সপ্তম অধ্যায় : বাংলাদেশের বেসরকারি সমাজ উন্নয়ন কার্যক্রম
নমুনা প্রশ্ন ও উত্তর
প্রশ্ন: BRAC কী ? ব্র্যাকের কার্যক্রম নিয়ে সংক্ষেপে আলোচনা করো।
উত্তর: বাংলাদেশে যেসব বেসরকারি সংস্থা আর্থসামাজিক উন্নয়নে, বিশেষ করে গ্রামীণ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে কার্যকরভাবে ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে, তার মধ্যে সর্ববৃহৎ হলো BRAC।
১. ব্র্যাকের নিয়োজিত কর্মচারী এবং সেবাগ্রহীতার সংখ্যার মানদণ্ডে এটি বিশ্বের বৃহত্তম বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা।
২. ২০১৩ সালে বিশ্বের ১০০টি সর্বোত্তম এনজিওর মধ্যে ব্র্যাক প্রথম হওয়ার গৌরব অর্জন করে।
৩. ২০০৯ সালের ডিসেম্বরে ব্রিটেনের রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ ব্র্যাকের প্রতিষ্ঠাতা ফজলে হাসান আবেদকে নাইট (Knight) উপাধিতে সম্মানিত করেন।
ব্র্যাকের কার্যক্রমগুলো: প্রতিষ্ঠালগ্নে ব্র্যাকের কার্যক্রম শুরু হয় ঋণদান কর্মসূচির মাধ্যমে। বর্তমানে ব্র্যাক অনেক ব্যাপক, বিস্তৃত ও বৈচিত্র্যমুখী কর্মসূচি পরিচালনা করে থাকে। এসব কর্মসূচি মানবজীবনের দৈহিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পুষ্টি, সচেতনতা প্রভৃতি দিককে কেন্দ্র করে গ্রহণ করা হয়েছে। নিচে ব্র্যাকের কার্যক্রমের সংক্ষিপ্ত বিবরণ দেওয়া হলো-
১. পল্লী উন্নয়ন কর্মসূচি: গ্রামীণ ভূমিহীন, দুস্থ, দরিদ্র ও অনগ্রসর জনগোষ্ঠীকে সমবায়ের মাধ্যমে সংগঠিত করে তাদের আর্থসামাজিক উন্নয়নের লক্ষ্যে ব্র্যাক পল্লী উন্নয়নমূলক কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। ব্র্যাক ১৯৮৬ সালে পল্লী উন্নয়ন কার্যক্রম চালু করে।
BRAC-এর ৪টি সমন্বিত পল্লী উন্নয়ন কর্মসূচি রয়েছে। BRAC পল্লী উন্নয়নমূলক কার্যক্রমের আওতায় দরিদ্রদের দলীয় ভিত্তিতে ঋণদান করে থাকে।
BRAC পল্লী উন্নয়ন কার্যক্রম দুটি ধারায় চলে। যথা-
১. Rural Development Programme (RDP)
২. Rural Credit Project (RCP)
ক. সেচ (Irregation): এক্ষেত্রে RDP এবং RCP ধরনের ঋণ দিয়ে থাকে। যথা-
(ক) টিউবওয়েল কেনার জন্য Capital Loan.
(খ) জ্বালানি ও মজুরি পরিশোধের জন্য Operating Loan.
এ সেক্টরে ১৯৯২ সালে ১৬৫ মিলিয়ন টাকা অগ্রিম দেওয়া হয়।
খ. রেশম: রেশম শিল্পের উন্নয়নের জন্য ব্র্যাক ঋণ দিয়ে থাকে।
গ. সামাজিক বনায়ন: এক্ষেত্রে নার্সারি কর্মীদের প্রশিক্ষণ এবং বীজ দিয়ে উন্নত বনায়ন সৃষ্টির ব্যবস্থা করা হয়।
ঘ. মৎস্য চাষ, ঙ. পশু পালন ও হাঁস মুরগির খামার,
চ. গ্রামীণ প্রশিক্ষণ, ছ. কুটিরশিল্প, জ. খাদ্য ও গুদাম ইত্যাদির জন্য ব্যাক ঋণ দিয়ে থাকে।
২. ক্ষুদ্র ঋণদান কর্মসূচি: ব্র্যাকের একটি আয় উপার্জনমূলক কর্মসূচি হলো ঋণদান। এটি ব্র্যাকের সর্ববৃহৎ কর্মসূচি। এ কর্মসূচির আওতায় গ্রামীণ দরিদ্র, ভূমিহীন পুরুষ, নারীকে স্বল্প সুদে ঋণ দিয়ে থাকে ব্র্যাক। যাতে তারা আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারে, হতে পারে স্বাবলম্বী। ঋণগ্রহীতারা সাপ্তাহিক বা মাসিক কিস্তিতে ঋণ পরিশোধ করে থাকে। ঋণদানকে দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার অত্যাবশ্যকীয় হাতিয়ার হিসেবে দেখা হয়। ঋণগ্রহীতাদের অধিকাংশই নারী। এ ঋণের শর্ত হিসেবে তারা নিজস্ব পুঁজি সঞ্চয় হিসেবে গড়ে তোলে।
৩. শিক্ষামূলক কর্মসূচি: ব্র্যাকের মৌলিক কার্যক্রমের অন্যতম কর্মসূচি হচ্ছে শিক্ষামূলক কার্যক্রম। ১৯৮৫ সালে মানিকগঞ্জের কয়েকটি গ্রামে ২২টি স্কুল চালু করার মাধ্যমে ব্র্যাক তাদের এ শিক্ষা কর্মসূচি চালু করে। এর মাধ্যমে বাস্তবায়িত কর্মসূচি নিচে তুলে ধরা হলো-
ক. উপ-আনুষ্ঠানিক প্রাথমিক শিক্ষা: উপ-আনুষ্ঠানিক শিক্ষাব্যবস্থা হিসেবে ১৯৮৫ সালে ব্র্যাক এ কর্মসূচি চালু করে। তিন বছর মেয়াদি এ শিক্ষাব্যবস্থায় ৮-১০ বছর বয়সী পিছিয়ে পড়া সুবিধাবঞ্চিত শিশু যারা কখনো স্কুলে যায়নি, তাদের শিক্ষাদান করা হয়। এ শিক্ষা কার্যক্রমে বিশেষ করে মেয়েদের শিক্ষিত করে তোলার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়। এটি সরকারের প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রমের পরিপূরক হিসেবে কাজ করছে। এর লক্ষ্য হচ্ছে শিশুদের জন্য উদ্ভাবনমূলক পদ্ধতিতে শিক্ষাদানের ব্যবস্থা করা। যাতে তারা শিক্ষার মূল স্রোতধারায় মিশতে পারে।
খ. বয়স্ক শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষা: এ কর্মসূচি চালু হয় ১৯৮৮ সালে। যার আওতাভুক্ত হচ্ছে ১১-১৬ বছর বয়সের কিশোর-কিশোরীরা। তিন বছরব্যাপী এ কর্মসূচিতে যারা কখনো স্কুলে যায়নি কেবল তারাই লেখাপড়ার সুযোগ পায়।
গ. ব্যবহারিক শিক্ষা: নিরক্ষরতা দূরীকরণ ও সচেতনতা সৃষ্টিতে ব্যবহারিক বয়স্ক শিক্ষা গৃহীত হয়। এজন্য ব্র্যাক দেশব্যাপী বয়স্ক শিক্ষাকেন্দ্র গড়ে তুলেছে। এর মূল লক্ষ্য হচ্ছে বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং নিরক্ষরতা দূরীকরণ ও সামাজিক সচেতনতা অর্জনের মাধ্যমে মানবসম্পদ উন্নয়ন।
ঘ. ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়: ২০০১ সাল থেকে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষা দেওয়া হচ্ছে। মানবসম্পদ উন্নয়নে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় কাজ করে যাচ্ছে।
ঙ. মেধা বিকাশ প্রকল্প: কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে দেশ-বিদেশে অধ্যয়নরত মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের জন্য ‘মেধা বিকাশ’ প্রকল্পের অধীনে ব্র্যাক বৃত্তি দিচ্ছে।
চ. কিশোর-কিশোরী উন্নয়ন কর্মসূচি: এর আওতায় সারা দেশে ৮ হাজার ৫০০টিরও বেশি কিশোর-কিশোরী উন্নয়নকেন্দ্র খোলা হয়েছে। এর মাধ্যমে তাদের সাক্ষরতা জ্ঞান, পাঠ্যাভ্যাস, বাল্যবিবাহ, বহুবিবাহ, যৌতুক রোধ, সহ-পাঠ্যক্রমিক ভাব বিনিময়, প্রজনন স্বাস্থ্য, অধিকার, মাদকাসক্তি, এইডস সচেতনতা সৃষ্টি প্রভৃতি সম্ভব হচ্ছে।
৪. স্বাস্থ্যসেবা কর্মসূচি: ব্র্যাক তার সূচনালগ্ন থেকেই স্বাস্থ্য কর্মসূচির ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছে। বিশেষ করে দেশের অনুন্নত সমাজব্যবস্থার গ্রামীণ দরিদ্র ও ভূমিহীনদের স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতনতা করাসহ নানা কর্মসূচি রয়েছে।
ক. খাবার স্যালাইন সম্প্রসারণ কর্মসূচি: ১৯৮০ সালে ডায়রিয়া নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে ‘ঘরে ঘরে খাবার স্যালাইন তৈরি শেখানো’ কার্যক্রমের মাধ্যমে ব্র্যাকের স্বাস্থ্য কর্মসূচির সূচনা হয়। সমগ্র দেশে ব্র্যাকের কর্মীরা প্রতিটি পরিবারে গিয়ে নারীদের হাতে কলমে স্যালাইন তৈরির প্রশিক্ষণ দেয়। এ ছাড়া বিভিন্ন প্রচার মাধ্যমে যেমন- রেডিও, টেলিভিশন এবং পত্র-পত্রিকার মাধ্যমেও স্যালাইন তৈরির কর্মসূচি প্রচার করা হয়।
খ. মা ও শিশু স্বাস্থ্য কার্যক্রম: মা ও শিশুদের রোগ ব্যাধি, মৃত্যুঝুঁকি কমিয়ে আনা, প্রসবপূর্ব ও প্রসব-পরবর্তী পরিচর্যা, নিরাপদ প্রসব ব্যবস্থা নিশ্চিত করা, মাতৃদুগ্ধ সেবন, পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করা ইত্যাদি কর্মসূচি গ্রহণের মাধ্যমে ব্র্যাক মা ও শিশুস্বাস্থ্য কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে।
গ. প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিচর্যা: স্বাস্থ্য সংক্রান্ত সেবা এ কার্যক্রমের আওতায় পরিচালিত হয়। যেমন- স্বাস্থ্য ও পুষ্টি শিক্ষা, টিকাদান ও ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল বিতরণ, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, বিশুদ্ধ খাবার পানি পান, স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেট নির্মাণ ইত্যাদি।
ঘ. কেন্দ্র সুবিধাভিত্তিক সেবাসমূহ: ‘সুস্বাস্থ্য’ নামক সমষ্টিভিত্তিক ব্র্যাকের স্বাস্থ্যকেন্দ্র গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে থাকে। এ ছাড়া ২০০০ সালে ব্র্যাক কৃত্রিম অঙ্গ স্থাপন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করে।
৫. ব্র্যাক ব্যাংক প্রকল্প: গ্রামীণ ভূমিহীন দুস্থ, দরিদ্র শ্রেণিকে প্রাতিষ্ঠানিক সেবার আওতায় ব্র্যাক ব্যাংক স্বল্প সুদে ঋণ দিয়ে থাকে। দলের মূলধন সমস্যার সমাধানকল্পে ১৯৯০ সালের জানুয়ারি মাসে ব্র্যাক ব্যাংক প্রকল্প চালু করে।
লেখক : প্রভাষক, সমাজকর্ম বিভাগ
শের-ই-বাংলা স্কুল অ্যান্ড কলেজ, ঢাকা
কবীর