বরিশাল বিভাগে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে হাম (মিজেলস) রোগীর সংখ্যা। বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে দ্রুত ছড়িয়ে পড়া এ রোগ স্বাস্থ্য বিভাগকে চিন্তায় ফেলেছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় হাসপাতালগুলোতে আলাদা ওয়ার্ড চালু, নজরদারি জোরদারসহ একাধিক জরুরি নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিভাগীয় স্বাস্থ্য দপ্তরের পরিচালক ডা. শ্যামল কৃষ্ণ মণ্ডল।
তিনি বলেন, ‘হঠাৎ করে হাম ও রুবেলা রোগীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় স্বাস্থ্য বিভাগ কিছুটা উদ্বিগ্ন। বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে এ রোগের প্রকোপ বেশি দেখা যাচ্ছে। এর কারণ অনুসন্ধানে মাঠপর্যায়ে কাজ শুরু করেছে স্বাস্থ্য বিভাগ।’
তিনি জানান, সংক্রমণ রোধে প্রতিটি জেলা সদর হাসপাতাল, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং মা ও শিশুকল্যাণ কেন্দ্রে আলাদা ওয়ার্ড খোলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। হাম ও রুবেলা অত্যন্ত সংক্রামক হওয়ায় রোগীদের আলাদা রেখে চিকিৎসা দেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
চিকিৎসকদের মতে, নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির ঘাটতি এ পরিস্থিতির অন্যতম কারণ হতে পারে। অনেক শিশু নির্ধারিত সময়ে টিকা না পাওয়ায় তারা ঝুঁকিতে রয়েছে। এ জন্য অভিভাবকদের সচেতন হওয়ার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন তারা। পাশাপাশি টিকাদান কর্মসূচি ধারাবাহিকভাবে পরিচালনার ওপরও জোর দেওয়া হচ্ছে। দ্রুত সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে। তাই টিকাদান কর্মসূচি জোরদার ও জনসচেতনতা বাড়ানোর বিকল্প নেই বলে তারা মনে করেন।
স্বাস্থ্য বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা জানান, অনেক সময় সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটে। আবার কোনো কোনো টিকাকেন্দ্রে গিয়ে সময়মতো টিকা পাওয়া যায় না। ফলে শিশুদের টিকা গ্রহণে তিন থেকে চার সপ্তাহ পর্যন্ত বিলম্ব হয়। এতে তারা সংক্রমণজনিত রোগে দ্রুত আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে।
বিভাগীয় স্বাস্থ্য দপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ছয় জেলায় ১৬৭ সন্দেহভাজন রোগীর মধ্যে ১৩১ জনের নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩৯ জনের হাম এবং ২ জনের রুবেলা শনাক্ত হয়েছে। আক্রান্তদের মধ্যে বিভিন্ন জেলার জেনারেল হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৪৭ জন ভর্তি রয়েছেন। তাদের মধ্যে চারজনের অবস্থা জটিল। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে গতকাল দুপুর পর্যন্ত হাম-রুবেলায় আক্রান্ত হয়ে ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে।
জেলাভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বরগুনা জেলায় ৭২ জন সন্দেহভাজনের মধ্যে ৫৭ জনের পরীক্ষা করে ১৬ জনের হাম এবং একজনের রুবেলা শনাক্ত হয়েছে। সেখানে একজনের মৃত্যু হয়েছে এবং ১৪ জন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। বরিশাল জেলায় ২৩ জন সন্দেহভাজনের মধ্যে ১৫ জনের পরীক্ষা করে ৫ জনের হাম ও একজনের রুবেলা শনাক্ত হয়েছে; এখানে তিনজন হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন।
বরিশাল সিটি করপোরেশন এলাকায় ১৩ জনের পরীক্ষা শেষে ৭ জনের হাম শনাক্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া আরও ২৭ জন সন্দেহভাজন রোগী বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। এই এলাকায় এখন পর্যন্ত ৩ জনের মৃত্যু হয়েছে, যা স্বাস্থ্য বিভাগকে সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন করে তুলেছে।
ভোলা জেলায় ১৫ জনের মধ্যে ৩ জনের হাম শনাক্ত হয়েছে। তাদের একজনকে গুরুতর অবস্থায় ভোলা সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। ঝালকাঠিতে ১২ জন সন্দেহভাজনের মধ্যে ৬ জনের পরীক্ষা করে ৫ জনের শনাক্ত হয়েছে। তাদের বাড়িতে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। পটুয়াখালীতে ১৬ জনের মধ্যে ১৩ জনের পরীক্ষা করে ২ জনের হাম শনাক্ত হয়েছে। পিরোজপুরে ১৬ জন সন্দেহভাজনের মধ্যে ১২ জনের পরীক্ষা করে একজনের হাম পাওয়া গেছে।
এদিকে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সূত্র জানায়, প্রতিদিন গড়ে দেড় থেকে দুইশ শিশু সর্দি, কাশি ও চোখ লাল হওয়াসহ উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালের বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসছে। তাদের মধ্যে যাদের অবস্থা জটিল হচ্ছে, তাদের শিশু ওয়ার্ডে ভর্তি করা হচ্ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় সেখানে ২৫ জন হাম আক্রান্ত রোগী ভর্তি হয়েছে, যাদের সবাই শিশু। স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বরগুনা ও বরিশাল সিটি এলাকায় পরিস্থিতি সবচেয়ে বেশি উদ্বেগজনক। গত তিন মাসে এই দুই এলাকায় আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা তুলনামূলক বেশি।
বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপপরিচালক ও শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. এ কে এম নজমুল আহসান বলেন, ‘হাম রোগের প্রাথমিক লক্ষণ হিসেবে জ্বর, সর্দি, কাশি ও চোখ লাল হয়ে যাওয়া দেখা যায়। পরে শরীরে লালচে ফুসকুড়ি বা র্যাশ ছড়িয়ে পড়ে। সময়মতো চিকিৎসা না নিলে এটি জটিল আকার ধারণ করতে পারে।’
তিনি বলেন, ‘৯ মাস ও ১৫ মাস বয়সে হাম-রুবেলা টিকা নিশ্চিত করাই এ রোগ প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায়। পাশাপাশি আক্রান্ত শিশুকে অন্যদের থেকে আলাদা রাখা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া জরুরি।’