পুকুরের উত্তর পাড়ে সারি সারি কলাগাছ। মোচা ধরেছে কোনোটায়। কোনো গাছে ধরেছে কলা। কচি কচি চারাগাছও আছে। পাড়ে দূর্বাঘাসের ছড়াছড়ি। ঘাসদের সঙ্গে এক সবরি কলাগাছের ঝগড়া ভীষণ। ঘাসেরা তার নাম দিয়েছে ‘ঝগড়াটে কলাগাছ’। কলাগাছটার সেকি অহংকার! অহংকারে মাটিতে শিকড় পড়ে না যেন।
একদিন ভোরে ঘুম থেকে উঠে কলাগাছটা আড়মোড়া ভাঙছিল। দূর্বাঘাসেরা তখনো ঘুমে। ঝগড়াটে কলাগাছটা খিক খিক করে হেসে উঠল, ‘এই পিচ্চিরা, উঠ উঠ। হি হি হি। তোদের গায়ে শিশির লেগে আছে। এমনিই ছোট তোরা। শিশিরের পানিতে ভিজে কেমন বিচ্ছিরি দেখাচ্ছে। হি হি হি।’
কলাগাছটার হাসির শব্দে দূর্বাঘাসদের ঘুম ভেঙে যায়।
‘তোমার জ্বালায় আর বাঁচি না। সব সময় তুমি খোঁচা দাও আমাদের। শান্তিতে একটু ঘুমাতেও পারি না।’ এক বুড়ো দূর্বাঘাস রাগ দেখিয়ে বলল।
‘এই বুড়ো, চুপ কর। একেবারে পুকুরে ফেলে দেব লাথি মেরে। মুখের ওপর কথা বলিস!’ রাগে ফোঁসফোঁস করতে লাগল কলাগাছটা।
ব্যাপারটা সহ্য করতে পারল না ছোট ঘাসেরা। গর্জে উঠে বলল, ‘আদব-কায়দা তো কিছুই শেখোনি। বয়স্কদের সম্মান করতে শেখো। দাদুকে লাথি মারার কথা বলতে পারলে তুমি? তুমি তো সে দিনের কলাগাছ। আর দাদু এখানে আছে কত বছর ধরে।’
‘বয়স হলেই কি বড় হওয়া যায় রে ছোকরা? তোরা হচ্ছিস অতি ক্ষুদ্র। তোদের সম্মান দিয়ে চলতে হবে আমাকে?’ কলাগাছটা ভেংচি কেটে বলল।
একটু দূর থেকে এতক্ষণ ধরে তর্কাতর্কি দেখছিল পিঁপড়া খালা। ঘাসেরা তাকে ভালোবাসে খুব। ‘ক্ষুদ্র’ শব্দটা শুনে পিঁপড়া খালার গায়ে লাগে। সে কলাগাছের গোড়ায় এসে বলল, ‘তুমি মনে হয় আকাশ ছুঁয়ে ফেলেছ? এত হম্বিতম্বি দেখাও কেন?’
তারপর একটু থেমে দূর্বাঘাসদের পক্ষ নিয়ে বলল, ‘ঘাসদের ওপর শিশির মানে স্বর্গীয় দৃশ্য। আর কবি কী বলেছেন তুমি তো জানো না! বলেছেন, দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া
ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া
একটি ধানের শিষের উপরে
একটি শিশিরবিন্দু।
কবিতা শুনে কলাগাছটা চুপ হয়ে গেল। তাই দেখে পিঁপড়া খালা ঘাসদের ওপর একটু পায়চারি করে খাবার খুঁজতে বেরিয়ে পড়ল।
বাতাসে কলাগাছের পাতা সরসর করে আওয়াজ ছাড়ে, ‘এই পিচ্চিরা দেখ, আমার ক্ষমতা কত। আকাশ ছুঁয়ে ফেলব একদিন, দেখিস। গর্জন করতে পারবি আমার মতো? তোদের ছোট পাতা তো দেখাই যায় না। হা হা হা।’
একটি দূর্বাঘাস উত্তর দিল, ‘সব সময় ঝগড়া করতে ভালো লাগে তোমার?’
কলাগাছটা মুখ বাঁকিয়ে বলল, ‘মাটির সঙ্গে তোদের মিশিয়ে দেব, হতচ্ছাড়ার দল। আমার সঙ্গে পারবি তোরা?’
ঘাস দাদু বলল, ‘এত বাড়াবাড়ি করো না। আমরা ছোট্ট-মোট্ট। তোমার সঙ্গে হার-জিতের লড়াই আমরা কখনো করি না।’
অনেক দিন পর কলাগাছটার মোচা ধরে। কী সুন্দর দেখতে মোচাটা! দূর্বাঘাসেরা তাকিয়ে থাকে ওপরে। এতে কলাগাছের অহংকার আগের থেকে আরও বেড়েছে। ভাব নিয়ে থাকে সারাক্ষণ, ‘কী রে পিচ্চিরা, মোচার দিকে তাকিয়ে থাকিস তোরা— দেখি তো আমি। তোদের মধ্যে কে যেন বলেছিলি সম্মান দেখাতে তোদের। হি হি হি। তোরা আমার দিকে ফিরে কুর্নিশ করবি। তোদের দিকে না তাকালেও চলবে আমার, বুঝেছিস?’
কচি কচি ঘাসেরা সহ্য করতে পারে না অপমান। তারা কলাগাছের দিকে ফিরেও তাকায় না।
কিছুদিন পর মোচা থেকে ছোট ছোট কলা বের হয়। থোকায় কত কত কলা। ঘাসেরা চেয়ে চেয়ে দেখে। কী সুন্দর আর মায়াবী দেখতে কচি কলাগুলো! আলতো করে ছুঁয়ে দিতে ইচ্ছা করে। কিন্তু ঝগড়াটে কলাগাছটার কথা ভেবে মন খারাপ হয় ঘাসদের। কলাগাছটা সহ্যই করতে পারে না তাদের। ছোট বলে অপমান করে সারাক্ষণ।
দূর্বাঘাসেরা কলার গল্প করে বেড়ায়। পিঁপড়া খালা আসে মাঝে মাঝে। তাকে বলে কলার কথা। ঘাসফড়িং, পাখি, প্রজাপতিরাও আসে গল্প শুনতে।
ওদিকে কলাগাছটা নাক সিঁটকায়, ‘আমার কলা নিয়ে তোরা গল্প করিস? লজ্জা করে না তোদের? পাজির দল। খুব তো আকাশ ছোঁয়ার কথা শুনিয়েছিলি আমাকে।’
বেশ কিছুদিন পর দুয়েকটা কলায় রং ধরে। পাকতে শুরু করেছে মনে হয়। কলাগুলোও মোটা-তাজা হয়েছে খুব। বাড়ির কর্তা দেখে যায় মাঝে মাঝে কলাগুলো। কলাগাছটা দূর্বাঘাসদের দিকে তাকিয়ে হাসে, ‘দেখছিস আমার কেমন দাম? বাড়ির কর্তা পর্যন্ত আমাকে দেখে যায়। চোখে চোখে রাখে।’
ঘাস দাদু বলে, ‘এত অহংকার করো না। তোমার জীবন ফুরিয়ে আসছে। বাছাধন, আকাশ ছোঁয়া হবে না তোমার।’
‘এই হতচ্ছাড়া বুড়ো, মুখ সামলে কথা বল। আমাকে রাগাবি না কিন্তু।’
দুদিন পর বাড়ির কর্তা আবার আসেন। হাতে একটা দা। দা দেখে কলাগাছটা ভড়কে যায়। দূর্বাঘাসেরা দেখে কলাগাছটা ভয়ে নুয়ে পড়েছে। ঘাস দাদু চুপি চুপি বলল, ‘ওর আজ শেষ দিন।’
তারপর বাড়ির কর্তা এক কোপ দিয়ে কলাগাছটা কেটে ফেলে। হাতের নাগালে চলে আসে কলার কাঁদিটা। কাঁদিটা কেটে একপাশে রাখে। তারপর কলাগাছটা কেটে মাটিতে ফেলে দেয় বাড়ির কর্তা। পুরো কলাগাছটা তখন মাটিতে দূর্বাঘাসের ওপর আছড়ে পড়ে।
কলাগাছে একবারই কলা ধরে। তাই কলা নেওয়ার পরে গাছটার কোনো মূল্য থাকে না। কলা ছাড়িয়ে গাছটা কেটে ফেলতে হয়।
কোথা থেকে পিঁপড়া খালা দৌড়ে আসে। ‘বেচারা অহংকারী কলাগাছ।’ পিঁপড়া খালা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল।
ঘাস দাদু বলল, ‘ওর আর আকাশ ছোঁয়া হলো না। মাটিতে মিশিয়ে দিতে চেয়েছিল আমাদের, অথচ আজ সে-ই মাটিতে লুটিয়ে আছে। অতি ক্ষুদ্র বলে আমাদের ভেংচি কাটত। সেই ক্ষুদ্রদের দলেই শেষমেশ জায়গা হলো।’
ছোট ঘাসেরা লুটিয়ে পড়া কলাগাছের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ওর সঙ্গে কখনো কথায় পারতাম না আমরা। শুধু শুধু গালমন্দ করত। আজ আমরা জিতে গেছি।’