সম্প্রতি সিলেট নগরীর পাড়া মহল্লাগুলোর ভিতর কিশোরদের রাত-বিরাতে আড্ডা দেওয়া ও তুচ্ছ বিষয় নিয়ে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ার প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। পাশাপাশি দিনে দুপুরে বেড়েছে ছিনতাইকারীদের উৎপাত। এ অবস্থায় কিশোর গ্যাং ও ছিনতাইকারীদের উৎপাত ঠেকাতে তাদের বিরুদ্ধে বড় ধরনের অভিযানে নেমেছে মহানগর পুলিশ। গত তিন দিনের অভিযানে নগরীর বিভিন্ন এলাকা থেকে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য ও ছিনতাইকারী অভিযোগে ১৭ জনকে গ্রেপ্তার করেছে সিলেট মহানগর পুলিশ।
গতকাল রবিবার ভোর ৪টার দিকে সিলেট নগরীর বন্দরবাজারের রংমহল টাওয়ার সংলগ্ন ড্রেন থেকে ৭ ছিনতাইকারীকে গ্রেপ্তার করে কোতোয়ালি থানা পুলিশ। এসময় তাদের কাছ থেকে ৪টি চাকু, ছিনতাইকৃত টাকা ও ছিনতাইকাজে ব্যবহৃত অন্যান্য সরঞ্জাম উদ্ধার করে পুলিশ।
সিলেট কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খান মো. মাইনুল জাকির খবরের কাগজকে বলেন, আটক ছিনতাইকারীদের নিরাপদ আস্তানা ছিল ড্রেনের ভেতরে। চুরি-ছিনতাই করে তারা সবার চোখের সামনে নিমিষেই উধাও হয়ে যেত, আশ্রয় নিতো তাদের নিরাপদ আস্তানায়। সেই আস্তানা হচ্ছে বন্দরবাজারের রংমহল টাওয়ার সংলগ্ন ড্রেন। ৭ ছিনতাইকারীকে সেই আস্তানা থেকে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়।
গ্রেপ্তার কিশোররা হলো- মৌলভীবাজারের রাজনগর থানার দাসপাড়া গ্রামের মৃত ছাত্তার ও স্বপনা বেগমের ছেলে বর্তমানে ইমন আহমদ (২০), মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল থানার শাপলাবাগ এলাকার মালেক মিয়া ও রুমি বেগমের ছেলে ইমন (১৮), সুনামগঞ্জের দক্ষিণ সুনামগঞ্জ থানার বীরগাঁও খাপাড় গ্রামের লাল মিয়া ও শেবারুন বেগমের ছেলে বর্তমানে সিলেট নগরীর কাজীটুলা সুলতান মিয়ার কলোনির বাসিন্দা শাহান আহমদ (১৮), এয়ারপোর্ট থানার বাইশটিলা এলাকার মৃত আসুল আলম ও জোৎস্না বেগমের ছেলে ইয়াসিন (১৮), মৌলভীবাজারের রাজনগর থানার দাসপাড়া গ্রামের মৃত ইব্রাহীম ও হাজেরা বেগমের ছেলে রুবেল (২১), সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার থানার গোপালপুল বাংলাবাজারের আসাদ মিয়া ও রাহেলা বেগমের ছেলে হৃদয় আহমদ (১৮) ও কোতোয়ালী থানার জল্লারপাড় এলাকার লিয়াকত ও মোছা. সালমা বেগমের ছেলে শওকত মিয়া (৩০)।
এর আগে ২৮ ফেব্রুয়ারি রাতে নগরীর বাগবাড়ীস্থ পিডিবি গেটের সামনে অভিযান চালিয়ে কিশোরগ্যাংয়ের ৫ সদস্যকে আটক করা হয়। ওই এলাকায় তারা উৎপাত করছে এমন খবর পেয়ে শনিবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে আটক করা হয়। রবিবার (১ মার্চ) তাদেরকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে প্রেরণ করা হয়।
আটককৃতরা হলো সুনামগঞ্জ জেলার সদর উপজেলার আশকুড়ি বীরগাঁও’র পারভেজের ছেলে সাদি ইসলাম সানি (১৮), একই জেলার মধ্যনগর থানার চামারদানি গ্রামের আবদুল হামিদের ছেলে আবুল মোড়ল (১৮), তাহিরপুর থানার মাহমুদপুরের রিপন তালুকদারের ছেলে রিফাত তালুকদার (১৮), একই থানার রামসিমপুর গ্রামের আনোয়ার হোসেনের ছেলে জনি আহম্মেদ (১৯) ও হবিগঞ্জের বানিয়াচংয়ের শরিফ উদ্দিন রোডের জিয়াউর রহমানের ছেলে নাহিদ আহমেদ রনি (১৮)।
২৮ ফেব্রুয়ারি বিকালে শাহপরান (রহঃ) থানা পুলিশের অভিযানে গোটাটিকর এলাকা থেকে মোটরসাইকেল ব্যবহার করে ছিনতাইকারী চক্রের এক সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পুলিশ জানায়, গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তির নাম সাদ্দাম হোসেন (৩০)। তার বিরুদ্ধে শাহপরাণ (রঃ) থানা মামলা রয়েছে। সে সংঘবদ্ধ মোটরসাইকেল ব্যবহার করে ছিনতাইকারী চক্রের সক্রিয় সদস্য। তার নিকট হতে ছিনতাইকাজে ব্যবহৃত মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন আলামত উদ্ধার করা হয়েছে। সিডিএমএস পর্যালোচনায় তার বিরুদ্ধে পেনাল কোড ও দ্রুত বিচার আইনে মামলা পাওয়া যায়। তাকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
২৮ ফেব্রুয়ারি বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে নগরীর কাস্টঘর এলাকা থেকে আবদুর রহিম (১৯) নামের কিশোরগ্যাংয়ের এক সদস্যকে আটক করা হয়। সে সুনামগঞ্জ জেলার ছাতক থানার টুকেরাগাঁও’র লিয়াকত আলীর ছেলে। এর আগে ২৭ ফেব্রুয়ারি অভিযান চালিয়ে ‘বুলেট মামুন গ্রুপ’ নামে পরিচিত একটি কিশোর গ্যাংয়ের তিন সদস্যকে আটক করে পুলিশ। আটককৃতদের একজনের নাম সিয়াম (২৩)। তিনি নগরের বালুচর এলাকার বাসিন্দা। আটককৃত অপর দু’জন অপ্রাপ্ত বয়স্ক। তাই তাদের নাম পরিচয় গোপন রাখা হয়।
এ ব্যাপারে সিলেট মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (মিডিয়া) মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম খবরের কাগজকে বলেন, ছিনতাইকারীদের বেশ কয়েকটি চক্র আছে। কিছু আছে চাকু ছুরি ধরে নির্জন জায়গায় ছিনতাই করে। কেউ জনসম্মুখে ছিনতাই করে পালিয়ে যায়। কেউ মোটরসাইকেলে এসে ছিনতাই করে পালিয়ে যায়। বিভিন্ন তথ্যের ভিত্তিতে আমরা ছিনতাইকারীদের গ্রেপ্তার করছি। পাশাপাশি ইদানিং কিশোর গ্যাংয়ের উৎপাত বেড়ে গেছে বিভিন্ন এলাকায়। আমাদের কাছে বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষজন কল করে বলেন। কিশোর গ্যাং মূলত পাড়া মহল্লা ভিত্তিক গড়ে উঠে। শুরুতে তারা আড্ডা হৈহুল্লড় করলেও পরবর্তীতে আধিপত্য বিস্তার করতে নানা অপরাধমূলক কাজে জড়ায়।
শাকিলা/মাহফুজ