খাঁচার ভেতর ময়না পাখির ছানাটা চিউ চিউ করে ডেকেই যাচ্ছে। কত কিছু খেতে দিল আজলান, কিন্তু চিউ চিউ ডাক থামছেই না। গতকালই ওকে ময়না ছানাটা এনে দিয়েছেন। তাও কত বায়না করার পর রাজি হলেন দাদু। প্রথমে তো কোনোভাবে রাজি হচ্ছিলেন না। শুরু হলো আজলানের কান্না। একদিন বা দুদিন নয়, টানা তিন দিন কাঁদতে হয়েছে। শুধু কী কান্না? দাদুর কানের কাছে বারবার ঘ্যান ঘ্যান করতে হয়েছে।
তারপরই ময়না ছানাটা পেল আজলান। তবে সমস্যা হলো ওই একটা। সারা দিন চিউ চিউ করে ডাকে। আর ভাল্লাগছে না আজলানের। ও শুনেছিল, ময়না পাখি নাকি মানুষের মতো করে কথা বলে। আর এই ছানাটা! কথা বলা তো দূরে থাক, সারা দিন চিউ চিউ করেই যাচ্ছে। বাড়ির সবাই তো রীতিমতো আজলানের ওপর বিরক্ত। ও বুঝতে পারছে না, এখানে ওর কী দোষ! ও তো ছানাটার ঠিকঠাক যত্ন নিচ্ছে, তাও যদি চুপ না করে—কী আর করা।
এভাবে সন্ধ্যা নেমে এল। একটু অন্ধকার নামতেই ময়না ছানার চিউ চিউ ডাক বন্ধ হলো। হয়তো সারা দিন ডাকতে ডাকতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। তখনই বাবা এলেন শহর থেকে। আজলানের বাবা শহরে চাকরি করেন। কাল একুশে ফেব্রুয়ারি, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। তাই বাবা ছুটি পেয়েছেন। আজলান রাতে বাবার বুকের মধ্যে ঘুমাল। ঘুমানোর সময় বাবা ওকে ভাষা আন্দোলনের গল্প বললেন। ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি বাঙালিরা ভাষার জন্য মিছিল নিয়ে রাস্তায় নেমেছিলেন। সেই মিছিলে গুলি করল পুলিশ। শহিদ হলেন রফিক, জব্বার, বরকতসহ অনেকে। সে দিন তারা শহিদ হয়েছিলেন বলেই, আজ আমরা মায়ের ভাষায় কথা বলতে পারছি। নাহলে আমাদের উর্দুতে কথা বলতে হতো। আর উর্দু আমাদের মায়ের ভাষা নয়।
বাবার মুখে গল্প শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়ে আজলান। সকালে ঘুম থেকে উঠল। তারপর খালি পায়ে বাবার সঙ্গে গেল শহিদ মিনারে। ফুল দিল আজলান। সেখানে অনেক মানুষ এসেছে। আজলান তাদের কাউকে চেনে না। সবার হাতে ফুল। কারও পায়ে জুতা নেই। এভাবে সবাই ভাষা শহিদদের সম্মান জানাচ্ছে। আর সুর করে গাইছে, ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি…।’
ওরা ওখানে বেশিক্ষণ থাকল না। বাড়িতে আসতেই সেই চিউ চিউ ডাক আবার শুরু। আজলান ভাবল, এ তো দেখি মহামুশকিল হলো।
তখন বাবা বললেন, ‘চিউ চিউ করে কী ডাকছে?’
আজলান বলল, ‘দেখো না বাবা, দাদু ময়না পাখির ছানা এনে দিয়েছে। ছানাটা সারা দিন চিউ চিউ করে।’
বাবা খাঁচার দিকে এগিয়ে গেলেন। তারপর বললেন, ‘ইশ, ছানাটা তো কথা বলছে।’
আজলান বলল, ‘চিউ চিউ আবার কেমন কথা। এভাবে বললে কেউ বুঝবে?’
বাবা বললেন, ‘এটা ওর ভাষা। ওর মায়ের ভাষা। ময়না পাখিরা এই ভাষা বুঝবে।’
‘আমি তো শুনেছি ময়না পাখি মানুষের মতো করে কথা বলে,’ বলল আজলান।
বাবা জবাব দিলেন, ‘মানুষের মতো করে কথা বলে না। ওদের মায়ের ভাষা কেড়ে নিয়ে জোর করে মানুষের ভাষা শেখানো হয়। যেভাবে আমাদের মায়ের ভাষা কেড়ে উর্দু শেখাতে চেয়েছিল।’
আজলান ছোট্ট হলেও এটুকু জানে, জোর করে কারও মায়ের ভাষা কেড়ে নেওয়া ঠিক নয়। তাই ময়না ছানাকে এভাবে আটকে রাখা ভারি অন্যায় হয়েছে। ও বলল, ‘বাবা, আমি তো ভুল করে ফেলেছি। এখন কী করব?’
বাবা বললেন, ‘তুমি ছানাটিকে ছেড়ে দাও। ও উড়ে মায়ের কাছে চলে যাবে। তারপর ওর ভাষাতেই মা বলে ডাকবে। সেই ডাক শুনে ওর মা ওকে পালকের মধ্যে জড়িয়ে রাখবে।’ আজলান ময়না ছানাটি ছেড়ে দিতেই চিউ চিউ করে কয়েকবার ডাকল। তারপর ফুড়ুৎ করে
উড়াল দিল।