নির্বাচন কমিশনের (ইসি) ওয়েবসাইট থেকে সাংবাদিকের ব্যক্তিগত ও সংবেদনশীল তথ্য জনসমক্ষে উন্মুক্ত হওয়ার ঘটনায় জিডি করতে গিয়ে হয়রানির মুখে পড়েছেন সিলেটের এক লেখক-সাংবাদিক।
জানা গেছে. সিলেট টুডে২৪ ডটনিউজের প্রধান সম্পাদক ও আইনিউজের এডিটর-অ্যাট-লার্জ কবির আহমদ চৌধুরী (কবির য়াহমদ) গত রবিবার (১৫ ফেব্রুয়ারি) সিলেট কোতোয়ালি থানায় অনলাইনে জিডির আবেদন করেন। বর্তমানে সব জিডি অনলাইনে নিলেও কবির আহমদ চৌধুরীর জিডির জন্য অধিকতর তথ্যসহ থানায় এসে যোগাযোগ করা জন্য বলা হয়েছে। তবে সাংবাদিক কবির আহমদ চৌধুরীর দাবি সব তথ্য দিয়েই অনলাইনে জিডির আবেদন করেছেন তিনি।
জিডি তিনি উল্লেখ করা হয়, ‘গত ৩১ জানুয়ারি দেশের অধিকাংশ গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদে আমি গভীর উদ্বেগের সঙ্গে অবগত হয়েছি যে, রাষ্ট্রীয় সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান নির্বাচন কমিশন-ইসি থেকে ১৪ হাজার সাংবাদিকের ব্যক্তিগত ও সংবেদনশীল তথ্য (এনআইডি, ছবি, স্বাক্ষর, মোবাইল নম্বর ও পেশাগত পরিচয়) জনসমক্ষে উন্মুক্ত হয়ে পড়েছে। ২০২৬ এর সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের জন্যে সাংবাদিক কার্ডের আবেদন করতে ৩০ জানুয়ারি নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে আমার ব্যবহৃত ০১৯৯৬**** নম্বর থেকে নিবন্ধনের সবগুলো ধাপ সম্পন্ন করি। নির্বাচন ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে এবং পেশাদার সাংবাদিক হিসেবে এই নির্বাচনে আমি আমার পেশাগত দায়িত্বও পালন করেছি। ইসির ওয়েবসাইটে সাংবাদিকদের দেওয়া তথ্য উন্মুক্ত হয়ে যাওয়ার সংবাদ ও প্রেক্ষাপটে আমি ভবিষ্যৎ বিবিধ ঝুঁকির উদ্বেগের মধ্যে রয়েছি। ডিজিটাল সিকিউরিটি নিশ্চিত করতে এবং ভবিষ্যতে এই তথ্যের অপব্যবহারে সৃষ্ট যেকোনো অপরাধের দায়ভার থেকে মুক্ত থাকার লক্ষ্যে বিষয়টি সাধারণ ডায়েরিভুক্ত করার প্রয়োজন মনে করছি। তবে নির্বাচন সংক্রান্ত কাজে ব্যস্ততার কারণে আমি তাৎক্ষণিক সাধারণ ডায়েরি করতে পারিনি।’
তথ্য ফাঁসের ঘটনা নানা রকম ঝুঁকির মধ্যে আছেন উল্লেখ করে সাংবাদিক কবির আহমদ চৌধুরী খবরের কাগজকে বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন রাষ্ট্রীয় সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান যদি নাগরিকের ব্যক্তিগত ও সংবেদনশীল তথ্যের (এনআইডি, ছবি, স্বাক্ষর, মোবাইল নম্বর ও পেশাগত পরিচয়) গোপনীয়তা রক্ষা করতে না পারে তবে আমরা যাব কোথায়? রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে ইসির প্রতি আমাদের সর্বোচ্চ পর্যায়ের আস্থা ছিল। কিন্তু আমাদের তথ্য ফাঁসের ঘটনা আমাদেরকে নানা রকম ঝুঁকির মুখে ফেলে দিয়েছে। অন্য অনেকের মতো আমার ব্যক্তিগত তথ্য বেহাত হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকার কারণে আমি পরিচয় চুরি, ব্ল্যাকমেইল এবং পেশাগত কারণে বিবিধ সমস্যার মুখে পড়ার তীব্র আশঙ্কায় রয়েছি। আমার এনআইডি ও মোবাইল নম্বর ব্যবহার করে আমার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, মোবাইল ব্যাংকিং (বিকাশ-নগদ-রকেট) হ্যাকিং বা আমার অজান্তে আর্থিক দায়বদ্ধতা তৈরির প্রবল ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। আমার ব্যক্তিগত তথ্যের এই উন্মুক্ততা আমার সম্মান, সামাজিক ও পেশাগত ভাবমূর্তিকে সংকটের মুখে ফেলে দেওয়ার শঙ্কার মধ্যে রয়েছি।’
অনলাইনে জিডির আবেদন ও তথ্য নিয়ে থানায় আসার নির্দেশনা বিষয়ে সাংবাদিক কবির আহমদ চৌধুরী খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমার এই ব্যক্তিগত তথ্যগুলো যদি দুষ্টু লোকের হাতে পড়ে তবে আমাদের রক্ষা করবে কে? এই তথ্য যদি ডার্ক ওয়েবে যায়, তবে যে শঙ্কা-সেটা আমরা কীভাবে মোকাবিলা করব। এখানে আমাদের সুরক্ষার প্রাথমিক যে ধাপ, সেটা হচ্ছে রাষ্ট্রকে এবং আইনশৃঙ্খলার রক্ষার দায়িত্বে থাকা কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা। অবহিত করার প্রাথমিক পথ হচ্ছে থানায় সাধারণ ডায়েরি-জিডি করে রাখা। কিন্তু অনলাইনে জিডির আবেদনের পর যদি থানা কর্তৃপক্ষ তথ্যসহ থানায় উপস্থিত হওয়ার পরামর্শ দেয়, তবে অনলাইনে জিডি আবেদনের কী দরকার? সিলেট কোতোয়ালি থানা পুলিশ যা করছে এটাকে হয়রানি এবং নাগরিককে অসহযোগিতা বলে মনে করছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমিসহ হাজার হাজার নিবন্ধিত সাংবাদিকের তথ্য ফাঁসের ঘটনা জাতিসংঘ স্বীকৃত মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণাপত্রের ১২ নম্বর অনুচ্ছেদের সরাসরি লঙ্ঘন, যেখানে বলা হয়েছে- কারও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, পরিবার, গৃহ কিংবা চিঠিপত্রের আদান-প্রদানে যথেচ্ছ হস্তক্ষেপ করা যাবে না এবং তার সম্মান ও সুনামের ওপর আঘাত করা যাবে না। এ রূপ হস্তক্ষেপ বা আঘাতের বিরুদ্ধে প্রত্যেকেরই আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার রয়েছে। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত এই অধিকারকে বাংলাদেশ সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৪৩, ৩২ এবং ৩১ দেশীয় আইনে সুপ্রতিষ্ঠিত ও সুরক্ষিত করলেও ইসির এই দায়িত্বহীনতা সেই সুরক্ষা বলয়কে ঝুঁকির মুখে ফেলে দিয়ে ইসিতে নির্বাচনের জন্যে সাংবাদিক পরিচয়পত্রের জন্যে আবেদিত সাংবাদিকদের জন্যে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, এবং আমিও এর অংশ। কিন্তু অনলাইনে আবেদনের পর যদি তথ্যের দোহাই দিয়ে থানায় যাওয়ার নির্দেশনা দেয় পুলিশ প্রশাসন, তাহলে এটাকে হয়রানি আর অসহযোগিতা ছাড়া আর কিছু বলা যায় না।’
এই বিষয়ে সিলেট কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খান মো. মাইনুল জাকির খবরের কাগজকে বলেন, উনি অনলাইনে যে জিডি করেছেন সেটা অসম্পূর্ণ তাই তাকে থানায় এসে প্রয়োজনীয় সব তথ্য দিয়ে জিডির প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে। তারপর জিডিটি গ্রহণ করা হবে।
শাকিলা ববি/সুমন/