ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলায় মুরগির বিষ্ঠার ভাগ নিয়ে দ্বন্দ্বের জেরে বিএনপি নেতাকর্মীদের ওপর হামলার অভিযোগ উঠেছে জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে।
বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) ভোরে দুইজনকে ও বুধবার আরও চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে ফুলবাড়িয়া থানা পুলিশ।
বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ফুলবাড়িয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সাইফুল্লাহ সাইফ।
তিনি বলেন, বুধবার উপজেলা শ্রমিক দলের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল কাইয়ুম তালুকদার বাদী হয়ে জামায়াত ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের ৪৭ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত আরও ২৫০ জনকে আসামি করে মামলা করেছেন। ইতোমধ্যে ৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তারকৃতদের ময়মনসিংহ চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে।
স্থানীয় ও মামলা সূত্রে জানা গেছে, কাহালগাঁও বাজারের পাশে দীর্ঘদিন ধরে সিপি বাংলাদেশ কোম্পানিতে লেয়ার মুরগি লালন-পালন করা হচ্ছে। ওই কোম্পানির মুরগির বিষ্ঠা আওয়ামী লীগের সময় তাদের নেতাকর্মীরা বিনামূল্যে নিয়ে বিক্রি করতেন। আওয়ামী লীগের পতনের পর বিএনপির নেতাকর্মীরা বিষ্ঠা নিতেন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ময়মনসিংহ-৬ (ফুলবাড়িয়ায়) আসনে জামায়াত প্রার্থী অধ্যক্ষ কামরুল হাসান মিলন জয়লাভ করেন। এরপর সেখানার মুরগির বিষ্ঠা কারা নেবেন তা নিয়ে স্থানীয় জামায়াত ও বিএনপি নেতাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব শুরু হয়।
এ ঘটনার জেরে মঙ্গলবার রাত ১১টার দিকে বাস, অটোরিকশা ও মাহিন্দ্রা করে দুই শতাধিক জামায়াত-শিবির নেতাকর্মী সিপি বাংলাদেশ কোম্পানিতে যায়। তারা সেখান থেকে দুই ট্রাক মুরগির বিষ্ঠা নিয়ে যায়।
পরে মধ্যরাতের দিকে উপজেলার এনায়েতপুর ইউনিয়নের কাহালগাঁও বাজারে ঢুকে হাতবোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করে। এ সময় বেশ কিছু ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা-ভাঙচুর-লুটপাট এবং যানবাহন ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে।
কাহালগাঁও বাজারের ব্যাংক এশিয়ার এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের ব্যবস্থাপক মো. শামীম হক বলেন, রাত ১১টার দিকে জামায়াতের অন্তত ২০০ নেতাকর্মী বাজারে হামলা চালায়। এ সময় ব্যাংকের তালা ভেঙে পাঁচ লাখ টাকা লুট করে নিয়ে যায়।
গাজী কোম্পানির এক্সিকিউটিভ সুজন মিয়া অভিযোগ করেন বলেন, “রাতে হঠাৎ জামায়াতের নেতাকর্মীরা আমার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা চালায়। এসময় চালিয়ে দুই লাখ সাত হাজার টাকা লুট করার পাশাপাশি বেশ কিছু ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে লুটপাট ও ভাঙচুর করা হয়।
কাহালগাঁও বাজারের ইজারাদার আমিমুল ইসলাম বলেন, হামলার সময় আমি বাজারে ছিলাম। হঠাৎ জামায়াতের নেতাকর্মী হামলা ও ভাঙচুর শুরু করে। এ সময় আমার ডিসকভার ১২৫ সিসি মোটরসাইকেল লুট করে করে নিয়ে যায়।
সিপি বাংলাদেশ কোম্পানির ব্যবস্থাপক সাদিকুর রহমান বলেন, আমরা মুরগির বিষ্ঠা বিনামূল্যে দিয়ে দেই । আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তাদের নেতাকর্মীরা মুরগির বিষ্ঠা নিতেন। আওয়ামী লীগের পতনের পর বিএনপি নেতাকর্মীরা বিষ্ঠা নিত। কিন্তু নির্বাচনের পর থেকে বিষ্ঠা নিয়ে দুই পক্ষের দ্বন্দ্ব চলে আসছে। জামায়াতে ইসলামীর দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ কামরুল হাসান মিলন সম্প্রতি আমাকে ফোন করে বলেন, বিষ্ঠা যেন জামায়াতের নেতাকর্মীদের দেওয়া হয়। এ নিয়েই বিএনপি ও জামায়াত নেতাকর্মীদের দ্বন্দ্ব চলে আসছে।
তিনি বলেন, প্রতি দেড় মাসে ছয়টি শেড থেকে প্রায় আট লাখ টাকার বিষ্ঠা উৎপাদন হয়। এটি দিয়ে সাধারণত মাছের খাবারসহ অন্যান্য জিনিস তৈরি হয়। যারা বিষ্ঠা নেন, তারা মোটা অংকের টাকা পকেটে তুলতে পারেন।
এদিকে ফুলবাড়িয়া উপজেলা জামায়াতের আমির মো. ফজলুল হক শামীম ও সাধারণ সম্পাদক ডা. মো. আব্দুর রাজ্জাক স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে কাহালগাঁও বাজারে হামলা বা লুটপাটের ঘটনায় জামায়াত জড়িত নয় দাবি করে এ ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানানো হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, এই হীন সন্ত্রাসী ঘটনায় আমরা দলীয়ভাবে উপজেলা জামায়াতের শুরা ও কর্মপরিষদ সদস্য মো. আ. মজিদকে আহ্বায়ক করে তিন সদস্যের বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করেছি। তদন্ত প্রতিবেদন ৭২ ঘণ্টার মাঝে জমা দিতে বলা হয়েছে। তদন্তে জামায়াতের কোনো নেতাকর্মী জড়িত থাকলে সাংগঠনিক ও আইনগত সর্বোচ্চ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
ময়মনসিংহ দক্ষিণ জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক আখতারুল আলম ফারুক বলেন, জামায়াত যে একটি সন্ত্রাসী দল, এ ঘটনায় আবারও তা প্রমাণ হলো। বিএনপির পক্ষ থেকে এ ঘটনায় জড়িত সব সন্ত্রাসীকে আইনের আওতায় আনার দাবি জানাচ্ছি।
বক্তব্য জানতে চাইলে ময়মনসিংহ- ৬ ফুলবাড়িয়া আসনের সংসদ সদস্য কামরুল হাসান মিলন বলেন, সংসদ অধিবেশনের জন্য ঢাকায় আছি। তবে এলাকার এই ঘটনা শুনেছি। বিএনপির দুটি পক্ষ এবং জামায়াতের কয়েকজন নেতাকর্মী এর সঙ্গে যুক্ত আছে বলে জানতে পেরেছি। কিন্তু যে বা যারাই এই ঘটনা ঘটিয়েছে তাদের অবিলম্বে আইনের আওতায় আনা হবে।
ফুলবাড়িয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সাইফুল্লাহ সাইফ বলেন, ঘটনায় জড়িত সবাইকে চিহ্নিত করার চেষ্টা চলছে। মামলার অনেক আসামি আত্মগোপনে রয়েছে। আমরা তাদের গ্রেপ্তার করতে চেষ্টা করছি।
কামরুজ্জামান মিন্টু/এসএন