নূর কুতুবুল আলম ভূঁইয়া, যার পরিচয় এখন আর কারও অজানা নয়। সরকারি চাকরিজীবী হয়েও অবৈধ ব্যবসা পরিচালনা করে তিনি নিজের পরিচয় বদলে ফেলেছেন। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের হিসাব-সহকারী থেকে এলপিআর-এ যাওয়ার আগ পর্যন্ত ছিলেন সহকারী হিসাবরক্ষক। নিজের প্রভাব ও শক্তি খাটিয়ে চাকরিজীবনের অধিকাংশ সময় পার করেছেন টঙ্গীর আঞ্চলিক হিসাব পরিদপ্তরে। অফিসের নিয়ম-নীতির বালাই ছিল না তার চাকরির রুটিনে। সপ্তাহে এক দিন অফিস করেই নিজের দায়িত্ব ও সেবার কাজটি শেষ করেছেন। কেতাবি নাম কুতুবুল আলম ভূঁইয়া হলেও আমজনতার কাছে তিনি বিদ্যুতের কুতুব নামেই বেশি পরিচিত। দীর্ঘ এক যুগে একই সঙ্গে সরকারি চাকরি ও ডেভেলপার কোম্পানির মালিক হয়ে সমানতালে কাজ চালিয়েছেন।
পিডিবিতে চাকরির সুবাদে ঠিকাদারদের বিল আটকানো, কেনাকাটায় অনিয়মসহ নানা দুর্নীতিতে সিদ্ধহস্ত হয়ে উঠেছিলেন বলে ‘খবরের কাগজ’-এর অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। সেই অবৈধ দুর্নীতির টাকায় দুর্নীতির রতনদের ম্যানেজ করে গড়ে তুলেছেন কংক্রিট ডেভেলপার্স লিমিটেড; যা জয়েন্ট স্টকে নিবন্ধিত কোম্পানি। তাছাড়া তার আরও আছে নিধি এন্টারপ্রাইজ নামে একটি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান। এখন প্রশ্ন হলো- তিনি একজন প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী হয়ে কীভাবে শত কোটি টাকার ব্যবসা পরিচালনা করলেন?
১৯৭৯ সালের সরকারি চাকরির আচরণ বিধিমালার ১৭(১) নম্বর ধারায় স্পষ্ট বলা আছে- ‘এই আইনের অন্য বিধান অনুসারে, কোনো সরকারি কর্মচারী সরকারের পূর্ব অনুমোদন ছাড়া কোনো ব্যবসায় জড়াতে পারবেন না। অথবা দায়িত্বের বাইরে অন্য কোনো কাজ কিংবা চাকরি নিতে পারবেন না।’
আবার ১৭ (৩) নম্বর ধারায় এটাও স্পষ্ট বলা আছে- ‘সরকারের পূর্ব অনুমোদন ছাড়া একজন সরকারি কর্মচারী তার এখতিয়ারভুক্ত এলাকায় নিজের পরিবারের কোনো সদস্যকে কোনো ধরনের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করার বিষয়ে অনুমতি দিতে পারবেন না।’
দুর্নীতি দমন কমিশন পরিচালিত বিভিন্ন অনুসন্ধানে দেখা গেছে, কিছু কিছু সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং তাদের ওপর নির্ভরশীল পরিবারের সদস্যরা সরকারি অনুমোদন ছাড়া বিভিন্ন ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনা করছেন, যা সরকারি কর্মচারী চাকরি বিধিমালার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। সঙ্গত কারণে, চাকরি বিধিমালার নির্দেশনাসমূহ অনুসরণের বাধ্যবাধকতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন বলে কমিশন মনে করেন।
সরকার বিভিন্ন সময়ে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা বাড়িয়েছে। এরপরও দেখা যায়, সরকারি চাকরিজীবীদের একটা ‘বড় অংশ’ আচরণবিধি লঙ্ঘন করে নিজস্ব ব্যবসায় যুক্ত হয়েছেন।
এনিয়ে ২০২১ সালে মন্ত্রিপরিষদ সচিবের কাছে এ সংক্রান্ত একটি চিঠি পাঠায় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদুক)। সে সময়ের দুদুক সচিব ড. মু. আনোয়ার হোসেন সিকদার স্বাক্ষরিত চিঠিতে দুদুক জানায়- কিছু সরকারি চাকরিজীবী হয় ঠিকাদারি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছেন, নয়তো নিজের নামে অথবা পরিবারের সদস্যদের নামে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান খুলে বসেছেন। এভাবে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন তারা।
সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার ‘খবরের কাগজ’কে বলেন- এগুলো ছিল শাস্তিযোগ্য কর্মকাণ্ড। একজন বিধি লঙ্ঘনকারী এ জন্য বিভাগীয় ব্যবস্থার মুখোমুখি হতে পারতেন। এমনকি তার চাকরিও চলে যেতে পারত। এ ধরনের চর্চা চাকরি ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা পরিপন্থি।
সরকারি কর্মচারীদের চাকরি বিধিমালা সম্পর্কে ভালোভাবে ওয়াকিবহাল হওয়া ভীষণভাবে জরুরি। স্ব স্ব বিভাগে যখন তাদের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির জায়গা দুর্বল হয়ে যায় তখনই এ ধরনের অন্যায় অপরাধে জড়িত হওয়ার প্রবণতাও বেশি থেকে যায়। আজ এ সমাজে এরকম হাজারো কুতুবের পদচারণা ও আস্ফালন রয়েছে। বেশির ভাগ তারা ক্ষমতা ও প্রতিপত্তিকে কাজে লাগিয়ে ওপরে ওঠার চেষ্টা করে। সিঁড়ি হিসেবে তারা তাদের মতোই রতনের শেল্টার নিয়ে থাকে। অনুসন্ধানী প্রতিবেদন হয় ফলাও করে, লোক দেখানো নামকাোয়াস্তে একটা তদন্ত কমিটি হয়। কিন্তু জনতার সামনে এর মুখোশ উন্মোচন হতে বেশ সময় নষ্ট হয়ে যায়, এরই মধ্যে সমাজে সৃষ্টি হয় আরেক নতুন কুতুব। প্রায়ই পত্রিকায় খবর আসে সরকারি অফিসের পিওন কোটি টাকার বিত্তবৈভবের মালিক। রাজধানীতে চারটি বাড়ি, সেই সঙ্গে বিভিন্ন দামি গাড়িও আছে। সব সম্পত্তিই যেন স্ত্রীই গড়েছেন। শালিকার জন্যও বরাদ্দ থাকে এসব সম্পদ। তাহলে সরকারের স্ব স্ব বিভাগ চুপ থাকবে কেন? যে দপ্তরে এমন দুর্নীতিবাজ তৈরি হবে সেখানে স্ব স্ব বিভাগের প্রধানকে জবাবদিহির আওতায় আনা উচিত। তাহলেই থলের বিড়াল বেড়িয়ে আসবে। স্ব স্ব বিভাগের পাশাপাশি দুর্নীতি দমন কমিশনেরও শক্ত ভূমিকার প্রয়োজন রয়েছে। দোষীদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। তাহলেই দেশে এ ধরনের কুতুব সৃষ্টির পথ বন্ধ হবে।