একটি অলস শনিবারের সন্ধ্যা। আকাশে মেঘের আস্তরণ, আর টরন্টোর ব্যস্ত ডাউনটাউন যেন একটু থেমে শ্বাস নিচ্ছে—নিজেকে নতুন করে সাজানোর আগে একটুখানি বিরতি। আমি আর আমার বন্ধু তানভীর হোসেন গাড়ি পার্ক করে সেন্ট জোসেফ স্ট্রিট ধরে হাঁটতে শুরু করলাম। গন্তব্য, কানাডিয়ান মিউজিক সেন্টার। কিন্তু গন্তব্যের আগে যে শহর নিজেই এক শিল্পকর্ম, সেটাকে উপেক্ষা করা যায় না। পুরোনো ইটের দেয়াল, নিঃশব্দ গাছের সারি, হালকা বাতাসে ভেসে থাকা এক ধরনের রোমান্টিক বিষণ্নতা-সব মিলিয়ে সন্ধ্যাটা যেন নিজেই এক কবিতা হয়ে উঠেছিল।
গত ২৫ এপ্রিল অবশেষে আমরা পৌঁছে গেলাম সেই কাঙ্ক্ষিত স্থানে। কানাডিয়ান মিউজিক সেন্টারের এই ভেন্যুটি নিজেই এক ইতিহাসের অংশ। সঙ্গীত সংরক্ষণ, গবেষণা এবং নতুন সৃষ্টিকে সামনে আনার জন্য এই প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে যাচ্ছে। এই জায়গাটি শুধু একটি ভবন নয়, এটি কানাডার সংগীতচর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। এখানে নতুন সুরকারদের কাজ সংরক্ষণ করা হয়, গবেষণা হয়, পরিবেশনা হয়-এক কথায়, এটি সৃষ্টিশীলতার একটি আর্কাইভ এবং প্ল্যাটফর্ম। সেই ঐতিহ্যের ভেতরেই এই আয়োজন যেন এক নতুন অধ্যায় যোগ করল-যেখানে সাহিত্য আর সঙ্গীত একসাথে এসে দাঁড়াল, আর ভাষার সীমারেখা ভেঙে দিল।
দরোজা পেরোতেই আমাদের স্বাগত জানালেন চির হাস্যোজ্জ্বল সুব্রত কুমার দাস, সময় তখন ঠিক পাঁচটা পঞ্চান্ন। এই শহরে বাঙালি সংশ্লিষ্টতায় সুব্রত কুমার দাসের উপস্থিতি যেন এক ধরনের নিশ্চয়তা-এই আয়োজন শুধু একটি অনুষ্ঠান নয়, এটি এক গভীর সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধনের মুহূর্ত।
ভিতরে ঢুকেই বুঝলাম-এটা আর পাঁচটা অনুষ্ঠানের মতো নয়। এখানে এক ধরনের উৎসবমুখরতা, কিন্তু তা কোলাহল নয়-একটি বুদ্ধিবৃত্তিক উত্তেজনা। লেখক ও অনুবাদক তাসমিনা খান তখন ব্যস্ত এনআরবি টেলিভিশনের জন্য সাক্ষাৎকার নিতে, আর দর্শকেরা নিজ নিজ আসনে অপেক্ষা করছেন। মঞ্চের এক কোণে শিল্পীরা নিজেদের যন্ত্র ঠিক করছেন, সুর মিলাচ্ছেন-একটি অদৃশ্য সুরের প্রস্তুতি যেন চারপাশে ভাসছে।
তানভীর, তার স্বভাবমতো, চুপচাপ এক কোণে গিয়ে বসে পড়লেন। আর আমি-আমি তো সেই মানুষ, যে নীরবতা ভাঙতে ভালোবাসে। চারপাশে পরিচিত মুখ-কথাসাহিত্যিক জাকারিয়া মোহাম্মদ ময়ীন উদ্দিন, প্রিয় মানুষ নীলিমা দত্ত, সৈয়দা রুখসানা বেগম, শিল্পী ও লেখক সৈয়দ ইকবাল, শ্রেয়সী বোসদত্ত, সুজিত কুসুম পাল, ডক্টর জান্নাতুল নাঈম, কবি জামিল বিন খলিল, আবৃত্তিকার ফ্লোরা নাসরিন ইভা-আরও কত পরিচিত মানুষ, কত গল্প, কত সম্পর্ক। এই সম্প্রদায় আমাদের বেঁধে রাখে এক অদৃশ্য সুতায়-ভাষা, সাহিত্য, আর স্মৃতির বন্ধনে।
এই সুযোগে এই অনুষ্ঠানের সেনাপ্রধান জর্জ এলিয়ট ক্লার্ক সম্পর্কে দুটো কথা বলে ফেলি। কারণ এই আয়োজনের পেছনে যে মানুষটি দাঁড়িয়ে আছেন-জর্জ এলিয়ট ক্লার্ক। তিনি শুধুই একজন কবি নন, তিনি এক সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধনকার। কানাডার সাহিত্যজগতে তার অবস্থান এমন, যেখানে ইতিহাস, রাজনীতি, জাতিগত স্মৃতি এবং সৃজনশীলতা একসাথে মিশে যায়। তিনি কানাডার পার্লামেন্টারি পোয়েট লরিয়েট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তার লেখায় আফ্রিকান-কানাডিয়ান ইতিহাস, দাসপ্রথার উত্তরাধিকার, এবং পরিচয়ের জটিলতা বারবার ফিরে আসে।
কিন্তু এই সন্ধ্যায় আমি তাকে আরেকভাবে দেখলাম-একজন সংগঠক হিসেবে, একজন স্বপ্নদ্রষ্টা হিসেবে। বহু বছর ধরে তিনি কবিতাকে গানে রূপ দেওয়ার যে প্রকল্পটি চালিয়ে আসছেন, সেটি কেবল শিল্পের সংমিশ্রণ নয়, এটি সংস্কৃতির এক ধরনের পুনর্গঠন। কবিতার ভাষাকে গানের সুরে, আবার সেই সুর নতুন কণ্ঠে-এই বহুমাত্রিক যাত্রা আমাদের ভাবায়, আমাদের প্রশ্ন করে, আমাদের একত্রিত করে।
এই প্রকল্প ইতোমধ্যেই বহু সংস্করণের মধ্য দিয়ে গেছে-এটি ছিল বাইশতম আয়োজন। এতদিন এটি সীমাবদ্ধ ছিল শুধু ইংরেজি ভাষার মধ্যেই। কিন্তু এবারই প্রথম অন্য একটি ভাষাকে অন্তর্ভুক্ত করা। আর আমাদের আনন্দ হলো সেই ভাষাটির নাম বাংলা-এটি কেবল একটি নতুন অধ্যায় নয়, এটি এক ধরনের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত। কারণ ভাষা মানে শুধু শব্দ নয়-ভাষা মানে স্মৃতি, ইতিহাস, অনুভব এবং পরিচয়।
এই সিদ্ধান্তের পেছনে যে মানুষটির অবদান অনস্বীকার্য, তিনি সুব্রত কুমার দাস। তিনি শুধু একজন কবি নন-তিনি একজন সেতুবন্ধনকারী, যিনি দীর্ঘদিন ধরে কানাডায় বাংলা সাহিত্যকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য কাজ করে যাচ্ছেন। তার লেখালেখি, গবেষণা, এবং সংগঠক হিসেবে ভূমিকা-সব মিলিয়ে তিনি একটি সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অংশ।
বাংলাদেশে জন্ম, পরে কানাডায় অভিবাসন-এই দুই ভৌগোলিক বাস্তবতার ভেতর দিয়ে তিনি যে সাহিত্যচর্চা গড়ে তুলেছেন, তা শুধু ব্যক্তিগত নয়, এটি প্রজন্মের অভিজ্ঞতা। কানাডায় বসে বাংলা ভাষায় সাহিত্যচর্চা, লেখকদের একত্রিত করা, অনুবাদের মাধ্যমে দুই ভাষার মধ্যে সেতু তৈরি করা-এসবই তার দীর্ঘদিনের কাজ। এই প্রকল্পে তার অংশগ্রহণ যেন স্বাভাবিক পরিণতি-যেখানে তিনি শুধু সহযোগী নন, তিনি এক সহ-নির্মাতা।
আমি যখন তাকে সেই সন্ধ্যায় দরজায় দাড়িয়ে হাসিমুখে স্বাগত জানাতে দেখলাম, তখন বুঝেছিলাম-এই আয়োজন তার জন্য কেবল একটি অনুষ্ঠান নয়, এটি তার বহুদিনের স্বপ্নের বাস্তব রূপ।
কিছুক্ষণ পরই যেন ঘরের আলো বদলে গেল। প্রবেশ করলেন জর্জ এলিয়ট ক্লার্ক—এক উষ্ণ, উজ্জ্বল হাসি নিয়ে। তার উপস্থিতি শুধু একজন কবির নয়, একজন দৃষ্টিভঙ্গির। তিনি যেন সঙ্গে করে নিয়ে এলেন এক অদ্ভুত শক্তি-যা মুহূর্তেই পুরো পরিবেশকে প্রাণবন্ত করে তুলল। তার পাশে সুব্রত কুমার দাস- দু’জনের এই যুগলবন্দি যেন এই সন্ধ্যার মূল সুর।
অনুষ্ঠান শুরু হলো। প্রথমেই জর্জের উচ্ছ্বসিত বক্তৃতা-একটি ভাষা, যা শুধু কথা নয়, অনুভব। তারপর সুব্রতর শান্ত, স্থির, গভীর উচ্চারণ-যেখানে প্রতিটি শব্দ যেন ভাবনার ভিত গড়ে তোলে।
এই আয়োজনের পেছনের গল্পটাও কম বিস্ময়কর নয়। পাঁচজন কানাডীয় কবির ইংরেজি কবিতাকে সুরে বাঁধা এবং সেই সঙ্গে তাদের বাংলা অনুবাদকে গান হিসেবে উপস্থাপন-এ যেন সাহিত্য ও সংগীতের এক অনন্য মিলন। বহু বছর ধরে জর্জ এই প্রকল্প চালিয়ে আসছেন, কিন্তু এই প্রথমবারের মতো বাংলা ভাষা এতে যুক্ত হলো। আর এই সংযোজনের পেছনে রয়েছে এক দশকের বিশ্বাস, সম্পর্ক, এবং সাংস্কৃতিক আকর্ষণ।
কানাডার বহুসাংস্কৃতিক পরিসরে বাংলা ভাষার এই অন্তর্ভুক্তি শুধু একটি ভাষার জয় নয়-এটি একটি পরিচয়ের স্বীকৃতি।
অনুষ্ঠানের মূল পর্বে প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গে স্পষ্ট হয়ে উঠল-এটি কেবল একটি সাংস্কৃতিক আয়োজন নয়, এটি এক ধরনের সৃজনশীল বিপ্লব। পাঁচজন কবি-আয়েষা চ্যাটার্জী, জর্জ এলিয়ট ক্লার্ক, সুব্রত কুমার দাস, লুইস বার্নিস হাফ এবং জিয়োভানা রিচিও—তাদের কবিতা যেন এই সন্ধ্যায় নতুন জীবন পেল। শব্দ আর সুরের মিলনে তারা এক নতুন রূপ ধারণ করল, যেখানে কবিতা আর গান-দুই ভিন্ন জগত-একটি অভিন্ন অনুভূতিতে এসে মিশল।
সাধারণভাবে একটি কবিতার দুইটি জীবন। প্রথমটি তার মূল ভাষায়, আর দ্বিতীয়টি তার সুরারোপে। সেভাবে করা হয়েছে পাঁচ কবির পাঁচটি ইংরেজি কবিতা। কিন্তু এই প্রকল্পের বিশেষত্ব এই যে, এখানে প্রথমে এসেছে কবিতার বাঙলায়ন। তারপর সেই অনুবাদে দেওয়া হয়েছে সুর। একের পর এক কবিকে মঞ্চে উপস্থাপন করা হয়েছে। কবি প্রথমে তার পছন্দের ভিন্ন একটি কবিতা পাঠ করেছেন। এরপর তিনি উচ্চারণ করেছেন সেই ইংরেজি কবিতাটি যেটি গানে রূপ দেওয়া হয়েছে। তার পাঠের পর সেটি গেয়েছেন শিল্পী। এরপর কবি তৃতীয় কবিতাটি উচ্চারণ করেছেন। সেটির বাংলা অনুবাদ পাঠ করা হয়েছে। এরপর শিল্পী সেই বাংলা অনুবাদ কবিতাটির গান পরিবেশন করেছেন। যেন একই নদী-কখনো ইংরেজি স্রোতে, কখনো বাংলার ঢেউয়ে।
অনুষ্ঠানের সুরারোপের দায়িত্বে ছিলেন পল্লবী মজুমদার-সাস্কাটুনে বসবাসকারী এক অসাধারণ বাঙালি এই সুরকার। নয়টি কবিতায় তার সুর, আর একটি কবিতায় সুর দিয়েছেন গাগেনহেম পুরস্কারপ্রাপ্ত জেমস রলফ। তাঁদের সুরে কবিতাগুলো শুধু উচ্চারিত হয়নি—তারা অনুভূত হয়েছে, দেহ পেয়েছে, স্পন্দন পেয়েছে।
যখন মঞ্চে এলেন শিল্পী শমিত বড়ুয়া, তার কণ্ঠে বাংলা অনুবাদগুলো যেন এক নতুন মাত্রা পেল। তার গায়কি ছিল স্থির, সংযত, অথচ গভীর-যেন প্রতিটি শব্দ তিনি বুকে ধারণ করে আমাদের সামনে তুলে ধরছেন। আর তারপর-ছোট্ট শ্রেয়া বড়ুয়া। শ্রেয়া ইংরেজি গানগুলো পরিবেশন করেছেন।
মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে যখন শ্রেয়া দাঁড়াল, পুরো হল যেন এক মুহূর্তে নিঃশব্দ হয়ে গেল। তার কণ্ঠে ছিল এক অদ্ভুত স্বচ্ছতা, এক নির্ভীক সৌন্দর্য। এত অল্প বয়সে এমন পরিপক্বতা—শ্রোতারা যেন মুগ্ধ হয়ে গেল। আমি নিজেও কিছুক্ষণের জন্য ভুলে গেলাম-আমি কোথায় আছি। শুধু শুনছিলাম।
পিয়ানোতে সঙ্গত করছিলেন টমসন হন—তার আঙুলের স্পর্শে প্রতিটি সুর যেন জীবন্ত হয়ে উঠছিল। কখনো কোমল, কখনো তীব্র-তার সঙ্গত পুরো পরিবেশনাকে একটি পূর্ণতা দিয়েছে।
এই সন্ধ্যার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ ছিলেন অনুবাদকরা। তাসমিনা খান, সুব্রত কুমার দাস নিজে, এবং ফারজানা নাজ শম্পা—তাঁদের অনুবাদ ছাড়া এই সেতুবন্ধন সম্ভব হতো না। একটি ভাষার অনুভূতিকে আরেকটি ভাষায় একই শক্তিতে তুলে ধরা—এটি সহজ কাজ নয়। কিন্তু তারা তা করেছেন নিপুণভাবে, সংবেদনশীলতার সঙ্গে।
এই আয়োজনের মাধ্যমে আমরা প্রত্যক্ষ করলাম-কীভাবে একটি কবিতা শুধু পাঠের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং সুরের মাধ্যমে তা ছড়িয়ে পড়ে, মানুষের ভেতরে ঢুকে যায়, নতুন করে জন্ম নেয়। আর তখনই মনে হলো—এটি শুধু একটি অনুষ্ঠান নয়, এটি ইতিহাসের একটি মুহূর্ত।
এই পুরো আয়োজনের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন জর্জ এলিয়ট ক্লার্ক। তার কণ্ঠ, তার উপস্থাপনা, তার উপস্থিতি- সবকিছুতেই ছিল এক অদ্ভুত শক্তি। তিনি শুধু অনুষ্ঠান পরিচালনা করেননি, তিনি যেন প্রতিটি মুহূর্তকে জীবন্ত করে তুলছিলেন। তার প্রতিটি শব্দে ছিল উত্তেজনা, প্রতিটি বিরতিতে ছিল গভীরতা। তিনি প্রমাণ করলেন-একজন কবি শুধু লেখেন না, তিনি একটি অভিজ্ঞতা তৈরি করেন।
আর তার পাশে সুব্রত কুমার দাস-যিনি এই আয়োজনের সহ-পরিকল্পনাকারী হিসেবে এক অসাধারণ ভূমিকা পালন করেছেন। তার উপস্থিতি ছিল মাটির মতো-নির্ভরযোগ্য, স্থির, অথচ গভীর। তিনি যেন আমাদের সবাইকে একত্রিত করলেন-একটি ভাষা, একটি সংস্কৃতি, একটি অনুভূতির ভেতর।
এবার, প্রথমবারের মতো বাংলা যুক্ত হলো। এটি শুধু একটি ভাষার সংযোজন নয়-এটি একটি স্বীকৃতি, একটি সম্মান। আমি একজন বাঙালি হিসেবে সেই মুহূর্তে এক অদ্ভুত গর্ব অনুভব করছিলাম। মনে হচ্ছিল-আমাদের ভাষা, আমাদের সংস্কৃতি, আমাদের অনুভূতি-সবকিছু আজ একটি আন্তর্জাতিক মঞ্চে জায়গা করে নিয়েছে। এটি শুধু একটি ব্যক্তিগত অনুভূতি নয়, এটি একটি সামষ্টিক আনন্দ।
অনুষ্ঠানের শেষভাগে এসে আমি বুঝতে পারছিলাম-এই সন্ধ্যা শুধু দেখা বা শোনা নয়, এটি আমার ভেতরে কোথাও স্থায়ী হয়ে গেছে। যেন এক নীরব ঢেউ, যা ধীরে ধীরে ভেতরের স্তরগুলোকে নাড়িয়ে দিচ্ছে। যখন আমরা ধীরে ধীরে বের হয়ে আসছিলাম, তখনও চারপাশে সেই সুর, সেই শব্দ, সেই অনুভূতি ভাসছিল। তানভীর চুপচাপ হাঁটছিল, আর আমি-আমি তখনও কথা বলে যাচ্ছিলাম, যেন এই অভিজ্ঞতাকে ধরে রাখতে চাইছি, শব্দে বেঁধে ফেলতে চাইছি।
শেষবারের মতো পেছনে তাকালাম। আলো জ্বলছে, মানুষজন এখনও কথা বলছে, কেউ হাসছে, কেউ ভাবছে। মনে হলো-এই সন্ধ্যা শেষ হয়নি, এটি শুধু ছড়িয়ে পড়েছে।
টরন্টোর পূর্বাঞ্চলে, বিশেষ করে স্কারবরো এবং ইস্ট ইয়র্ক এলাকায়, বিপুলসংখ্যক বাঙালি বাস করেন। তাদের ভাষা, তাদের সংস্কৃতি, তাদের সাহিত্য—সবকিছুই এই শহরের বহুসাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ। কিন্তু সেই পরিচয়কে মূলধারার এমন একটি মঞ্চে তুলে ধরা-এটি সহজ বিষয় নয়। এই আয়োজন সেই কাজটিই করেছে। আর তখনই মনে হয়-এই সন্ধ্যা শুধুই একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ছিল না। এটি ছিল একটি ঘোষণা-যে আমরা আছি, আমরা সৃষ্টি করি, আমরা যুক্ত হই, এবং আমরা বিশ্বমঞ্চে নিজেদের ভাষাকে প্রতিষ্ঠা করতে পারি।
জর্জ এলিয়ট ক্লার্ক তার দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে, সুব্রত কুমার দাস তার সাংস্কৃতিক শক্তি দিয়ে, এবং কানাডিয়ান মিউজিক সেন্টার তার ঐতিহাসিক পরিসর দিয়ে-একসাথে মিলে যে মুহূর্তটি তৈরি করলেন, সেটি নিঃসন্দেহে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
শেষ পর্যন্ত এসে মনে হয়—
কিছু আয়োজন থাকে, যা শেষ হয়ে যায়।
আর কিছু আয়োজন থাকে, যা শেষ হওয়ার পরও আমাদের ভেতরে চলতে থাকে।
এই সন্ধ্যা—ঠিক তেমনই একটি।