মাটিরও পিঞ্জিরার মাঝে বন্দি হইয়ারে কান্দে হাসন রাজার মন মইনারে, লোকে বলে বলে রে ঘর-বাড়ি ভালা নয় আমার কি ঘর বানাইব আমি শূন্যের মাঝার,’ কালজয়ী এসব গানের স্রষ্টা মরমি কবি হাসন রাজা। সুনামগঞ্জ শহরের নিকটবর্তী সুরমা নদীর তীর ঘেঁষে যাওয়া লক্ষণশ্রী পরগনার তেঘরিয়া গ্রামে বিখ্যাত মরমি সাধক হাসন রাজার বাড়ি।
অনেক দিন ধরে শুধু পরিকল্পনাই করছি সবাই মিলে ঘুরতে যাব হাসন রাজার বাড়ি কিন্তু ব্যাটে-বলে না মেলাতে পারার কারণে যাওয়াই হচ্ছিল না। শেষ পর্যন্ত হুট করে একদিন সকালবেলাতেই বেরিয়ে পড়লাম হাসন রাজার বাড়ির উদ্দেশে।
অফিসের সবাইকে বললাম, অনেক দিন হয় কোথাও ঘুরতে যাওয়া হয় না সবাই চলুন ঘুরে আসি হাসন রাজার বাড়ি থেকে। আমার প্রস্তাবে সবাই এক কথায় রাজি হয়ে গেল। সকালবেলা বের হতে হবে তাই আর দেরি না করে শুয়ে পড়লাম। সকাল বেলা ঘুম ভাঙল তপন দাদার ফোনে। অপর প্রান্ত থেকে তপন দাদা বললেন উঠলেন, কি সুমন্ত কি এখনো ঘুমে? আমি বললাম এই তো উঠে গেছি।
নিদ্রা দেবীর আবেশ থেকে বের হয়ে বেরিয়ে পড়লাম অফিস পানে। অফিস থেকেই আমরা সবাই একত্রিত হয়ে চার চাকার যান করে যাব গন্তব্য পানে। আমি বাসার থেকে বের হয়ে ফোন দিচ্ছি বাকি সব ভ্রমণসঙ্গীদের।

ঘড়ির কাঁটায় ততক্ষণে সকাল ৮টা বাজি বাজি করছে। দিলাম ফোন মিসবা ভাইকে। কোথায় আছে জানতে চাইলে উনি বললেন, ‘আমিও আছি অফিসের কাছাকাছি।‘ অফিসে উপস্থিত হয়ে দেখি ডালিয়া, বাসার, মিসবা, রিতন, নাজিয়া, মিঠু, তপনদা সবাই উপস্থিত। এবার অপেক্ষার পালা চার চাকার বাহনের জন্য। কিছু সময়ের মাঝে চার চাকার বাহন নিয়ে জালাল ভাই উপস্থিত। কাল বিলম্ব না করে আমরা রওনা দিলাম গন্তব্য পানে।
গন্তব্য পথে যাত্রা শুরু করলাম ঘড়ির কাঁটায় তখন সকাল ১০টা। পিচঢালা পথ পেরিয়ে এগিয়ে চলছি আমরা। গাড়িতে চলছে একেক সময় একেক গান। কেউ বাংলা গান শুনবে কেউবা আবার হিন্দি গান এ নিয়ে চলছে কথার যুদ্ধ। সবার কথামতো বাসার একটু পরপর গান পরিবর্তন করতে লাগল আর গাড়ি এগিয়ে যেতে লাগল গন্তব্য পানে। বোকা নদী, মহাসিং নদী, নাইন্দা নদী ওপর তৈরি ব্রিজ পেরিয়ে আমরা ছুটে চলছি।
বলে রাখা ভালো হাসন রাজার প্রকৃত নাম দেওয়ান হাসন রাজা। তার মুখ্য পরিচয় তিনি একজন মরমি কবি। তার সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একবার ভারতীয় দর্শন কংগ্রেসের অধিবেশনে সভাপতির ভাষণে বলেছিলেন, ‘পূর্ববঙ্গের একজন গ্রাম্য কবির গানে দর্শনের একটি বড় তত্ত্ব পাই সেটি এই যে, ব্যক্তি-স্বরূপের সহিত সম্বন্ধসূত্রেই বিশ্ব সত্য।’
১৮৫৪ সালের ২১ ডিসেম্বর সিলেট জেলার সুনামগঞ্জে লক্ষ্মণশ্রী গ্রামের এক জমিদার পরিবারে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম দেওয়ান আলী রাজা চৌধুরী এবং মাতা মোসাম্মৎ হুরমত জান বিবি। হাসন রাজা ছিলেন তাদের দ্বিতীয় পুত্র। হাসনের পূর্বপুরুষের অধিবাস ছিল ভারতের উত্তরপ্রদেশের অযোধ্যায়। বংশ পরম্পরায় তারা হিন্দু ছিলেন।
অতঃপর তারা দক্ষিণবঙ্গের যশোর জেলা হয়ে সিলেটে এসে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। তার দাদা বীরেন্দ্র চন্দ্র সিংহ দেব মতান্তরে বাবু রায় চৌধুরী সিলেটে এসে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। ১৫ বছর বয়সে পিতৃবিয়োগ হলে সংসার ও জমিদারি পরিচালনার দায়িত্ব তার ওপর ন্যস্ত হয়। হাসন বেশ সুদর্শন পুরুষ ছিলেন। শুধু তাই নয়, তিনি ছিলেন স্বশিক্ষিত।
তিনি সহজ-সরল সুরে আঞ্চলিক ভাষায় প্রায় সহস্রাধিক গান এবং পঙ্ক্তি রচনা করেছেন। এ ছাড়া আরবি ও ফার্সি ভাষায় ছিল বিশেষ দক্ষতা। যৌবনে তিনি ছিলেন অত্যন্ত শৌখিন ও ভোগবিলাসী, কিন্তু পরিণত বয়সে সব বিষয়-সম্পত্তি বিলি-বণ্টন করে দরবেশ জীবনযাপন করেন। তারই উদ্যোগে সুনামগঞ্জ হাসন এম ই স্কুল, অনেক ধর্ম-প্রতিষ্ঠান ও আখড়া স্থাপিত হয়।
বিদ্যালয়ের অনেক মেধাবী ছাত্রের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থাও তিনি করতেন। কিন্তু হাসন রাজার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল না। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না থাকলেও হাসন রাজা ছিলেন একজন স্বশিক্ষিত ব্যক্তি। তিনি সহজ-সরল সুরে আঞ্চলিক ভাষায় প্রায় এক হাজার আধ্যাত্মিক গান রচনা করেন। স্থানীয় বাউল-ফকিরেরা সেসব গান গেয়ে তাঁকে পরিচিত করে তোলেন। হাসন রাজা ছিলেন একজন ঐশীপ্রেমী এবং সেই প্রেমে মাতোয়ারা হয়েই তিনি গান রচনা করতেন। তার গানে প্রেম ও বৈরাগ্যময় আধ্যাত্মিক চেতনার প্রকাশ ঘটেছে।
তার গানগুলো যেন হিন্দু ও মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের একটি মিলন ক্ষেত্র। আমরা পা দিলাম ‘হাছন রাজা মিউজিয়াম’ সামনে। সুরমা নদীর কোল ঘেঁষে সুনামগঞ্জ শহরের তেঘরিয়াতে অবস্থিত এই মিউজিয়াম। পদব্রজে এগিয়ে গেলাম সম্মুখ পানে। প্রবেশ করলাম মিউজিয়ামের ভেতরে। একে একে ঘুরে দেখলাম মিউজিয়াম। মিউজিয়ামের প্রতিটি কোনায় বহন করছে এক জমিদারের অতীত ঐতিহ্যের পদাবলি।
মিউজিয়ামে সংরক্ষিত রয়েছে জমিসংক্রান্ত বিভিন্ন দলিল-দস্তাবেজ। হাসন রাজার ব্যবহৃত আলখেল্লা, গ্রামোফোন, লাঠি, কলম, আলমারি, টেবিল, চেয়ার, গেঞ্জি, ডুগি, তবলা, বাক্স, পশুরিপাগড়ি, খড়ম, কোর্তা, পাঞ্জাবি, ঢাল, তরবারি, বাসন-কোসন ইত্যাদি মিউজিয়ামে সংরক্ষিত। এ ছাড়া তার এই সংরক্ষিত মিউজিয়ামে দেখা যায় হাতের লেখা বিভিন্ন গান ও কবিতার পাণ্ডুলিপি, যা দর্শনার্থীদের মুগ্ধ ও বিমোহিত করে।
নেই জমিদার, নেই জমিদারিও। আছে শুধু জমিদারের রেখে যাওয়া স্থাপত্য। বাড়ির ভেতরের পুকুর পাড়ে গিয়ে আমরা বসলাম। হয়তো এই পুকুর পাড়েই বসে হাসন রাজা রচনা করেছেন তাঁর বিখ্যাত সব গান। বাড়িটি কালের সাক্ষী হয়ে আজও পর্যটকদের দৃষ্টি কেড়ে নেয়। ইতিহাসের সাক্ষী হতে পেরে নিজেকে ধন্য মনে হলো।
কীভাবে যাবেন
হাসন রাজার বাড়িতে যেতে হলে আপনাকে প্রথমেই যেতে হবে সিলেটে। কুমারগাঁও বাসস্ট্যান্ড থেকে বাসযোগে যেতে হবে সুনামগঞ্জ নতুন বাস টার্মিনালে। এরপর অটোরিকশায় ট্রাফিক পয়েন্ট। রিকশা বা হেঁটে তেঘরিয়া। পৌঁছে যাবেন সুরমার তীরঘেঁষা হাছন রাজার বাড়ি বা মিউজিয়ামে। তা ছাড়া সিলেট শহরের চৌহাট্টা থেকে গাড়ি নিয়ে সরাসরি চলে যেতে পারেন মিউজিয়ামে। মিউজিয়ামের প্রবেশ ফি ১০ টাকা।
কলি
.jpg)




.jpg)