ফিনল্যান্ডে গত ১৩ এপ্রিল অনুষ্ঠিত হয়েছে কাউন্টি ও করপোরেশন নির্বাচন (Alue- ja kuntavaalit)। জাতীয় পর্যায়ের এই দ্বিস্তরীয় নির্বাচনে ভোটাররা স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক সেবা ও স্থানীয় প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ খাতসমূহে দায়িত্ব পালনের জন্য প্রতিনিধি নির্বাচন করেছেন। নির্বাচনি পরিবেশ ছিল শান্তিপূর্ণ, সুশৃঙ্খল এবং গণতান্ত্রিক চেতনায় পরিপূর্ণ।
২০২৫ সালের এই নির্বাচনে মোট ১৩ জন বাংলাদেশি প্রবাসী বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রার্থী হয়ে অংশ নেন। এটি প্রমাণ করে, ফিনল্যান্ডে বসবাসরত বাংলাদেশি কমিউনিটি এখন শুধু অর্থনৈতিক নয়, রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও সক্রিয় ও সচেতন।
অংশগ্রহণকারী প্রার্থীরা হলেন- হেলসিংকি সিটি থেকে আব্দুল কুদ্দুস খান (ওপেন পার্টি), মজিবুর দফতরি (গ্রিন পার্টি), তাসলিমা জামান (ন্যাশনাল কোয়ালিশন পার্টি)। এস্পো সিটি থেকে মিয়াজ নজরুল ইসলাম (সোশাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি), কিঞ্চিৎ ঋদ্ধিমান (সেন্টার পার্টি), সুবীর তিতোভ (ফিনস পার্টি)।
কেরাভা সিটি থেকে শামসুল আলম (বাম জোটের প্রার্থী হয়ে বিজয়ী হয়েছেন)। পিয়েতারসারি সিটি থেকে রিয়াজ হাওলাদার (সুইডিশ পিপলস পার্টির প্রার্থী হয়ে বিজয়ী হয়েছেন), সৈয়দ মাহমুদুল হাসান (সুইডিশ পিপলস পার্টি)। তাম্পেরে সিটি থেকে এস এম শফিকুল আলম (গ্রিন পার্টি), কোকোলা সিটি থেকে মাসুক করিম (সোশাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি)। লাপ্পেরান্তে সিটি থেকে দিদার হোসেন (ন্যাশনাল কোয়ালিশন পার্টি)।
নির্বাচিত প্রবাসী প্রতিনিধিরা:
তবে সব ছাপিয়ে আলোচনায় ছিল বাংলাদেশ কমিউনিটি। কেরাভা পৌরসভা থেকে শামসুল আলম টানা তৃতীয়বারের মতো কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়ে রেকর্ড গড়েছেন। একইসঙ্গে কাউন্টিতে ডেপুটি কাউন্সিলরও নির্বাচিত হয়েছেন তিনি।
এদিকে প্রথমবারের নির্বাচনেই নজর কাড়েন রিয়াজ হাওলাদার। পিয়েতারসারি মিউনিসিপ্যাল থেকে সুইডিশ পিপলস পার্টির হয়ে পৌর কাউন্সিলর নির্বাচিত হন তিনি।
তাছাড়া, মিয়াজ নজরুল ইসলাম, এসপো সিটি করপোরেশনে ডেপুটি কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছেন।
হেলসিংকি মিউনিসিপ্যাল থেকে ওপেন পার্টির প্রার্থী আব্দুল কুদ্দুস খান সর্বোচ্চ ভোট পেয়েও দলীয় আনুপাতিক হিসেবে পরাজিত হন। এস্পো সিটির
মিয়াজ নজরুল ইসলামও ভালো অবস্থানে থেকেও জয়ী হতে পারেননি। তবে তিনি ডেপুটি কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছেন।
এই বিজয় নিঃসন্দেহে ফিনল্যান্ডে বসবাসরত বাংলাদেশিদের জন্য একটি গর্বের অধ্যায়। অভিবাসী সম্প্রদায়ের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ দেশটির বহুজাতিক সমাজ ব্যবস্থাকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।
মিউনিসিপ্যাল নির্বাচনের সার্বিক চিত্র:
ভোট গণনায় ছিল টানটান উত্তেজনা। শতভাগ গণনা শেষে সর্বোচ্চ ভোট পেয়েছে সোশাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি। তবে আনুপাতিক হারের ভিত্তিতে সর্বোচ্চ আসন পেয়েছে সেন্টার পার্টি। ক্ষমতাসীন ন্যাশনাল কোয়ালিশন পার্টি পিছিয়ে পড়েছে, আর ফিনস পার্টিকে পড়তে হয়েছে বিপাকে।
ফিনল্যান্ডে দল ও প্রার্থী নির্বাচনের পদ্ধতি: আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বে গণতন্ত্রের নিখুঁত চিত্র। ফিনল্যান্ডে স্থানীয় ও আঞ্চলিক নির্বাচনে প্রার্থী নির্বাচন এবং জয়-পরাজয়ের হিসাব হয় এক বিশেষ পদ্ধতিতে, যার নাম আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতি (Proportional Representation System)। এই ব্যবস্থা নিশ্চিত করে প্রতিটি দলের জনপ্রিয়তা অনুযায়ী আসন বণ্টন হয়, এবং নির্বাচনে ভোটারদের সিদ্ধান্ত যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয়।
কীভাবে ভোট হয়?
ভোটাররা সাধারণত সরাসরি একটি দলের তালিকা থেকে একজন নির্দিষ্ট প্রার্থীকে ভোট দেন। অর্থাৎ, একজন ভোটার তার পছন্দের দলের ভেতর থেকেও প্রার্থীর নাম নির্ধারণ করে ভোট প্রদান করেন। ফলে ভোটটি যায় দুই জায়গায়- একদিকে নির্দিষ্ট প্রার্থীর ঝুলিতে, অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট দলের মোট ভোটসংখ্যায় যুক্ত হয়।
কতজন প্রার্থী মনোনয়ন দিতে পারে একটি দল?
প্রতিটি দল সর্বোচ্চ মোট আসনের দেড়গুণ সংখ্যক প্রার্থী মনোনয়ন দিতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, যদি এস্পো সিটি কাউন্সিলে ১০০টি আসন থাকে, তাহলে প্রতিটি দল সর্বোচ্চ ১৫০ জন প্রার্থী মনোনয়ন দিতে পারে।
ভোটের ভিত্তিতে আসন বণ্টন
নির্বাচনের ফলাফলে প্রতিটি দলের মোট প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে আসন সংখ্যা নির্ধারিত হয়। যেমন, কোনো সিটি করপোরেশনের ১০০টি আসনের মধ্যে যদি সোশাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি (SDP) পায় ৩১ শতাংশ ভোট, তাহলে দলটি পাবে ৩১টি আসন। একইভাবে, ন্যাশনাল কোয়ালিশন পার্টি (Kokoomus) যদি পায় ১৮ শতাংশ ভোট, তবে তাদের ভাগে যাবে ১৮টি আসন। এভাবেই গ্রিন পার্টি, সেন্টার পার্টি, ফিনস পার্টিসহ অন্যান্য দল নিজেদের ভোটের অনুপাতে আসন লাভ করে।
প্রার্থী নির্বাচনের চূড়ান্ত ধাপ
একবার যখন কোনো দলের জন্য নির্দিষ্টসংখ্যক আসন নির্ধারিত হয়, তখন সেই দলের প্রার্থীদের মধ্যে যারা ব্যক্তিগতভাবে সবচেয়ে বেশি ভোট পেয়েছেন, তারাই কাউন্সিলর নির্বাচিত হন।
রিজার্ভড প্রার্থীরা কারা?
প্রার্থী তালিকায় অনেকের নামের পাশে দেখা যায় ‘রিজার্ভড প্রার্থী’। এর অর্থ, তারা নির্বাচনে সরাসরি জয়ী হননি। তবে নির্বাচিত কাউন্সিলর অনুপস্থিত থাকলে, দল চাইলে তার জায়গায় এসব প্রতিস্থাপক প্রার্থী দায়িত্ব পালন করতে পারেন। তারা মূলত ‘প্রক্সি’ বা বিকল্প হিসেবে বিবেচিত।
গণতান্ত্রিক ভারসাম্য রক্ষার মডেল
এই পুরো ব্যবস্থাটি নিশ্চিত করে যে, জনমত যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয় এবং স্থানীয় প্রশাসনে দলগুলোর প্রতিনিধিত্ব নিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক ভিত্তিতে স্থাপিত হয়। এটি ফিনল্যান্ডের রাজনৈতিক পরিপক্বতা ও অংশগ্রহণমূলক শাসনব্যবস্থার একটি সফল দৃষ্টান্ত।
মেহেদী/অমিয়/