প্রখ্যাত নজরুল সংগীতশিল্পী ও গবেষক সোমঋতা মল্লিক। তিনি ছায়ানট কলকাতার সভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন। নজরুল চর্চা কেন্দ্র ছায়ানট কলকাতায় আগামী ২৩ মে থেকে আয়োজন করা হয়েছে কাজী নজরুল ইসলামের ওপর সাত দিনব্যাপী বিশেষ প্রদর্শনী। এই আয়োজন ও অন্যান্য প্রসঙ্গে কলকাতা থেকে মুঠোফোনে খবরের কাগজের সঙ্গে কথা বলেছেন সোমঋতা মল্লিক।
নজরুলের ওপর সাত দিনব্যাপী যে প্রদর্শনীর আয়োজন করতে যাচ্ছেন এ সম্পর্কে জানতে চাই।
আমাদের প্রাণের কবি কাজী নজরুল ইসলাম জীবনের বেশির ভাগ সময় অতিবাহিত করেছেন বাংলার সাহিত্য-সংস্কৃতির পীঠস্থান কলকাতায়। এই শহরে ছড়িয়ে রয়েছে তার বহু স্মৃতি। নজরুলের ১২৭তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আমার পরিকল্পনা ও পরিচালনায় সাত দিনব্যাপী ‘আমারে দেব না ভুলিতে’ শীর্ষক নজরুলবিষয়ক প্রদর্শনীর আয়োজন করছে নজরুল চর্চাকেন্দ্র ছায়ানট (কলকাতা)।
যোগেন চৌধুরী সেন্টার ফর আর্টসের সুনয়নী চিত্রশালা ও চিত্তপ্রসাদ গ্যালারিতে আগামী ২৩ মে বিকেল ৫টা ৩০ মিনিটে প্রদর্শনীর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন। প্রদর্শনী চলবে ৩০ মে পর্যন্ত। প্রতিদিন দুপুর ২টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত নজরুলপ্রেমীরা উপভোগ করবেন নজরুল-সংক্রান্ত বিরল সামগ্রী দিয়ে সাজানো এই প্রদর্শনী।
এই আয়োজনে কী কী থাকছে?
দুই বাংলার বিশিষ্ট সংগ্রাহকদের সংগ্রহ দিয়ে অতি যত্নে সাজানো হচ্ছে এই প্রদর্শনী। কলকাতার বিশিষ্ট অটোগ্রাফ সংগ্রাহক মলয় সরকারের সংগ্রহ থেকে প্রদর্শিত হবে কাজী নজরুল ইসলামের স্বাক্ষর, যা এই প্রদর্শনীর বিশেষ আকর্ষণ। বাংলাদেশের বিশিষ্ট আলোকচিত্রী সাহাদাত পারভেভের সংগ্রহ থেকে থাকছে কাজী নজরুল ইসলামের বেশ কিছু দুর্লভ আলোকচিত্র। গৌতম বন্দ্যোপাধ্যায় (বিশিষ্ট কৌতুক অভিনেতা ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের পুত্র), স্বাগত গুপ্ত (নজরুলের হাসির গানের বিশিষ্ট শিল্পী সারদা গুপ্তর পৌত্র), আশিক মিঞার সংগ্রহ থেকে দেখা যাবে নজরুল-সংক্রান্ত বেশকিছু দুর্লভ ছবি।
বিশিষ্ট নজরুল-সংগীতশিল্পী সত্য চৌধুরীর ভ্রাতুষ্পুত্র পরমানন্দ চৌধুরীর সংগ্রহ থেকে কবির স্বকণ্ঠে গান ও কবিতার গ্রামোফোন রেকর্ডও শোনানো হবে। সেই সঙ্গে ঈশিতা বসু রায়ের সংগ্রহ থেকে প্রণম্য শিল্পীদের কণ্ঠে নজরুল-সংগীত ও কবিতার বেশ কিছু দুর্লভ গ্রামোফোন রেকর্ড ও ক্যাসেট প্রদর্শিত হবে। শৌভিক রায়ের সংগ্রহ থেকে দেখা যাবে ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তানে নজরুলের ওপর নির্মিত ডাকটিকিট। শেখর দে প্রদর্শনীতে সংযুক্ত করবেন ‘বিদ্রোহী’ কবিতার ৯০ বছর উপলক্ষে বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত বিশেষ মুদ্রা।
বাংলাদেশের বিশিষ্ট সংগ্রাহক সাকিল হকের তৈরি বিশেষ দেশলাই বাক্স প্রদর্শনীতে অন্য মাত্রা যোগ করবে। ফাল্গুনী দত্ত রায়ের সংগ্রহ থেকে থাকছে বেশকিছু দুর্লভ সামগ্রী–নজরুলের অগ্নিবীণা কাব্যগ্রন্থের দ্বিতীয় সংস্করণ, বেতার জগৎ-এ নজরুলের বিশেষ সংখ্যা, ডাকটিকিটসহ আরও অনেক কিছু। বিদ্যাপতি, সাপুড়ে, গোরা, চৌরঙ্গীসহ বেশকিছু চলচ্চিত্রের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন নজরুল। ফাল্গুনী দত্ত রায়ের সংগ্রহ থেকে সেই সব চলচ্চিত্রের বুকলেটস প্রদর্শনীতে থাকবে।
অপ্রতিম বসুর সংগ্রহ থেকে থাকবে নজরুলের ‘চোখের চাতক’ বইয়ের প্রথম সংস্করণসহ বেশকিছু দুষ্প্রাপ্য সামগ্রী। ওয়াসিম কাপুর, বাপ্পা ভৌমিক, সুব্রত কর, রাসেল রহমান শিমুলসহ ভারত ও বাংলাদেশের বিশিষ্ট চিত্রশিল্পীদের আঁকা নজরুলের প্রতিকৃতি প্রদর্শনীতে দেখা যাবে। কফি দিয়ে নজরুলের ছবি আঁকবেন কফিম্যান পার্থ মুখার্জী। এছাড়া প্রতিদিন গ্যালারিতে ‘আরশি কলকাতা’-এর পক্ষ থেকে চিত্রশিল্পীরা সুমিত গুহর পরিচালনায় লাইভ পেইন্টিং করবেন, যা নজরুলপ্রেমীদের কাছে উপরি পাওনা। বিশিষ্ট নজরুল গবেষক এমদাদুল হক নূরের সংগ্রহ থেকে ‘বিদ্রোহী’ কবিতার শতবর্ষ উপলক্ষে দুই বাংলা থেকে প্রকাশিত ২১টি বই প্রদর্শনীতে স্থান পাবে।
আমার ব্যক্তিগত সংগ্রহ থেকে থাকবে বেশকিছু পুরোনো, দুষ্প্রাপ্য পত্রিকার নজরুল-সংখ্যা, গ্রামোফোন রেকর্ড, ডাকটিকিট। কবির প্রয়াণের পরের দিনের (৩০ আগস্ট, ১৯৭৬) যুগান্তর পত্রিকাসহ বেশকিছু কবির খবর-সংক্রান্ত পত্রিকাও দেখা যাবে। ভারতবর্ষে নজরুল-স্মৃতিবিজড়িত জায়গাগুলো সম্পর্কে নজরুলপ্রেমীদের অবগত করার উদ্দেশে দীর্ঘ ১৮ বছর ধরে বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে ছায়ানট। তারও কিছু ঝলক থাকবে এই প্রদর্শনীতে।
কলকাতায় কবিগুরু রবীন্দ্রনাথকে বেশি চর্চা হয় বলে আমরা জানি। সেখানে রবীন্দ্রনাথের পরিবর্তে আপনি নজরুলকে নিয়ে কাজ করছেন। এক্ষেত্রে আপনি কোনো চাপ অনুভব করেন কি না?
সেই অর্থে চাপ অনুভব করি না। আমি আমার মনের আনন্দে ১৮ বছর ধরে ছায়ানটের (কলকাতা) সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে নজরুল চর্চা করছি। আমরা স্বাধীনভাবেই আমাদের কার্যক্রম পরিচালনা করি। বর্তমানে সুস্থ সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার লড়াই সবার, শুধু নজরুলকে নিয়ে কাজ করার জন্য বাড়তি কোনো চাপ অনুভব করি না।
যেখানেই নজরুলের পদচিহ্ন পড়েছে, সেখানেই আপনি ছুটে যান এর পেছনে কোনো বিশেষ কারণ আছে কি?
নজরুল-সংগীত শিল্পী হিসেবে নজরুল-সংগীতের বিপুল ভাণ্ডার আমাকে যেমন বিস্মিত করে, পাশাপাশি সামগ্রিকভাবে নজরুল চর্চায় আমি বিশ্বাসী। সেই বিশ্বাস থেকেই আমার ছুটে চলা। প্রতিদিন নজরুলকে আমি নতুনভাবে আবিষ্কার করি আর মুগ্ধ হই।
প্রায় দুই দশক ধরে নজরুল চর্চা করছেন। দীর্ঘ এ যাত্রায় আপনার অর্জন কতটুকু?
ব্যক্তিগত অর্জন সম্পর্কে আমি কিছুই বলতে চাই না। কিন্তু কলকাতার বুকে বেশ কয়েকজন নজরুলপ্রেমীকে একত্রিত করতে পেরেছি যাদের পূর্ণ সহযোগিতায় ছায়ানট দীর্ঘ ১৮ বছর অতিক্রম করেছে। এই পথচলা সহজ নয়, কিন্তু নজরুলপ্রেমীদের ঐকান্তিক আগ্রহে আমার স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয়েছে। নজরুলের সৃষ্টি ও জীবনদর্শনকে আশ্রয় করে প্রতিদিন প্রকৃত মানুষ হওয়ার চেষ্টা করি।
আপনি ছায়ানট কলকাতার সভাপতি আবার একজন নজরুল গবেষক ও শিল্পী। এতগুলো কাজ একসঙ্গে কীভাবে সমন্বয় করেন?
সবকিছু সব সময় সঠিকভাবে করতে পারি, এমন নয়। কিন্তু প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত নজরুল-চর্চায় ডুবে থাকি।
নজরুলের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ ও সখ্য কেমন?
ভালো। নজরুলের কনিষ্ঠ পুত্রবধূ শ্রীমতী কল্যাণী কাজীর সঙ্গে ছায়ানটের আত্মিক সম্পর্ক ছিল। তিনি ছিলেন আমাদের অভিভাবক। আমাদের সব আবদার তিনি হাসিমুখে মেটাতেন। তার চলে যাওয়া নজরুল চর্চার ক্ষেত্রে এক অপূরণীয় ক্ষতি। এখনো তার দল ‘বিষের বাঁশি’র শিল্পীরা আমাদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে অনুষ্ঠানে যোগ দেন। পরবর্তী প্রজন্মের সবার সঙ্গেই যোগাযোগ আছে।
নজরুলকে নিয়ে ভবিষ্যতে আর কী কী কাজ করতে চান?
নির্দিষ্ট কোনো কাজের কথা উল্লেখ করব না। প্রতিদিন তাকে নতুনভাবে চিনি, নতুনভাবে জানি। তার সৃষ্টির সঙ্গে পথচলা দীর্ঘ হোক–এটুকুই চাই।
জেনেছি আপনি অনেকবার বাংলাদেশে এসেছেন। এখানে আসার বিশেষ কোনো কারণ আছে কি?
শুধু অনুষ্ঠান নয়, নজরুল-গবেষণার কাজেও বহুবার এসেছি। বাংলাদেশে নজরুল-স্মৃতিবিজড়িত বেশকিছু জায়গায় যাওয়ার সৌভাগ্য হয়েছে। মূলত নজরুলকে ভালোবেসেই বারংবার ছুটে আসা।
বর্তমান প্রজন্ম নজরুল সম্পর্কে কতটা জানে? নজরুল চেতনা ছড়াতে আর কী করণীয়?
বর্তমান প্রজন্ম খুবই বুদ্ধিমান কিন্তু তাদের সঠিক পথে পরিচালনা করতে হবে। নেতিবাচক মন্তব্য না করে তাদের মতো করে বেশকিছু উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। ভবিষ্যতে পেশাদার শিল্পী হওয়ার প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ না করে নজরুল চেতনাকে আশ্রয় করে প্রকৃত মানুষ হওয়ার দিকে মনোনিবেশ করতে হবে। পরিবার এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।