চরম অনিশ্চয়তা আর আশঙ্কা কাটিয়ে অবশেষে এসএসসি পরীক্ষার টেবিলে বসেছেন ঠাকুরগাঁওয়ের দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী শরীফ আলী।
মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) ঠাকুরগাঁও সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে যখন খাতার পাতায় কলম চলছিল, তখন শরীফের চোখে আলো না থাকলেও মুখে ছিল প্রশান্তির হাসি। সরকারি নিয়ম মেনে একজন শ্রুতি লেখকের সহায়তায় জীবনের প্রথম বড় এই পাবলিক পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন তিনি।
শরীফ ঠাকুরগাঁও শহরের গোবিন্দনগর মুন্সিরহাট এলাকার ইজিবাইকচালক রমজান আলীর ছেলে। শারীরিক সীমাবদ্ধতার কারণে কোনোদিন বইয়ের হরফ দেখার সুযোগ না হলেও শ্রবণশক্তিকে পুঁজি করেই তাঁর শিক্ষাজীবনের পথচলা। পরিবার ও সহপাঠীদের থেকে পড়া শুনে তা আত্মস্থ করার মাধ্যমেই আজ তিনি এসএসসির আঙিনায়। তবে পরীক্ষার আগে অষ্টম শ্রেণির একজন রাইটার খুঁজে না পাওয়ায় শরীফের শিক্ষাজীবন থমকে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। সেই সংবাদ গণমাধ্যমে প্রকাশের পর মুন্সিরহাট এলাকার অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী শায়লা আক্তার স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাঁর পাশে দাঁড়ায়। শিক্ষা বোর্ডের চূড়ান্ত অনুমোদনের পর আজ থেকে শরীফের হয়ে উত্তরপত্র লেখার দায়িত্ব পালন করছে শায়লা।
প্রথম দিনের পরীক্ষা শেষে শরীফ আলী বলেন, বাবা-মা অনেক কষ্ট করে আমার পড়ালেখার খরচ চালিয়েছেন। আজ পরীক্ষায় বসতে পেরে আমি সত্যিই আনন্দিত। আমার একমাত্র লক্ষ্য ভালোভাবে পড়াশোনা শেষ করে একটি চাকরি করা, যাতে পরিবারের দুঃখ ঘোচাতে পারি।
শরীফের হয়ে খাতায় শব্দ বুনে দেওয়া শায়লা আক্তার বলে, শরীপ ভাইয়ের সমস্যার কথা জানতে পেরে আমার মনে হয়েছে ওনার পাশে দাঁড়ানো উচিত। আমার হাতের লেখায় যদি ওনার স্বপ্ন পূরণ হয়, তবে এর চেয়ে ভালো কাজ আর হতে পারে না।
ছেলের এই স্বপ্নযাত্রা দেখে অশ্রুসজল মা সফুরা বেগম জানান, রাইটার না পাওয়ার দিনগুলোতে শরীফ চরম উৎকণ্ঠায় দিন কাটাত। আজ তাঁকে কেন্দ্রে পৌঁছে দিয়ে মনে হচ্ছে একটি বড় বাধা অতিক্রম করা সম্ভব হয়েছে।
কেন্দ্র সচিব শাহানুর বেগম চৌধুরী জানিয়েছেন, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন পরীক্ষার্থী হিসেবে শরীফকে প্রতি ঘণ্টায় অতিরিক্ত ১৫ মিনিট সময়সহ সব ধরনের আইনি সুবিধা দেওয়া হয়েছে।
জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. শাহীন আকতার জানান, এ বছর জেলার ৩৯টি কেন্দ্রে ২৩ হাজার ২ জন পরীক্ষার্থীর ভিড়ে শরীফ কেবল একজন শিক্ষার্থী নন, বরং তিনি এক জীবন্ত অনুপ্রেরণা।যিনি শেখালেন পথ হারিয়ে গেলেও স্বপ্ন হারাতে নেই।
নবীন হাসান/এসএন