্রথমে জ্বরে আক্রান্ত হন। এরপর তার ওজন কমতে শুরু করে। পরে তিনি চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন। কয়েক মাস টানা চিকিৎসা নিয়েও সুস্থ হচ্ছিলেন না। বাধ্য হয়ে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ (মমেক) হাসপাতালের এইচআইভি টেস্টিং সার্ভিস (এইচটিসি) সেন্টারে তিনি রক্ত পরীক্ষা করান। এরপর জানতে পারেন তিনি হিউম্যান ইমিউনোডেফিসিয়েন্সি ভাইরাসে (এইচআইভি) আক্রান্ত হয়েছেন।
এ বিষয়ে রাকিব বলেন, ‘প্রথমে খুব ভয় পেয়েছিলাম। রিপোর্ট দেখে মনে হয়েছিল জীবন শেষ। এখন ওষুধ খাই, চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলি। সবাই জানলে কী ভাববে–মনে এখন সে ভয়টা বেশি কাজ করে।’
শুধু রাকিব নয়, সাড়ে ছয় বছরে (২০২০ থেকে ২০২৬ সালের প্রথম পাঁচ মাস) ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এইচটিসি সেন্টারে ১৩ হাজার ৬৮৭ জনের এইচআইভি পরীক্ষা করা হয়। এদের মধ্যে ১২২ জনের এইচআইভি শনাক্ত হয়। আক্রান্তদের মধ্যে শিক্ষার্থী, তরুণ-তরুণী, কর্মজীবী, বিবাহিত নারী-পুরুষ, এমনকি শিশুও রয়েছে। এইচটিসি সেন্টারে শনাক্ত হওয়া ১২২ জন ছাড়াও ময়মনসিংহের বিভিন্ন হাসপাতাল ও এনজিওর স্বাস্থ্যকেন্দ্রে আরও ১২৬ জনের এইচআইভি শনাক্ত হয়। এর মধ্যে বন্ধু সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার সোসাইটির ময়মনসিংহ শাখায় এইচআইভি শনাক্ত হয় ৪৬ জনের। সব মিলিয়ে এইচআইভি আক্রান্ত হন মোট ২৪৮ জন। তারা সবাই ময়মনসিংহ বিভাগের বাসিন্দা। এদের মধ্যে পাঁচজন মারা গেছেন। বাকি ২৪৩ জন মমেক হাসপাতালের এইচটিসি সেন্টারের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা নিচ্ছেন। তাদের বয়স ১৮ থেকে ৪৫ বছরের মধ্যে হলেও সবচেয়ে বেশি সংক্রমণ হয়েছেন ১৮ থেকে ২৫ বছর বয়সী।
উদ্বেগ বাড়াচ্ছে দ্রুত বৃদ্ধি
এইচটিসি সেন্টার সূত্রে জানা গেছে, ২০২০ সালে এক হাজার জনের এইচআইভি পরীক্ষা করে একজনের এইচআইভি শনাক্ত হয়। ২০২১ সালে ২ হাজার ৩৯২ জনের পরীক্ষা করে একজনের এইচআইভি শনাক্ত হয়। ২০২২ সালে ১ হাজার ৭২৯ জনের পরীক্ষা করে ১০ জনের এইচআইভি শনাক্ত হয়। ২০২৩ সালে ৩ হাজার ২৯৬ জনের পরীক্ষা করে ১৬ জনের এইচআইভি শনাক্ত হয়। ২০২৪ সালে ২ হাজার ২১৭ জনের পরীক্ষা করে ৩১ জনের এইচআইভি শনাক্ত হয়। ২০২৫ সালে ২ হাজার ২৬৭ জনের পরীক্ষা করে ৪৩ জনের এইচআইভি শনাক্ত হয় এবং ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত ৭৮৬ জনের পরীক্ষা করে ২০ জনের এইচআইভি শনাক্ত হয়েছে।
এই তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালে একজন, ২০২১ সালে একজন, ২০২২ সালে ১০ জন, ২০২৩ সালে ১৬ জন, ২০২৪ সালে ৩১ জন, ২০২৫ সালে ৪৩ জন ও ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত ২০ জন হয়েছেন।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সংখ্যা শুধু পরিসংখ্যান নয়; এটি সমাজের জন্য একটি সতর্কসংকেত।
এটি কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর রোগ নয়
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এইচটিসি সেন্টারের ফোকাল পারসন ডা. আরিফ মাহবুব বলেন, শুধু তরুণদের নৈতিক অবক্ষয়কে দায়ী করলে সমস্যার প্রকৃত চিত্র পাওয়া যাবে না। শিক্ষার্থী, বিবাহিত নারী-পুরুষসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার ব্যক্তিদের শরীরে এইচআইভি শনাক্ত হচ্ছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মানুষ যেন ভয় বা লজ্জার কারণে পরীক্ষা থেকে দূরে না থাকেন।
সমকামীদের চেয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যেই বেশি শনাক্ত
হাসপাতালসংশ্লিষ্টদের মতে, প্রচলিত ধারণার বিপরীতে বর্তমানে সমকামী জনগোষ্ঠীর তুলনায় সাধারণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে বেশি এইচআইভি শনাক্ত হচ্ছে। এইচটিসি সেন্টারের কাউন্সিলর কাম অ্যাডমিনিস্ট্রেটর মো. আবদুল আল মামুন বলেন, স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী যেমন আক্রান্ত হচ্ছেন, তেমনি সাধারণ মানুষও আক্রান্ত হচ্ছেন। কেউ কেউ আক্রান্ত মা-বাবার মাধ্যমে জন্মগতভাবে সংক্রমিত হচ্ছেন।
তিনি আরও বলেন, মানবদেহের নির্দিষ্ট কিছু তরল পদার্থ–যেমন রক্ত, বীর্য ও বুকের দুধের মাধ্যমে এই ভাইরাস ছড়ায়। অনিরাপদ যৌন সম্পর্ক এবং একই সুই-সিরিঞ্জ ব্যবহারও বড় ঝুঁকি। হাসপাতালের এইচটিসি সেন্টারে প্রতিদিন ৭ থেকে ১৫ জন আসছেন পরীক্ষা করাতে। শনাক্ত হওয়া রোগীদের প্রতি তিন মাস পরপর ফলোআপ করা হচ্ছে। দেওয়া হচ্ছে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা। এ ছাড়া কাউন্সেলিং করা হচ্ছে। গুরুতর রোগীদের ঢাকার মহাখালীতে অবস্থিত সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে পাঠানো হচ্ছে।
প্রান্তিক জনগোষ্ঠীতেও উদ্বেগজনক চিত্র
ট্রান্সজেন্ডার, হিজড়া ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে কাজ করে বন্ধু সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার সোসাইটি। এখন সংস্থাটির ময়মনসিংহ শাখার ড্রপ-ইন সেন্টার ম্যানেজার আব্দুল্লাহ আল আশিক বলেন, ‘আমাদের সেন্টারে এইচআইভি পরীক্ষা করা হচ্ছে। যাদের শরীরে এইচআইভি শনাক্ত হয়, তাদের দ্রুত চিকিৎসার আওতায় আনার জন্য ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এইচটিসি সেন্টারে পাঠিয়ে দিচ্ছি।’
ওষুধসংকটে বাড়ছে ভোগান্তি
এইচআইভি আক্রান্তদের জন্য হাসপাতালের এইচটিসি সেন্টারে বিনামূল্যে এআরভি (ARV) ওষুধ দেওয়া হচ্ছে। তবে রোগীদের সাধারণ স্বাস্থ্যসেবার জন্য আগে যে সহায়ক ওষুধ সরবরাহ করা হতো, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে তার সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। এর ফলে রোগীদের অনেক প্রয়োজনীয় ওষুধ এখন নিজ খরচে কিনতে হচ্ছে। অনেক রোগী আর্থিকভাবে দুর্বল। তাদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে।
সমাজের জন্য সতর্কবার্তা
শিক্ষাবিদ লে. কর্নেল (অব.) ড. মো. শাহাব উদ্দিন বলেন, তরুণদের মধ্যে বাড়তে থাকা সংক্রমণ, শিক্ষার্থীদের আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা এবং জন্মগত সংক্রমণের নজির–সব মিলিয়ে এটি শুধু স্বাস্থ্য খাতের নয়, পুরো সমাজের জন্য একটি সতর্কবার্তা। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক ও ধর্মীয় সংগঠনগুলোকে সচেতনতা বৃদ্ধিতে আরও সক্রিয় হতে হবে। শিক্ষার্থীসহ সাধারণ মানুষকে জানতে হবে এইচআইভি কীভাবে ছড়ায় এবং কীভাবে ছড়ায় না। নীরবে ছড়িয়ে পড়া এই সংক্রমণ ঠেকাতে এখনই কার্যকর উদ্যোগ না নিলে আগামী দিনের চিত্র আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠতে পারে। ভুল ধারণা ও সামাজিক কুসংস্কার দূর করতে না পারলে সংক্রমণ প্রতিরোধ কঠিন হবে।
সচেতনতা ছাড়া বিকল্প নেই
এ বিষয়ে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. মুহম্মদ মাঈন উদ্দিন খান বলেন, হাসপাতালে আসা প্রত্যেক রোগীকে যথাযথ চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে। ভয় বা লজ্জার কারণে পরীক্ষা না করিয়ে রোগ গোপন রাখা সবচেয়ে বড় ঝুঁকি। যত দ্রুত শনাক্ত হবে, চিকিৎসার ফল তত ভালো হবে। তাই প্রয়োজন সচেতনতা, দ্রুত পরীক্ষা এবং নিয়মিত চিকিৎসা।
তিনি বলেন, সাধারণ স্বাস্থ্যসেবার জন্য আগে যে সহায়ক ওষুধ সরবরাহ করা হতো সেগুলো রোগীরা বিনামূল্যে আবারও যাতে পান, সে ব্যবস্থা করা হবে।