ঢাকার ধামরাইয়ে চিকিৎসাসেবার নামে অপচিকিৎসা দিয়ে যাচ্ছে পপুলার ডিজিটাল ডায়াগনস্টিক সেন্টার অ্যান্ড হাসপাতাল। নামের মিলের কারণে অনেকেই এটিকে দেশের স্বনামধন্য পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টার লিমিটেডের শাখা ভেবে চিকিৎসা নিচ্ছেন। অথচ ধামরাইয়ের এই হাসপাতালটির নেই বৈধ নিবন্ধন। এখানে চিকিৎসা নিয়ে বহু রোগী পড়েছেন বিপাকে।
ভুক্তভোগী ও স্থানীয় সূত্রের দাবি, হাসপাতালটিতে সিজারিয়ান ও অন্যান্য অস্ত্রোপচারের পর অন্তত ২২ রোগীর শরীরে মারাত্মক সংক্রমণ দেখা দিয়েছে। কারও কারও ক্ষেত্রে একই স্থানে একাধিকবার অস্ত্রোপচার করতে হয়েছে। অনেক রোগীর শরীরে অস্ত্রোপচারের ক্ষতস্থানে পচন, ইনফেকশন এমনকি যক্ষার মতো জটিল রোগ ধরা পড়েছে। একাধিক ভুক্তভোগীর ভাষ্য, আক্রান্তের সংখ্যা অর্ধশতাধিক হতে পারে।
অভিযোগ রয়েছে, অপারেশন থিয়েটারে পর্যাপ্ত স্টেরিলাইজেশনের অভাব, দায়িত্বহীন সার্জিক্যাল টিম ও প্রশাসনিক গাফিলতির কারণেই একই ধরনের সংক্রমণে একের পর এক রোগী আক্রান্ত হচ্ছেন। অনেকেই চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে হয়েছেন নিঃস্ব। বিষয়টি জানতে পেয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা আইইডিসিআরকে চিঠি দেয়। সেখান থেকে তদন্তে আসে একটি টিম। তবে তদন্তে সত্যতা মিললেও কোনো আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। কেন ওই হাসপাতালের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, তা নিয়েও সমালোচনার ঝড় বইছে।
সরেজমিনে গিয়ে জানা গেছে, গত ১৩ এপ্রিল সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে কন্যাসন্তানের জন্ম দেন সুমি আক্তার (২৬)। অস্ত্রোপচারের ৩২ দিন পর তার সেলাইয়ের স্থানে ফোলা, তীব্র ব্যথা ও পচন দেখা দেয়। পুনরায় ওই হাসপাতালে গেলে দ্বিতীয় দফা অস্ত্রোপচার করা হয় এবং ৫০ হাজার টাকা বিল আদায় করা হয়। এরপরও অবস্থার অবনতি হলে পরীক্ষায় তার শরীরে যক্ষ্মার সংক্রমণ ধরা পড়ে। পরে মানিকগঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তৃতীয় দফা অস্ত্রোপচার করতে হয়।
সুমি আক্তার বলেন, ‘পপুলার হাসপাতালে ভুল চিকিৎসার কারণে আমি এখন যক্ষ্মায় আক্রান্ত। তিনবার অপারেশন করতে হয়েছে। চিকিৎসায় ৪-৫ লাখ টাকা খরচ হয়ে গেছে। পরিবার এখন চরম সংকটে।’ কথা বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।
একই হাসপাতালে গত ২৮ মে সন্ধ্যায় ঈসিতা আক্তার (১৮) ও স্বপ্না আক্তারের সিজারিয়ান অস্ত্রোপচার হয়। কয়েক দিনের মধ্যেই দুজনের ক্ষতস্থানে একই ধরনের জটিলতা দেখা দেয়। পরে একাধিকবার অস্ত্রোপচার ও চিকিৎসায় তাদের খরচ হয় ৩-৪ লাখ টাকা। সন্তান জন্মের সাত-আট মাস পার হলেও এখনো নিয়মিত ড্রেসিং ও যক্ষ্মার ওষুধ নিতে হচ্ছে তাদের।
সোমভাগ ইউনিয়নের দেপাশাই গ্রামের ভুক্তভোগী স্বপ্না আক্তার বলেন, ‘একই জায়গায় বারবার অপারেশন হয়েছে। ছয় মাসেও পুরোপুরি সুস্থ হইনি। কাজ করতে পারছি না। চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে পরিবার হিমশিম খাচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘গত ২৮ মে ওই হাসপাতালে সিজারের জন্য ভর্তি হই। ডাক্তার তানজিলা সুলতানা সিজার করেন। হাসপাতাল থেকে রিলিজ নেওয়ার দুই মাস পরও ঘা না শুকানোয় গত ১৯ জুলাই পুনরায় ভর্তি হই। আবারও অপারেশন করা হয়। এরপর যক্ষ্মা ধরা পড়ে। এখনো পুরোপুরি সুস্থ হয়নি। চিকিৎসার টাকার জন্য হিমশিম খাচ্ছে পরিবার।’
এ ছাড়া গত ১৫ জুন জরায়ুর অপারেশন করানো রহিমা বেগমের শরীরেও মারাত্মক সংক্রমণ দেখা দিয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, হাসপাতালে ফিরে গেলে মালিকপক্ষ দায়িত্ব নেওয়ার বদলে তাকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে কথা বলে। পরে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গিয়ে সর্বস্বান্ত হয় পরিবার।
ব্র্যাকের ধামরাই শাখার যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির প্রোগ্রাম অফিসার তানিয়া সুলতানা জানান, সম্প্রতি কালামপুর এলাকার ওই হাসপাতাল থেকে আসা একাধিক যক্ষ্মা রোগী তাদের কাছে নিয়মিত চিকিৎসা নিচ্ছেন। তবে রোগীর সংখ্যাসংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য দিতে তিনি অপারগতা প্রকাশ করেন।
হাসপাতালের এক কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত যেসব সিজারিয়ান ও অস্ত্রোপচার হয়েছে, তাদের অধিকাংশের মধ্যেই জটিলতা দেখা দিয়েছে।
হাসপাতালের পরিচালক রাশেদুল ইসলাম রফিক স্বীকার করে বলেন, ৫০ জন নয়, এমন ভুক্তভোগী রোগীর সংখ্যা ২০ জন বা এর একটু বেশি হতে পারে। আমাদের হাসপাতালে একজন যক্ষ্মা রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির অপারেশন হয়েছিল। সেখান থেকে রোগটি ছড়িয়ে পড়ে। যারা চিকিৎসা নিয়ে আক্রান্ত হয়েছেন, তাদের দায়ভার আমরা নেব। পপুলার হাসপাতাল নেবে। এ কথা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।’ সামনে আর এ ধরনের সমস্যা হবে না বলে জানান তিনি।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মঞ্জুর আল মোর্শেদ চৌধুরী জানান, তদন্তে আট রোগীর শরীরে যক্ষ্মার সংক্রমণ পাওয়া গেছে। তবে আক্রান্তদের পরিচয় বা হাসপাতালের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা না নেওয়ার বিষয়ে তিনি স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা দেননি।
এ বিষয়ে ঢাকা জেলা সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ জিল্লুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তাকেও পাওয়া যায়নি।
একই হাসপাতালে একসঙ্গে এত রোগীর মারাত্মক সংক্রমণে আক্রান্ত হওয়াকে সাধারণ চিকিৎসাগত ভুল নয় বলে মনে করছেন ভুক্তভোগীরা। তাদের দাবি, অবিলম্বে অবৈধ হাসপাতালটি বন্ধ করে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।