পবিত্র ঈদুল আজহা আর বেশিদিন বাকি নেই। ঈদকে কেন্দ্র করে নগরের অলিগলি, বাসার নিচতলা ও রাস্তার পাশে রাখা হয়েছে কোরবানির পশু। অনেক ক্রেতাই এখন পশুর হাটের বদলে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা এসব অস্থায়ী বিক্রয়কেন্দ্র কিংবা খামার থেকেই কোরবানির পশু কেনেন। ইতোমধ্যে অনেকে পশু দেখছেন, চলছে টুকটাক বেচাকেনাও।
শুক্রবার (১৫ মে) সকালে নগরের শান্তিবাগ এলাকায় এক ভবনমালিককে তার ভবনের নিচে অন্তত ১০ থেকে ১২টি গরু বেঁধে রাখতে দেখা গেছে। কোরবানি উপলক্ষে তিনি গরুগুলো রাঙামাটি থেকে এনেছেন বলে জানা গেছে। সেখান থেকে এক কিলোমিটার দূরত্বে আরেকটি ছোট কোরবানির পশুর হাট দেখা যায়।
এদিকে নগরের চশমা হিল এলাকায় চৌধুরী এগ্রো-তে ৩০ থেকে ৪০টির মতো গরু দেখা গেছে। আবার চশমা হিলের মাথায় কয়েকজন বন্ধু মিলে কোরবানির পশু বিক্রির প্রস্তুতি নিচ্ছেন। প্রতিবছরই তারা কোরবানিকে সামনে রেখে পশু বিক্রি করেন। কয়েকদিনের মধ্যে তারা গরু সংগ্রহ করে আনবেন বলে জানিয়েছেন।
ওই বন্ধুদের একজন মো. হাসান বলেন, ‘কোরবানি উপলক্ষে আমরা পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকা থেকে দেশি গরু সংগ্রহ করি। এবারও সেখান থেকে কয়েক দফায় কোরবানির গরু নিয়ে আসার পরিকল্পনা রয়েছে। কারণ নগরে দেশি গরুর চাহিদা রয়েছে। এই সুযোগকে কাজে লাগাতে চাই আমরা। আশা করছি, তিন-চারদিনের মধ্যে গরু নিয়ে আসতে পারব।’
নগরের কালুরঘাট বিসিক শিল্প এলাকায় সারা এগ্রো ফার্ম লিমিটেড-এ রয়েছে ছোট-বড় অন্তত ৫০০টি গরু। সেখানে কোরবানির পশু দেখতে আসেন কয়েকজন ক্রেতা। ফার্মটিতে কথা হয় বেসরকারি চাকরিজীবী মো. শফিউল আলমের সঙ্গে।
তিনি বলেন, ‘বড় গরুর দাম একটু কম হলেও ছোট গরুর দাম বেশি মনে হচ্ছে।’
শুধু এই কয়েকটি নয়, শুক্রবার সকালে নগরের অক্সিজেন, বহদ্দারহাটসহ বেশ কয়েকটি এলাকা সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, ব্যক্তিগত উদ্যোগের পাশাপাশি এগ্রো ফার্মগুলোতেও নেওয়া হয়েছে ব্যাপক প্রস্তুতি। সব জায়গায় ক্রেতার আনাগোনা কিছুটা দেখা গেছে। তবে এখনও ফার্মগুলোতে পুরোপুরি বিক্রি শুরু হয়নি বলে জানিয়েছেন মালিকরা।
তারা বলেন, ‘এখনও বেচাকেনা জমে ওঠেনি। কোরবানির সপ্তাহখানেক আগে পুরোদমে কোরবানির পশুর বেচাকেনা শুরু হয়। কারণ ওই সময় সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বেতন-বোনাস পান। পাশাপাশি অফিস-আদালত বন্ধ হলে ক্রেতাসমাগম আরও বাড়ে। তবে টুকটাক বেচাকেনা হচ্ছে। অনেকে টাকা পরিশোধ করে গরু ফার্মে রেখে যাচ্ছেন।’
নগরের অক্সিজেন এলাকায় জারিয়া এগ্রো ফার্ম-এর মালিক তৌহিদুল আলম দুলাল খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমরা ফটিকছড়ি থেকে গরু সংগ্রহ করেছি। আমাদের কাছে ৮০টির মতো গরু আছে। গরুর আকার ও অন্যান্য খরচের ওপর নির্ভর করে দাম নির্ধারণ করা হবে। তবে এবার মণপ্রতি হিসেবে গরুর দাম পড়বে ৩৫ হাজার টাকার উপরে। আমাদের কাছে মহিষও আছে। তবে মহিষের দাম গরুর তুলনায় বেশি।’
সেখানে কথা হয় কোরবানির পশু দেখতে আসা অক্সিজেনের কুয়াইশ এলাকার বাসিন্দা মো. আবুহেনা বলেন, ‘কেনার উদ্দেশ্যে আসিনি। এসেছি কোরবানির পশু দেখতে এবং দাম যাচাই করতে। দাম কেমন, বাজার পরিস্থিতি কেমন, কোন ধরনের পশুর সরবরাহ বেশি এখান থেকে এসব ধারণা নিয়ে তারপর বাজেট নির্ধারণ করব।’
চসিকের স্থায়ী-অস্থায়ী হাটগুলোতে উঠবে পশু
চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন এবার তিনটি স্থায়ী ও তিনটি অস্থায়ী পশুর হাট ইজারা দিয়েছে। স্থায়ী পশুর হাটের মধ্যে রয়েছে সাগরিকা পশুর হাট, মুরাদপুরের বিবিরহাট পশুর বাজার ও পোস্তারপাড় ছাগলের বাজার। পাশাপাশি অস্থায়ী পশুর হাটের মধ্যে রয়েছে কর্ণফুলী পশুর হাট, মুসলিমাবাদ মাঠ ও ওয়াজেদিয়া হাট। এসব বাজারেও কোরবানির পশুর বেচাকেনা হবে। হাটগুলোতে ইতোমধ্যে ইজারাদাররা মাঠ সাজানোসহ অন্যান্য আনুষঙ্গিক প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছেন।
সাগরিকা পশুর হাটের ইজারাদার ফজলে আলিম চৌধুরী বলেন, ‘চারদিন আগে আমি বাজারটি সিটি করপোরেশন থেকে ইজারা নিয়েছি। পশুর হাট এখনও জমে ওঠেনি। অল্প অল্প করে কিছু পশু এখানে নিয়ে আসা হচ্ছে। আশা করছি, আগামী কয়েকদিনের মধ্যে বাজারটি কোরবানির পশুতে ভরে উঠবে। তখন ক্রেতাসমাগম ও বেচাকেনা বাড়বে।’
চট্টগ্রামে গবাদিপশুর উৎপাদন কমলেও সংকট হবে না
চট্টগ্রাম জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের তথ্যমতে, কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে চট্টগ্রাম জেলায় এ বছর স্থানীয়ভাবে ৪ লাখ ৯৯ হাজার ২৭৯টি গরু মোটাতাজা করা হয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় ৩৬ হাজার ৫৩৪টি কম।
এ বছর স্থানীয়ভাবে ১ লাখ ৯৪ হাজার ৫১৯টি ছাগল মোটাতাজা করা হয়েছে। গত বছর এ সংখ্যা ছিল ২ লাখ ৫১ হাজার ৭৪টি। এ বছর ৪৭ হাজার ৮৩৪টি মহিষ মোটাতাজা করা হয়েছে, যা গত বছর ছিল ৬৪ হাজার ১৬৩টি। গত বছর ৫৫ হাজার ৬৯৭টি ভেড়া স্থানীয়ভাবে উৎপাদন করা হলেও এ বছর সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ৪১ হাজার ৪২৩টিতে।
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. আলমগীর বলেন, ‘এবার খামার পরিচালনা খরচ বেড়ে যাওয়াসহ বিভিন্ন কারণে চট্টগ্রামে গবাদিপশুর উৎপাদন কমেছে। তবে অন্যান্য জেলায় উৎপাদন প্রচুর বেড়েছে। ওইসব এলাকা থেকে চট্টগ্রামে প্রতিবছর গরু আসে। তাই এবার চট্টগ্রামে উৎপাদন কমলেও কোরবানিতে পশু সংকট হবে না।’
তারেক মাহমুদ/রিফাত/