কবিতা : ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯
অনুধাবনমূলক প্রশ্ন ও উত্তর
প্রশ্ন: ‘একুশের কৃষ্ণচূড়া আমাদের চেতনারই রং’ ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: ‘ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯’ কবিতার এ চরণে কবি কৃষ্ণচূড়া ফুলের রক্তবর্ণই যে ভাষা শহিদদের আত্মত্যাগের প্রতীক এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রতীকী প্রতিভাস, সে প্রসঙ্গে এ কথা বলেছেন।
একুশ আমাদের দেশাত্মবোধকে উজ্জীবিত করেছিল নবজাগ্রত চেতনায়, বাঙালিত্বের বোধদীপ্তিতে। একুশের কৃষ্ণচূড়াকে আমাদের চেতনার রং বলা হয়েছে মূলত বাঙালিত্বকে ১৯৫২ সালে মূল্য দেওয়ার জন্য। বাঙালির পাকিস্তান প্রীতির শেষ অধ্যায় ১৯৫২। বাঙালিরা বুঝতে পেরেছিল ১৯৪৭ সাল ছিল ঐতিহাসিক ভুল। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ভাষা আন্দোলনে সালাম, রফিক, জব্বার, বরকতসহ অনেকে জীবন দিয়েছেন। তাদের রক্তে রঞ্জিত হয়েছে রাজপথ। তাই ফাগুনে কৃষ্ণচূড়ার রক্তবর্ণ একুশকে স্মরণ করিয়ে দেয়, আমাদের দেশাত্মবোধের চেতনাকে উদ্বুদ্ধ করে তোলে। ১৯৬৯ সালে ফেব্রুয়ারি মাসে আবারও গণ-অভ্যুত্থান ঘটলে বাঙালিরা প্রমাণ করে বায়ান্ন তাদের চেতনায় গাথা, আর তাদের প্রাণ বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির মর্যাদা রক্ষায় নিবেদিত। এ কারণেই একুশকে প্রতীকীভাবে বাঙালির চেতনার অর্থাৎ জাগরণের রং বলা হয়েছে।
প্রশ্ন: ‘সারা দেশ ঘাতকের অশুভ আস্তানা’ ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: ‘ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯’ কবিতার এ চরণে কবি ১৯৬৯ সালে স্বৈরাচারী আইয়ুব-সরকারের দমন-নিপীড়ন-হত্যাযজ্ঞ প্রসঙ্গে এ কথা বলেছেন। ভাষা আন্দোলনের চেতনা বাঙালিকে সংগ্রামী ও প্রতিবাদী হতে শেখায়। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৬৯ সালে পূর্ব-বাংলার রাজনৈতিক পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠে। সামরিক শাসক আইয়ুব খানের পতনের আন্দোলন, ছয় দফার গণদাবি, আগরতলা মামলা, এসব কিছু বাঙালিদের অনুভব করতে শেখায় পাকিস্তানি শাসকরা তাদের কখনোই আপন ভাবেনি। ফলে রাজপথে সংঘাত অনিবার্য হয়ে উঠলে পেটোয়া সামরিক বাহিনীও বাঙালি নিধন করে সমগ্র বাংলাকে মৃত্যু উপত্যকায় পরিণত করে। এ জন্য মৃত্যুপুরী পূর্ব-বাংলাকেই কবি ‘ঘাতকের অশুভ আস্তানা’ বলেছেন।
প্রশ্ন: ‘সেই ফুল আমাদেরই প্রাণ।’ ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: ‘ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯’ কবিতার এ চরণে কবি বাংলা ভাষার টিকে থাকা এবং মর্যাদা রক্ষার মধ্যেই যে বাঙালির ভবিষ্যৎ প্রাণশক্তি ও বিকাশ নিহিত, সে প্রসঙ্গে এ কথা বলেছেন। ১৯৬৯ সালে কবি শাসকের অপতৎপরতায় চারদিকে সন্ত্রাসের রং ছড়িয়ে পড়তে দেখেছেন। পাশাপাশি তিনি ভাষা আন্দোলনে আত্মদানকারী বীর শহিদ সালাম ও বরকতকে আবারও রাজপথে নেমে আসতে দেখেন। অর্থাৎ ভাষা আন্দোলনের অবিনশ্বর সংগ্রামী চেতনার মৃত্যু যে ঘটেনি বুঝাতে চেয়েছেন। কারণ ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন বাঙালির জাতীয়তাবাদী চেতনার জাগরণকাল। ফলে রক্তস্নাত বাংলা ভাষার মাধ্যমে যে জাতি বায়ান্নতে জাগ্রত হয়েছিল তার পূর্ণ বিকাশ দেখা যায় ১৯৬৯ সালের নবজাগরণে আইয়ুববিরোধী আন্দোলনে। বায়ান্ন-পরবর্তী প্রজন্ম যে সালাম-বরকতের আত্মদানকে অর্থাৎ বাংলা ভাষার মর্যাদাকে ভূলুণ্ঠিত হতে দেয়নি এবং ভবিষ্যতেও এ মর্যাদা ধরে রাখতে হবে, সে কথা প্রতীকী ভাষায় কবি এ উচ্চারণ করেছেন। বাংলা ভাষা টিকে থাকলেই বাঙালি টিকে রইবে, এ যেন অমোঘ সত্য কথা।
প্রশ্ন: ‘চতুর্দিকে মানবিক বাগান, কমলবন হচ্ছে তছনছ।’ ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: ‘ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯’ কবিতার এ চরণে কবি ১৯৬৯ সালের অগ্নিগর্ভ পূর্ব-বাংলায় ঘাতকের অর্থাৎ শাসকের অশুভ তৎপরতায় মানবিকতা ও সৌন্দর্যের বিনাশ ঘটেছে তা বুঝিয়েছেন। ভাষা আন্দোলনের চেতনাবিরোধী ঘাতক দল সারা দেশে অন্ধকারের রাজত্ব কায়েম করতে চায়। ক্ষমতার মোহে অন্ধ আইয়ুব খান বাঙালিদের লাশের ওপর মসনদ রেখে দেশ শাসন করতে চান। তার পেটোয়া বাহিনীর নির্যাতনে দেশের মানুষ কেউ মরা কেউবা আধমরা অবস্থায় ছিল। ফলে তখন মানবিকতার কোনো বালাই তখন ছিল না। গণতন্ত্রকে গলা টিপে হত্যা করে আইয়ুব খান সামরিক ফরমানে দেশ চালাতে থাকেন। মানুষের সুন্দর ও মহৎ চিন্তা-চেতনার বিকাশ ব্যাহত হয়। মৃত্যুপুরী পূর্ব-বাংলায় মনুষ্যত্বকে পায়ে দলে সামরিক সরকার জনগণের শান্তি-শৃঙ্খলা-সংস্কৃতি ধ্বংস করে দানবীয় ধ্বংসলীলায় মেতে ওঠে।
লেখক : সহকারী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ
আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজ, ঢাকা
কবীর