মৌলভীবাজারের রাজনগরে ভালোবাসার এক অনন্য আয়োজনে মুখর হয়ে ওঠে চারদিক। জাঁকজমকপূর্ণ পরিবেশে সম্পন্ন হলো এক বাংলাদেশি যুবক ও চীনা তরুণীর বিয়ে। ভৌগোলিক সীমানা পেরিয়ে যেখানে মিলেছে দুই দেশ, দুই সংস্কৃতি এক বন্ধনে।
রবিবার (২২ ফেব্রুয়ারি) রাতে কামারচাক ইউনিয়নের তারাপাশা বিষ্ণুপদ ধামে হিন্দু ধর্মীয় রীতি মেনে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন এ যুগল।
বর চীনপ্রবাসী কামারচাক ইউনিয়নের টিকরপাড়ার সেন বাড়ির প্রয়াত স্বপন কুমার সেন ও শিল্পী রানি সেনের ছেলে সুকান্ত সেন এবং কনে চীনের সাংহাইয়ের বাসিন্দা ক্রিস হোয়ে।
জানা গেছে, গত বৃহস্পতিবার ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে হেলিকপ্টারে করে কনে ক্রিস হোয়েকে নিজ গ্রামে নিয়ে আসেন সুকান্ত। আকাশপথে ভিনদেশি কনের আগমনের খবরে এলাকায় তৈরি হয় উৎসবের আমেজ। কৌতূহলী মানুষ, আত্মীয়স্বজন ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের ভিড়ে মুখর হয়ে ওঠে টিকরপাড়া গ্রাম। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়ে এ বিয়ের আনন্দঘন মুহূর্ত।
রবিবার বিয়ের দিন কনে ক্রিস হোয়েকে লাল বেনারসি শাড়িতে সাজিয়ে বিয়ের মণ্ডপে আনা হয়। বিষ্ণুপদ ধামে শতশত মানুষের উপস্থিতিতে ধর্মীয় শাস্ত্রমতে সাত পাকে বাঁধা পড়েন বর ও কনে। পরে চীনা কনের সিঁথিতে সিঁদুর পরিয়ে দেন বর সুকান্ত। বিয়ের অনুষ্ঠানে চীন থেকে আসা ক্রিসের মা, বাবা ও চাচা উপস্থিত ছিলেন।
স্থানীয়দের ভাষ্য, চীনা কনের সঙ্গে এলাকার ছেলের বিয়ে ঘিরে পুরো গ্রামে ছিল উৎসবের আমেজ। হেলিকপ্টারে কনের আগমনের পর থেকেই এলাকায় শুরু হয় আলোচনা ও কৌতূহল। গত কয়েকদিন ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও নবদম্পতিকে ঘিরে চলছে শুভেচ্ছার বন্যা। একনজর দেখতে স্থানীয়দের আগ্রহ ছিল চোখে পড়ার মতো।
সুকান্ত সেনের পরিবারের সদস্যরা জানান, সুকান্ত বাংলাদেশ মেরিটাইম ইউনিভার্সিটি থেকে স্নাতকোত্তর শেষ করে প্রায় আট বছর আগে চীনে যান। পরে সাংহাই মেরিটাইম ইউনিভার্সিটি থেকে আরেকটি স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। কিছুদিন চাকরি করার পর বর্তমানে আমদানি-রপ্তানির ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত আছেন।
সুকান্ত সেন জানান, ব্যবসার সূত্রেই ক্রিস হোয়ের সঙ্গে পরিচয়। দীর্ঘ তিন বছরের বেশি সময়ের পরিচয়ের পর দুই পরিবারকে জানানো হয় তাদের সম্পর্কের কথা। উভয় পরিবার সম্মতি দিলে ২০২৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি চীনে তাদের বিয়ে সম্পন্ন হয়। কনে ক্রিস হোয়ে চীনের সাংহাইয়ের বাসিন্দা। তিনি গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন। তার আগ্রহ ও সম্মতিতেই হিন্দুধর্মীয় রীতিতে বাংলাদেশে আনুষ্ঠানিকতার আয়োজন করা হয়েছে।
সুকান্ত সেন বলেন, ‘দেশের বাইরে বিয়ে করার আলাদা কোনো পরিকল্পনা ছিল না। হয়তো ভাগ্যই আমাদের এক করেছে। সব মিলিয়ে আমরা দুজনই খুব খুশি।’
ক্রিস হোয়ে বলেন, ‘এখানকার মানুষ খুবই বন্ধুভাবাপন্ন। সবাই উষ্ণ অভ্যর্থনা দিয়েছেন। পুরো আয়োজন আমার জন্য খুব উপভোগ্য।’
সুকান্তের বোন ঐশী সেন বলেন, ‘ক্রিস খুবই আন্তরিক। অল্প সময়েই আমাদের আপন করে নিয়েছে। সে নিজেই চেয়েছে প্রথা মেনে বিয়ে হোক।’
বরের চাচাতো (জ্যাঠাতো) ভাই আশিস কুমার সেনের ভাষ্য, আমরা সব সময় ব্যক্তিগত পছন্দকে সম্মান করি। যে যার ইচ্ছামতো জীবনসঙ্গী বেছে নিয়ে সুখে থাকুক এটাই কামনা।
কবি ও শিক্ষক জাহাঙ্গীর জয়েস বলেন, ‘ভাষা আলাদা, সংস্কৃতি ভিন্ন, তবুও ভালোবাসার ভাষা এক। রাজনগরের এই বিয়ে যেন প্রমাণ করল, হৃদয়ের টানে দূরত্ব কোনো বাধা নয়। ভালোবাসাই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বড় সেতুবন্ধন।’
তারাপাশা বিষ্ণুপদ ধামের সাধারণ সম্পাদক রুদ্রজিত দে বলেন, ‘বিষ্ণুপদ ধামে শতশত মানুষের উপস্থিতিতে ধর্মীয় শাস্ত্রমতে সাত পাকে বাঁধা পড়েন বর ও কনে। পরে চীনা কনের সিঁথিতে সিঁদুর পরিয়ে দেন বর।’
পুলক/রিফাত/