রাজবাড়ীতে জলাতঙ্কের ভ্যাকসিনসংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। এক মাসেরও বেশি সময় ধরে সদর হাসপাতালে জলাতঙ্কের টিকা র্যাবিস ভ্যাকসিনের সরবরাহ নেই। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোর অবস্থা আরও ভয়াবহ। সেখানে এক বছরের বেশি সময় ধরে ভ্যাকসিন নেই। জেলার কোনো ফার্মেসিতে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ভ্যাকসিনও পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে কুকুরসহ বিভিন্ন প্রাণীর কামড়ে আক্রান্ত ভুক্তভোগীদের ভ্যাকসিন সংগ্রহে এক জেলা থেকে আরেক জেলায় দৌড়-ঝাঁপ করতে হচ্ছে।
রাজবাড়ী সদর হাসপাতাল সূত্র জানায়, প্রতি মাসে গড়ে সাড়ে ৩ হাজার থেকে ৪ হাজার মানুষ এই হাসপাতাল থেকে জলাতঙ্কের টিকা নিয়ে থাকেন। তবে গত বছরের ১৩ ডিসেম্বর থেকে সদর হাসপাতালে র্যাবিস ভ্যাকসিনের সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। অথচ প্রতিদিনই জেলার বিভিন্ন স্থানে কুকুর, বিড়াল, ইঁদুর, শিয়ালসহ নানা প্রাণীর কামড়ে সব বয়সী মানুষ আক্রান্ত হচ্ছেন।
রাজবাড়ী সদর হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, দ্বিতীয় তলায় জলাতঙ্কের ভ্যাকসিন দেওয়ার ২০৩ নম্বর কক্ষের দরজায় সাদা কাগজে বড় অক্ষরে লেখা, ‘গত ১৩/১২/২০২৫ তারিখ থেকে র্যাবিস ভ্যাকসিন সাপ্লাই নেই।’ বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা রোগীরা ভ্যাকসিন না পেয়ে হতাশ হয়ে ফিরে যাচ্ছেন। কেউ কেউ বাধ্য হয়ে ঢাকা বা অন্য জেলা থেকে বেশি দামে ভ্যাকসিন সংগ্রহ করছেন।
ভ্যাকসিন নিতে আসা সিরাজ উদ্দিন নামে এক ব্যক্তি জানান, ১০ দিন আগে তাকে কুকুরে কামড় দেয়। রাজবাড়ী সদর হাসপাতালে ভ্যাকসিন না পেয়ে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে প্রথম ডোজ সংগ্রহ করেন। দ্বিতীয় ডোজ নিতে তাকে যেতে হয় পাবনায়। এখনো দুই ডোজ নেওয়া বাকি থাকলেও হাসপাতালে এসে ভ্যাকসিন না পেয়ে বিপাকে পড়েছেন তিনি।
রাজবাড়ী সদর উপজেলার বাসিন্দা জামিরুল ইসলাম জানান, তার ভাতিজাকে কুকুরে কামড় দেওয়ার পর প্রথমে সদর হাসপাতালে ভ্যাকসিন পাননি। পরে রাজবাড়ী ও ফরিদপুরের বিভিন্ন ফার্মেসিতে খোঁজ করেও না পেয়ে ঢাকার ধানমন্ডি থেকে ভ্যাকসিন সংগ্রহ করতে হয়। এখনো তিন ডোজ নেওয়া বাকি থাকলেও এবার হাসপাতালে এসে ভ্যাকসিন না পাওয়ায় হতাশ তিনি। তার ভাষায়, ‘হাসপাতালে ভ্যাকসিন না থাকা খুবই দুঃখজনক।’
মিজানপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা শফিকুল ইসলাম জানান, ভ্যাকসিনের জন্য ঘুরে ঘুরে তিনি ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন। প্রথম ডোজ অনেক কষ্টে বেশি দামে সংগ্রহ করেছিলেন, এখন টাকা দিয়েও ভ্যাকসিন পাচ্ছেন না।
এদিকে গত ৭ জানুয়ারি ফরিদপুর ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধায়ক মো. রোকনুজ্জমান রাজবাড়ীর সিভিল সার্জনকে এক চিঠিতে জানান, রাজবাড়ী সদর হাসপাতালসহ উপজেলা হাসপাতালসংলগ্ন ফার্মেসিগুলোতে পর্যাপ্ত র্যাবিস ভ্যাকসিন সরবরাহ নিশ্চিত করতে পপুলার ফার্মাসিউটিক্যাল লিমিটেড ও ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যাল লিমিটেডের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মৌখিক নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
পপুলার ফার্মাসিউটিক্যাল লিমিটেডের এরিয়া ম্যানেজার বরকত উল্লাহ মোবাইল ফোনে জানান, কাঁচামালের সংকটের কারণে এতদিন ভ্যাকসিন উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। তবে কাঁচামাল পাওয়া গেছে এবং উৎপাদন প্রক্রিয়া চলছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে চলতি মাসের ২০ তারিখের মধ্যে ভ্যাকসিন পাওয়া যেতে পারে। তিনি বলেন, উৎপাদনের পর ট্রায়াল ও কার্যকারিতা পরীক্ষা শেষে বাজারে সরবরাহ করা হয়।
রাজবাড়ী বাজারের পোদ্দার মেডিকেল হলের মালিক নারায়ণ পোদ্দার জানান, গত ১৫ দিনের বেশি সময় ধরে র্যাবিস ভ্যাকসিন সরবরাহ না থাকায় তারা বিক্রি করতে পারছেন না। প্রতিদিন পাঁচ থেকে সাতজন ক্রেতা ভ্যাকসিনের খোঁজে আসছেন।
রাজবাড়ী সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. এস এম এ হান্নান জানান, গত তিন সপ্তাহ ধরে সরকারিভাবে এবং বেসরকারি পর্যায়েও জলাতঙ্কের ভ্যাকসিনের সংকট চলছে। তিনি বলেন, বাইরে থেকে রোগীরা যেভাবে ভ্যাকসিন এনে প্রয়োগ করছেন, তাতে ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়, কারণ এই ভ্যাকসিন নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করা জরুরি।
বালিয়াকান্দি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. ফারুক হোসেন জানান, গত এক বছরের বেশি সময় ধরে সেখানে র্যাবিস ভ্যাকসিনের সরবরাহ নেই। প্রতিদিন চার-পাঁচজন রোগী এলেও তাদের ভ্যাকসিন কিনে নিতে বা সদর হাসপাতালে যেতে বলা ছাড়া বিকল্প নেই।
রাজবাড়ীর সিভিল সার্জন ডা. এস এম মাসুদ বলেন, সরকারি ও বেসরকারি উভয় পর্যায়েই র্যাবিস ভ্যাকসিনের সংকট চলছে। বিষয়টি ঔষধ প্রশাসনকে জানানো হয়েছে। বেসরকারি পর্যায়ে দুই সপ্তাহের মধ্যে সরবরাহ স্বাভাবিক হতে পারে। তবে সরকারি পর্যায়ে ভ্যাকসিন পেতে আরও দেড় থেকে দুই মাস সময় লাগতে পারে।