দেশের অন্যতম গ্যাসসমৃদ্ধ জেলা ভোলার প্রাকৃতিক গ্যাস ঢাকায় এলএনজি আকারে না নিয়ে স্থানীয়ভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্প খাতে ব্যবহারের সুপারিশ করেছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। কমিশনের এ সুপারিশ বাস্তবায়িত হলে দীর্ঘদিনের বঞ্চনার অবসান ঘটিয়ে ভোলায় শিল্পায়নের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
ভোলার শাহবাজপুর, ভোলা নর্থ ও ইলিশা—এই তিনটি গ্যাসক্ষেত্রের নয়টি কূপে প্রায় ৩ টিসিএফ প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুদ রয়েছে। ভোলায় ২০২৭ সাল নাগাদ আরও ২৯ টি কূপ খনন প্রকৃয়াধিন রয়েছে। তবে পর্যাপ্ত অবকাঠামো ও সঠিক নীতিগত সিদ্ধান্তের অভাবে এই সম্পদের পূর্ণ ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়নি।
জানা যায়, ভোলায় ৩ টি ক্ষেত্রের ৯ টি কূপ থাকলেও গ্যাস উত্তলন হচ্ছে শাহবাজপুর গ্যাস ক্ষেত্র থেকে। , প্রতিদিন উৎপাদন সক্ষমতা ১২২ মিলিয়ন ঘনফুট থাকলেও উত্তলন হচ্ছে ৭০ থেকে ৭২ মিলিয়ন ঘন ফুট গ্যাস। যা ২৩৭৬ টি আবাসিক লাইন একটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও তিন চারটি শিল্প কারখানায় সরবরাহ করা হয়।
বর্তমানে ভোলার গ্যাস সিএনজি আকারে কম্প্রেস করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ইন্ট্রাকো রিফুয়েলিং স্টেশন লিমিটেড-এর মাধ্যমে ঢাকায় নেওয়া হচ্ছে। ২০২৩ সালের ডিসেম্বর থেকে পরীক্ষামূলকভাবে শুরু হওয়া এই কার্যক্রম স্থানীয়দের আন্দোলনের কারণে মাঝেমধ্যে বিঘ্নিত হচ্ছে।
এমন পরিস্থিতিতে সম্প্রতি বিইআরসি তাদের পর্যবেক্ষণে জানায়, ভোলার গ্যাস এলএনজি আকারে পরিবহন করে নন-পাইপ পদ্ধতিতে ঢাকায় সরবরাহের বিষয়ে আপত্তি রয়েছে এবং এই পদ্ধতির কার্যকারিতা ও সীমাবদ্ধতা আরও মূল্যায়নের প্রয়োজন। কমিশন মনে করে, স্থানীয়ভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে তা জাতীয় গ্রিডের মাধ্যমে সরবরাহ করা অধিক সাশ্রয়ী ও কার্যকর হবে।
সুপারিশে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড-এর মালিকানায় ভোলায় একটি কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করা হলে উৎপাদিত বিদ্যুৎ শিল্প খাতে সরবরাহ করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি সার, সিরামিক ও অর্থনৈতিক অঞ্চলভিত্তিক শিল্প স্থাপনের মাধ্যমে গ্যাসের বহুমুখী ব্যবহার নিশ্চিত করার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
এ প্রেক্ষাপটে ভোলার গ্যাস এলএনজি আকারে পরিবহন করে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন পিএলসি-এর অধিক্ষেত্রে সরবরাহের জন্য প্রস্তাবিত গ্যাসের মূল্যহার নির্ধারণের প্রয়োজন নেই বলে সিদ্ধান্ত দিয়েছে কমিশন। এ বিষয়ে পেট্রোবাংলা, তিতাস গ্যাস ও সুন্দরবন গ্যাসের প্রস্তাব মূল্যহার নির্ধারণ ছাড়াই নিষ্পত্তি করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, স্থানীয়ভাবে গ্যাস ব্যবহারের মাধ্যমে পরিবহন ব্যয় কমবে, অপচয় রোধ হবে এবং ভোলার অর্থনীতি শক্তিশালী হবে। ইতোমধ্যে গ্যাসকে কেন্দ্র করে ভোলায় কিছু ছোট-বড় শিল্প কারখানা গড়ে উঠতে শুরু করেছে। তবে পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ না থাকায় বড় বিনিয়োগ এখনও সীমিত।
এদিকে ভোলা চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি আলহাজ্ব গোলাম নবী আলমগীর বলেন, ভোলার গ্যাস দিয়ে স্থানীয়ভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হলে জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমবে এবং গড়ে উঠবে গ্যাসভিত্তিক ভারী শিল্প, সার কারখানা ও প্রসেসিং প্লান্ট।
সুন্দরবন গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের ভোলা কার্যালয়ের ব্যবস্থাপক ওলিউল ইসলাম জানান, পরিকল্পিতভাবে গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে শিল্পায়নের গতি আরও বাড়বে। ভোলায় ২০১৩ সাল থেকে ২৩৭৬টি আবাসিক গ্রাহকদের গ্যাস সংযোগ দিয়েছি পাশাপাশি তিন থেকে চারটি শিল্প প্রতিষ্ঠানে গ্যাস সংযোগ দেওয়া হয়েছিলো।২০২০ সলের ১৫ জানুয়ারি থেকে আবাসিক খাতে গ্যাস সংযোগ বন্ধ রয়েছে। তবে ভোলায় নতুন করে শিল্প কারখানা স্থাপন করা হবে তাদের গ্যাস সংযোগের পাশাপাশি সকল সুবিধা দেওয়া হবে। পাশাপাশি ভোলার চেম্বার অব কমার্স সাথের সাথে আলোচনা করে সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা ও দীর্ঘদিনের নীতিগত জটিলতায় ভোলার গ্যাস পুরোপুরি কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি। তবে বিইআরসির এই নতুন সুপারিশ বাস্তবায়িত হলে ভোলায় শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে বড় পরিবর্তন আসতে পারে।
ইমতিয়াজুর রহমান/এসএন