ঈদুল আজহা উপলক্ষে চাঁপাইনবাবগঞ্জে এবার রেকর্ড পশু প্রস্তুত করেছেন খামারিরা। জেলায় কোরবানির পশুর কোনো ঘাটতি নেই। উল্টো চাহিদার চেয়ে ৬৩ হাজারেরও বেশি পশু অতিরিক্ত রয়েছে। স্থানীয় খামারিরা জেলার চাহিদা মিটিয়ে ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে গরু সরবরাহের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। কিন্তু সীমান্ত গলিয়ে চোরাই পথে ভারতীয় গরু ঢুকে পড়ায় দুশ্চিন্তায় পড়েছেন তারা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বিট খাটাল বন্ধ থাকলেও অবৈধ পথে ভারত থেকে গরু আসা বন্ধ হয়নি। রাতের আঁধারে সীমান্ত পেরিয়ে গরু আনা হচ্ছে। এরপর সেগুলো দ্রুত বিভিন্ন হাট ও নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এতে খামারি, ব্যবসায়ী ও গৃহস্থরা ন্যায্যমূল্য পাওয়া নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন।
খামারি ও ব্যবসায়ীদের দাবি, দেশীয় ডেইরি শিল্প বাঁচাতে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্তকে সম্পূর্ণ সিলগালা করতে হবে। ভারতীয় গরুর অনুপ্রবেশ পুরোপুরি বন্ধ করতে ঈদের আগ পর্যন্ত সীমান্ত পাহারা আরও জোরদার করতে হবে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের ৫৩ বিজিবি ব্যাটালিয়নের আওতায় সদর ও শিবগঞ্জ উপজেলার কয়েকটি ইউনিয়ন মিলে ৫৫ কিলোমিটার সীমান্ত এলাকা রয়েছে। এর মধ্যে নারায়ণপুর, জহুরপুর সীমান্ত এলাকাসহ অন্তত ৩২ কিলোমিটার এলাকায় কোনো কাঁটাতারের বেড়া নেই।
আবার প্রায় ১২ কিলোমিটার নদীপথও রয়েছে। এই অরক্ষিত সীমান্তকেই ব্যবহার করছে চোরাচালানকারীরা। স্থানীয় কিছু রাখাল ও দালাল এই কাজে জড়িত বলেও অভিযোগ রয়েছে।
সীমান্ত এলাকার বাসিন্দারা জানান, শুধু কোরবানির ঈদ নয়, সারা বছরই রাতের আঁধারে সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে গরু আসে। একটি সক্রিয় চক্র ভারত থেকে গরু এনে দেশের বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করছে।
বিজিবির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় অভিযান চালিয়ে ২২৭টি গরু ও মহিষ আটক করা হয়েছে। এর মধ্যে ২০৫টি গরু এবং ২২টি মহিষ। গত ১৭ মে দিবাগত রাত থেকে ভোট পর্যন্ত সদর উপজেলার নারায়ণপুর, সুন্দরপুর ইউনিয়ন এবং শিবগঞ্জ উপজেলার উজিরপুর, পাঁকা ও মনাকষা ইউনিয়নের বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় অভিযান চালিয়ে ১৪টি গরু আটক করা হয়।
এর আগে গত বছরের শেষ দিকে মাসুদপুর ও হাকিমপুর সীমান্তে অভিযান চালিয়ে চার বাংলাদেশি ও দুই ভারতীয় চোরাকারবারিকে আটক করা হয়েছিল।
এদিকে পশু খাদ্যের দাম বাড়ায় এবার খামারিদের উৎপাদন খরচও বেড়েছে। তাই ভালো দামের আশা করেছিলেন তারা। কিন্তু বাজারে ভারতীয় গরুর প্রভাব বাড়ায় সেই আশা ফিকে হয়ে যাচ্ছে।
জেলা শহরের বটতলা হাটে সেলিন নামে এক খামারি বলেন, ‘১১টি গরু হাটে নামিয়ে একটিও বিক্রি করতে পারিনি। পরিচর্যা ও গোখাদ্যের দাম বাড়লেও ক্রেতারা যে দাম বলছেন, তাতে এবার লোকসান হবে।’
চাঁপাইনবাবগঞ্জ ডেইরি অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মুনজের আলম মানিক বলেন, ‘করোনার পর থেকেই খামারিরা লোকসানে ছিলেন। এবার ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন নিয়ে খামারের সংখ্যা বেড়েছিল। তবে ভারতীয় গরুতে খামারিদের স্বপ্ন ফিকে হতে বসেছে।’ তিনি খামারিদের বাঁচাতে সরকারকে দ্রুত উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানান।
এদিকে ভারতীয় গরু চোরাচালান বেড়ে যাওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য নূরুল ইসলাম বুলবুল। সম্প্রতি আইনশৃঙ্খলা কমিটির মাসিক সভায় তিনি দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার তাগিদ দেন।
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) ডা. কবির উদ্দীন আহম্মেদ জানান, জেলায় ১৩ হাজার ৯৪২ জন খামারি এবার ২ লাখ ১৫ হাজার ২৪৪টি গবাদিপশু প্রস্তুত করেছেন। জেলার চাহিদা ১ লাখ ৫২ হাজার ১২৭টি। ফলে অতিরিক্ত রয়েছে ৬৩ হাজার ১১৭টি পশু।
৫৩ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল কাজী মোস্তাফিজুর রহমান জানান, সীমান্তে চোরাচালান রোধে কঠোর নজরদারি চালানো হচ্ছে। অবৈধভাবে কোনো গবাদিপশু যাতে পার হতে না পারে, সেজন্য টহল জোরদার করা হয়েছে। এরই মধ্যে বেশ কিছু চোরাই গরু আটকও করা হয়েছে।