লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে ৫৪ একর জমির ওপর গড়ে ওঠা মৎস্য প্রজনন ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্রটি একসময় এশিয়ার বৃহত্তম হিসেবে পরিচিত ছিল। আশির দশকে বাংলাদেশ মৎস্য অধিদপ্তরের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত এই কেন্দ্রটি দেশের মাছের পোনা উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত। তবে দুই দশক না পেরোতেই অবহেলা, জনবলসংকট, সংস্কারকাজে অনিয়মের অভিযোগসহ নানা সমস্যায় কেন্দ্রটি এখন ধ্বংসের মুখে।
তবে বর্তমানে কেন্দ্রটির ৮৪ কর্মকর্তা-কর্মচারীর ৬৩টি পদই শূন্য। মাত্র ২১ জন জনবল দিয়ে চলছে এ কেন্দ্রটি। সেই সঙ্গে বিদ্যুৎ সমস্যাসহ নানা সংকটে উৎপাদন মৌসুমেও রেণু ও পোনা উৎপাদন চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত রেণু ও পোনা উৎপাদনের মৌসুম। কিন্তু জনবল ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে মাছ চাষিদের চাহিদার অন্তত ৩০ শতাংশ রেণু ও পোনা প্রজনন কেন্দ্র থেকে সরবরাহ করা যাচ্ছে না। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সঠিক ব্যবস্থাপনা থাকলে এই কেন্দ্রটি মাছ উৎপাদনে বড় ভূমিকা রাখতে পারত।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, ৮৪ কর্মকর্তা-কর্মচারীর মধ্যে আছেন মাত্র ২১ জন। মোট জনবলের মধ্যে দুজন ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, ছয়জন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তা থাকার কথা। কিন্তু কমর্রত আছে মাত্র দুজন। এছাড়া মৎস্য সম্প্রসারণ সুপারভাইজার, গবেষণাগার সহকারী, ফিসারম্যান ও হ্যাচারি গার্ডের বেশিরভাগ পদও খালি পড়ে আছে। যারা রয়েছেন তাদের মধ্যে অনেকেই চলতি বছরে অবসর চলে যাবেন।
কর্মকর্তাদের জন্য সাতটি আবাসিক ভবন রয়েছে। লোকবল না থাকায় চার তলার একটি ও এক তলার তিনটি ভবন পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। জনবল না থাকায় প্রশিক্ষণ কার্যক্রমও বন্ধ হয়ে গেছে।
সংস্কার না হওয়ায় কেন্দ্রের মোট ৬৯টি পুকুরের মধ্যে ৩০টি পুকুর কয়েক বছর ধরে ব্যবহারের অনুপযোগী। পুকুরের পাড়গুলো ভেঙে গেছে। কিছু পুকুর ভরাট হয়ে মাঠে পরিণত হয়েছে। বিদ্যুৎ সমস্যাও একটা বড় বাধা। লো-ভোল্টেজের কারণে দুটি গভীর নলকূপ দিয়ে প্রয়োজনীয় পানি ওঠানো যাচ্ছে না। পানির অভাবে এ বছর প্রতিটি সাত থেকে আট কেজি ওজনের দুই শতাধিক ডিমওয়ালা মাছ (ব্রুড ফিশ) মারা গেছে।
এ ছাড়া পাশের ডাকাতিয়া নদীর সংযোগ খালের দূষিত পানি ব্যবহার করতে হচ্ছে। এতে উৎপাদিত রেণুর মান ঠিক রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। প্রজনন কেন্দ্রটি কাতল, রুই, মৃগেল, কালবাউশ, গ্রাসকার্প, সিলভার কার্প, বিগহেড কার্প, থাই সরপুঁটি, কমন কার্প, মিরর কার্প ও গিফট তেলাপিয়াসহ বিভিন্ন প্রজাতির পোনা উৎপাদন করে। কিন্তু চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদন না হওয়ায় চাষিরা প্রয়োজনীয় পোনা পাচ্ছেন না।
জানা গেছে, চাঁদপুর সেচ ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ প্রকল্পের আওতায় ২ হাজার ৪২৮ হেক্টর বদ্ধ জলাশয়, ২ হাজার হেক্টর নদী এবং বিভিন্ন খালে রুই জাতীয় মাছের রেণু ও পোনা সরবরাহের লক্ষ্যেই এই কেন্দ্র গড়ে তোলা হয়। ১৯৭৯ সালে এর কাজ শুরু হয় এবং ১৯৮১ সালে আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম চালু হয়। উৎপাদিত রেণু ও পোনার মান ভালো হওয়ায় অল্প সময়েই এটি সারা দেশে পরিচিতি পায়। ফলে এখানে উৎপাদিত পোনার চাহিদা দ্রুত বেড়ে যায়। তবে এক দশক পার না হতেই নানা সংকট দেখা দেয়।
এদিকে কেন্দ্রটির উন্নয়নে প্রায় তিন মাস ধরে পুকুর সংস্কারকাজ চলছে। মৎস্য অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে প্রায় কোটি টাকা ব্যয়ে ২১টি পুকুর সংস্কার করা হচ্ছে। তবে এই কাজেও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। নিম্নমানের কংকর ব্যবহার করে রাস্তা সংস্কারসহ বিভিন্ন কাজে গাফিলতির অভিযোগ রয়েছে ঠিকাদারের বিরুদ্ধে। যদিও ঠিকাদার জিয়ারুল হক ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
স্থানীয় এমপি আবুল খায়ের ভূঁইয়া বলেন, ‘বেসরকারি হ্যাচারিগুলোর পোনার মান নিয়ে প্রশ্ন আছে। এ জন্য সবাই সরকারি হ্যাচারির দিকে ঝুঁকছেন। আশির দশকে সরব ছিল এই হ্যাচারি। পর্যটকরাও এখানে আসতেন। যথাযথ নজর দিলে এবং জনবল সংকট দূর করলে কেন্দ্রটির সম্ভাবনা এখনো অনেক। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করে এটি সমাধানের চেষ্টা করব।’
রায়পুর মৎস্য প্রজনন কেন্দ্রের উপপরিচালক অজিত কুমার পাল বলেন, শুরুতে এটি এশিয়ার বৃহত্তম হ্যাচারি ছিল। কিন্তু এখন এটি না সংকটে জর্জরিত। সংকটগুলো না থাকলে এ বছর চাহিদা অনুযায়ী পোনা উৎপাদন সম্ভব হতো।
তিনি বলেন, এরই মধ্যে সমস্যাগুলো লিখিতভাবে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। তিন মাস ধরে কোটি টাকা ব্যয়ে উন্নয়নকাজ চলছে। তবে কাজ করতে গেলে কিছু অনিয়ম হতে পারে। তবুও ঠিকাদারকে সঠিকভাবে কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।