শীতের সকালে আখের রসে মুখ ভেজানোর যে গ্রামীণ ঐতিহ্য, তা আজ কেবল স্মৃতির পাতায়। একসময় মৌলভীবাজার জেলার রাজনগরের প্রত্যন্ত মিঠিপুর গ্রামে শীত এলেই জমে উঠত আখ মাড়াই উৎসব।
এখানকার মাঠের এক কোনে মহিষের টানে ঘুরত আখ মাড়াই কল। পুরুষরা করতেন মাড়াই আর নারীরা বড় হাঁড়িতে জ্বাল দিতেন আখের রস। সেই রসে তৈরি হতো সুস্বাদু লালিগুড়। তখন বাতাসে ভেসে বেড়াত গুড়ের মোহনীয় এক গন্ধ।
সময় বদলেছে। আধুনিকতার ছোঁয়ায় বিলীন হয়ে যাচ্ছে সেই সোনালি দিন। এখন আর মহিষের টানে মাড়াই হয় না, জায়গা করে নিয়েছে ডিজেলচালিত পাওয়ার মেশিন। নেই আগের মতো সকালের ব্যস্ততা, নেই কিশোরদের দল বেঁধে রস খাওয়ার আনন্দ।
গ্রামের কৃষ্টি আর আত্মিক বন্ধনের এই চিত্র আজ হারিয়ে যাচ্ছে সময়ের স্রোতে। তবু গ্রামের বয়োজ্যেষ্ঠরা আজও স্মৃতিচারণ করেন আখ, গুড় আর রসের সেই প্রাণবন্ত দিনগুলোর কথা।
রাজনগরের টেংরাজার ইউনিয়নে গিয়ে মনু নদে নৌকা পাড়ি দিয়ে মেঠোপথ ধরে হাঁটলেই ধীরে ধীরে বদলে যেতে থাকে চারপাশের চিত্র। এ স্থানটি কামারচাঁক ইউনিয়নের মিঠিপুর গ্রাম। যেখানে এখনো টিকে আছে আখ মাড়াইয়ের প্রাচীন ঐতিহ্য।
এখানে ভোরের আলো ফোঁটার আগেই মাঠে নামেন চাষিরা। খেত থেকে কাটা আখ সূর্যোদয়ের আগেই মাড়াই করে রস সংগ্রহ করেন তারা। এরপর শুরু হয় ব্যস্ততা। কেউ রস বিক্রি করছেন, কেউবা হাঁড়িতে রস জ্বাল দিয়ে বানাচ্ছেন লালিগুড়।
সরেজমিন কয়েকজন আখ চাষির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, একসময় মিঠিপুর গ্রামের শতাধিক পরিবার আখ চাষে জড়িত থাকলেও এখন টিকে আছে মাত্র ৫-৭টি পরিবার। তারা বলছেন, আখ চাষ লাভজনক হলেও খরচ বেড়েছে, আধুনিক মাড়াইযন্ত্র না থাকায় টিকে থাকতে হচ্ছে কষ্ট করে। লাভজনক হওয়ায় মনুপাড়ের অনেক চাষি এখন আখ চাষে আগ্রহী হয়ে উঠছেন।
কথা হয় মিঠিপুর গ্রামের আখ চাষি পঞ্চাশোর্ধ্ব সিরাজুল ইসলাম গেন্দুর সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘প্রায় ৩৫ বছর ধরে আমি আখ চাষ করছি। বাবার পর আমি আখের চাষ ধরে রেখেছি। এখন যে কদিন বাঁচব, পূর্ব-পুরুষদের এ ব্যবসা ধরে রাখব।’
তিনি জানান, অনেককাল আগে থেকেই মিঠিপুরে প্রচুর আখ চাষ হয়ে আসছে। এর রস মিঠা হওয়ায় গ্রামের নাম হয়েছে মিঠিপুর। তবে এখন আখ চাষ অনেক কমে গেছে। তিনি ৩ কিয়ার জমিতে আখ চাষে প্রায় ৫০ হাজার টাকা খরচ করে এখন পর্যন্ত ১ লাখ টাকা বিক্রি করেছেন। আরও দেড় লাখ টাকা বিক্রির আশা করছেন। প্রায় ২০ বছর ধরে তিনি মহিষের বদলে যন্ত্র দিয়ে আখ মাড়াই করছেন। নিজের খেতের আখ মাড়াই ছাড়াও ভাড়ায় অন্যদের আখও মাড়াই করেন তিনি।
আলাপকালে কয়েকজন আখ চাষি জানান, এখানে ডিসেম্বর মাসের শুরু থেকেই আখ মাড়াই হয়। ভোর থেকেই শুরু হয় তাদের কাজ। প্রথমে আখ মাড়াই। সকালে খুচরা বিক্রির জন্য বিভিন্ন জায়গার পাইকাররা আখের রস নিতে আসেন। তাদের রস দেওয়ার পর চুলায় বড় হাঁড়িতে বসানো হয় বাড়তি রস। জ্বাল দিয়ে তৈরি করা হয় গুড় ও তরল লালি। এ রস, গুড় ও লালি সবটাই পাইকাররা বাড়ি থেকে এসে নিয়ে যান। অনেক সময় গ্রাহকের চাহিদামতো হাটে বা নির্দিষ্ট স্থানে তা পৌঁছে দেওয়া হয়। এখানে প্রতি লিটার আখের রস ৬০ টাকা, প্রতি কেজি গুড় ২৫০ টাকা এবং লালির কেজি ২২০ টাকা বিক্রি হয়।
প্রবীণ শিক্ষক আব্দুল আজিজ বলেন, ‘এ জনপদের শীতের সকাল মুখর হয় আখের রসের পিঠা, মিষ্টি গুড়ের পিঠা আর মিষ্টি খিচুড়ির গন্ধে। গ্রামীণ জীবনের সরলতা আর স্বাদ মিশে থাকা এ ঐতিহ্য এখানকার মানুষের গর্ব, আর আগত অতিথিদের কাছে এক অনন্য অভিজ্ঞতা।’
মৌলভীবাজারের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. জালাল উদ্দিন বলেন, ‘জেলায় সামান্য আখের চাষ হয়ে থাকে। তবে সমতল ভূমিতে আখ চাষ করার সুযোগ রয়েছে। পাশাপাশি কৃষকদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।’