ঢাকা ২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩, শনিবার, ০৬ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
মধুখালীতে জাল সনদে মাদরাসায় চাকরির অভিযোগ তুরস্কের প্রেসিডেন্টকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ প্রধানমন্ত্রীর গাইবান্ধায় ট্রেন থেকে পড়ে পা বিচ্ছিন্ন হওয়া সেই যুবকের মৃত্যু দৈনিক খবরের কাগজের শাকিলা ববিসহ সিলেটের ৬ সাংবাদিকে প্রেস লিগেসি অ্যাওয়ার্ড প্রদান নড়াইলে বাস উল্টে আহত ১৫ দক্ষিণ এশিয়ার মুকুট হারাল বাংলাদেশ নড়াইলে পৃথক স্থানে বজ্রপাতে নিহত ২ সরু একটি আইলই এখন তাদের আশ্রয়স্থল ১২০০ ফুট লম্বা পতাকা নিয়ে ব্রাজিল সমর্থকদের র‍্যালি কুমিল্লায় বাসের ধাক্কায় অটোরিকশার ৩ যাত্রী নিহত শহিদ জিয়ার প্রস্তাবে যুদ্ধের নাম হয় ‘মুক্তিযুদ্ধ’: মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী জলবায়ুজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে, অথচ বাজেট বরাদ্দ তলানিতে ঢাকায় শুরু হচ্ছে ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন’, উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী অধস্তনকে চড় মারায় সিলেটের এক নির্বাচন কর্মকর্তাকে লঘু দণ্ড তীব্র অর্থনৈতিক মন্দায় দেশ, দুর্ভিক্ষের আশঙ্কা জাপা চেয়ারম্যানের দেশীয় প্রযুক্তিতে অ্যাম্বুলেন্স তৈরি করবে সরকার আরেকবার সাফের ফাইনালে ঋতুপর্ণার গোল দৌলতদিয়ায় বাস নদীতে পড়ার ঘটনায় গ্রেপ্তার ৩ শরীয়তপুরে মাটির নিচ থেকে উঠছে ধোঁয়া, এলাকায় চাঞ্চল্য চট্টগ্রামে নিষিদ্ধ সংগঠনের ১৩ জন গ্রেপ্তার দৌলতদিয়ায় বাস নদীতে পড়ার ঘটনায় মামলা, গ্রেপ্তার ৩ এক টুকরো হৃদয়ের নাম বাংলাদেশ রামিসার  মামলার  দ্রুত রায় মা হচ্ছেন সোহিনী গাজায় ৪৮ ঘণ্টায় নিহত পাঁচজন চামড়া নিয়ে দুর্ভোগ আর দুর্গতির শেষ কোথায় লালমনিরহাটে ছাত্রলীগের ঝটিকা মিছিলের পর রাতেই গ্রেপ্তার ১৫ বাংলাদেশ লোক গবেষণা পরিষদের বার্ষিক সম্মেলন কেমন ছিল প্রিয় রাসুল (সা.) এর পোশাক ও রূপ? ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ৩ জনের মৃত্যু
Nagad desktop

রিউমর স্ক্যানারের অনুসন্ধান পাকিস্তানে বীরশ্রেষ্ঠ মতিউরের কবরে ‘বেঈমান’ লেখা দাবির বিষয়ে যা জানা গেল

প্রকাশ: ১৬ ডিসেম্বর ২০২৫, ০২:৩৩ পিএম
পাকিস্তানে বীরশ্রেষ্ঠ মতিউরের কবরে ‘বেঈমান’ লেখা দাবির বিষয়ে যা জানা গেল
ছবি: রিউমর স্ক্যানার

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালীন ১৯৭১ সালের ২০ আগস্ট পাকিস্তান বিমানবাহিনীর বাঙালি অফিসার মতিউর রহমান একটি যুদ্ধবিমান নিয়ে পালিয়ে আসার চেষ্টা করার সময় ওই বিমানে থাকা রশিদ মিনহাজ নামে পাকিস্তানি শিক্ষানবিশ পাইলটের সঙ্গে ধস্তাধস্তিকালে বিমানটি বিধ্বস্ত হয় এবং দুজনই নিহত হন। সেদিনই মতিউরকে দাফন করা হয় পাকিস্তানের মাশরুর বিমানঘাঁটির কবরস্থানে। স্বাধীনতার পর মতিউর রহমানকে বীরশ্রেষ্ঠ খেতাবে ভূষিত করা হয়। ২০০৬ সালের ২৪ জুন তার দেহাবশেষ বাংলাদেশে এনে পরদিন মিরপুর শহিদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে সমাহিত করা হয়। 

বহু বছর ধরেই বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানকে জড়িয়ে সংবাদমাধ্যমের পাতা থেকে শুরু করে সর্বমহলে একটি আলোচনা আছে যে, মতিউরকে পাকিস্তানে যে কবরস্থানে দাফন করা হয়েছিল সেখানে মতিউরের কবরের ওপর লেখা ছিল, ‘ইধার শো রাহা হ্যায় এক গাদ্দার’। বাংলায় যার অর্থ দাঁড়ায়, ‘এখানে শুয়ে আছে এক বেঈমান।’

জাতীয় দৈনিক দ্য ডেইলি স্টারের ২০০৫ সালের ২৪ মার্চ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দাবিটি পাওয়া যায়। প্রতিবেদনে লেখা রয়েছে, তাকে চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের জন্য উপযুক্ত একটি কবরস্থানে সমাহিত করা হয়েছিল। এমনকি পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ মাশরুর বিমানঘাঁটির প্রধান প্রবেশপথে তার ছবি টাঙিয়ে এবং তাকে গাদ্দার (বিশ্বাসঘাতক) হিসেবে চিহ্নিত করে এই বীরকে অপমান করার সাহস করেছিল।

এই প্রতিবেদন প্রকাশের পরদিনই মতিউর রহমানের মরদেহ পাকিস্তান থেকে ফিরিয়ে আনার জন্য সরকারের তাৎক্ষণিক উদ্যোগের দাবিতে রাজধানীর শাহবাগে একটি সমাবেশ ও মানববন্ধন হয়। 

পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন (এসইএম) আয়োজিত সমাবেশে সংগঠনের আহ্বায়ক আবু নাসের খানের বক্তব্যেও একই দাবির বিষয়টি আসে। তিনি বলেন, “পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ বিমানঘাঁটির প্রধান প্রবেশপথে মতিউরকে ‘গাদ্দার’ হিসেবে চিহ্নিত করে তাকে অপমান করার সাহস করেছে।”

২০২১ সালের আগস্টে দ্য ডেইলি স্টারের আরেক প্রতিবেদনে কিছুটা ভিন্ন দাবি করা হয়। বলা হয়, “মতিউর রহমানের কবরের সামনে লেখা ছিল, ‘ইধার সো রাহা হ্যায় এক গাদ্দার’ বা ‘এখানে ঘুমিয়ে আছে এক বিশ্বাসঘাতক’।”

একই পত্রিকা একবার দাবি করছে, মাশরুর বিমানঘাঁটির প্রধান প্রবেশপথে মতিউরের ছবি টাঙিয়ে এবং তাকে গাদ্দার (বিশ্বাসঘাতক) হিসেবে চিহ্নিত করে রেখেছিল। এর ১৬ বছর পরে আবার দাবি করছে, লেখাটা ছিল মতিউর রহমানের কবরের সামনে।

তখন পর্যন্ত এই দাবিগুলোর পক্ষে কোনো তথ্যপ্রমাণ বা ছবি প্রকাশ্যে আসেনি। তবে ২০০৫ সালের ২৪ মার্চের দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনের সঙ্গে একটি ছবিও যুক্ত ছিল। ছবিটির ক্যাপশন থেকে জানা যায়, ১৯৯৪ সালে করাচির মাশরুর বিমানঘাঁটির কবরস্থানে বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের কবর জিয়ারত করেন তার মেয়ে মাহিম মতিউর খন্দকার, তার স্বামী এবং ছেলে। ছবিটি পর্যালোচনা করে কবরের সামনের অংশে ছোট একটি নামফলক সদৃশ উপাদান দেখা যায়। ছবিটি দূর থেকে ধারণ করার কারণে নামফলকে ঠিক কী লেখা ছিল তা বোঝা যাচ্ছে না। তবে এটা বোঝা যায় যে, ‘ইধার শো রাহা হ্যায় এক গাদ্দার’ এর মতো এত লম্বা বাক্য জায়গা দেওয়ার মতো এত বড়ও ছিল না নামফলকটি।

২০২১ সালের ২১ মার্চ ‘RMS Motivation’ নামের একটি ফেসবুক পেজ থেকে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে কবরের দুটি ছবি দেখানোর সময়ও একই দাবি করা হয়। বলা হয়, ২০০৬ সাল পর্যন্ত পাকিস্তানে মতিউর রহমানের কবরের ওপর উর্দুতে লেখা ছিল, ইধার সো রাহা হ্যায় এক গাদ্দার। সাড়ে চার বছরে এই ভিডিও দেখা হয়েছে প্রায় ৩৫ মিলিয়ন বার।

কবরের একটি ছবি উইকিমিডিয়া কমন্সে (ফ্লিকারেও) পাওয়া গেছে। যাতে কবরটি রশিদ মিনহাজের (যার সঙ্গে মতিউরের ধস্তাধস্তি হয়েছিল) বলে লেখা রয়েছে। ছবিটি গুগল লেন্সে ট্রান্সলেট করেও একই তথ্যই পাওয়া যাচ্ছে। পাকিস্তানের গণমাধ্যম সূত্রেও নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে যে, কবরটি রশিদ মিনহাজেরই।  

অপর ছবিটি যে মতিউরের কবরের তা কবরের গায়ের ইংরেজি লেখা থেকেই স্পষ্ট। তবে ইংরেজি লেখাগুলোর ওপরে আরবিতে ক্যালিগ্রাফি আকারে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ লেখা রয়েছে।

অর্থাৎ, এই দুই ছবির কোনোটিতেই বেঈমান বা সমজাতীয় কোনো শব্দ উল্লেখ নেই। 

পাকিস্তানে ২০০৬ সালে মতিউরের দেহাবশেষ কবর থেকে তোলার আগে ধারণ করা সে স্থানের কিছু ছবি খুঁজে পেয়েছে রিউমর স্ক্যানার।

ছবিগুলোতে দেখা যাওয়া মতিউরের কবরের নামফলকের সঙ্গে ১৯৯৪ সালে তার মেয়ের পরিদর্শনের সময়ের ছবিতে থাকা কবরের নামফলকের ডিজাইনের অবশ্য মিল নেই। তবে বাকি ডিজাইনে মিল পাওয়া যায়। নামফলকটি পরবর্তী সময়ে (১৯৯৪ সালের পর) বদলানো থাকতে পারে বলে প্রতীয়মান হয়. কবরের উপরিভাগে যে সাদা রং রয়েছে তা সে সময়ই আনুষ্ঠানিকতা সারতে লাগানো হতে পারে।

বহুল আলোচিত এই দাবিটি নিয়ে পরবর্তী সময়ে অনুসন্ধান করতে গিয়ে ইমরান সাঈদ নামে পাকিস্তানের এক লেখকের সন্ধান পায় রিউমর স্ক্যানার। ইমরান সাঈদ বর্তমানে কানাডায় থাকেন। পছন্দ করেন ইতিহাস, লোকগাথা এবং সামরিক বিষয় নিয়ে লেখালেখি করতে। তার এক্স অ্যাকাউন্টে কিছু পোস্ট নজরে আসে রিউমর স্ক্যানারের। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসের এসব পোস্টে মতিউর রহমানের বিষয়ে বেশকিছু তথ্য পাওয়া যায়। এই পোস্টগুলো তার একটি ব্লগসাইটেও তিনি প্রকাশ করেন ২০১৯ সালের আগস্টে। এই ব্লগের ঘটনাবলি ২০১৮ সালের, যখন তিনি পাকিস্তানে গিয়েছিলেন। সে সময় তিনি মাশরুর বিমানঘাঁটিতে যান। ঘাঁটিটি পাকিস্তান বিমানবাহিনীর সর্ববৃহৎ ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত, যার অবস্থান করাচির মৌরিপুরে। ইমরান তার লেখায় মাশরুর বিমানঘাঁটির কিছু ছবি দিয়েছেন। একটি ছবিতে গুগল আর্থ থেকে একটি অংশ চিহ্নিত করে এটিকে বেসামরিক কর্মচারীদের কবরস্থান বলা হয়েছে। অর্থাৎ, এটিই সেই স্থান যেখানে মতিউর রহমানকে কবর দেওয়া হয়েছিল।

ইমরান এই কবরস্থান এবং মতিউর রহমান যেখানে শহিদ হয়েছিলেন সেখানে গিয়েছিলেন তার এই সফরে, ঘুরে দেখেছেন আশেপাশের এলাকাগুলো।

রিউমর স্ক্যানার ইমরান সাঈদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। তিনি জানান, আলোচিত দাবিটির বিষয়ে তিনি কখনো শোনেননি এবং এ সংক্রান্ত কোনো ছবিও তিনি দেখেননি। ইমরানের কাছ থেকেও ১৯৯৪ সালে মতিউরের মেয়ের কবর পরিদর্শনের ছবিটির বিষয়ে জানা যায়। তিনি বলছিলেন, ‘আমি যেসব ছবি দেখেছি, তার মধ্যে সবচেয়ে পুরোনোটি নব্বইয়ের দশকের, যখন মতিউর রহমানের মেয়ে তার স্বামীসহ বাবার কবর জিয়ারত করতে গিয়েছিলেন। সেই ছবিতে কোনো কবরের ফলক ছিল না, বরং একটি ছোট ধাতব প্লেট দেখা যায়। সম্ভবত প্লট নম্বর চিহ্নিত করতে ব্যবহৃত।’

২০০৬ সালে বাংলাদেশ থেকে যাওয়া প্রতিনিধিদলের কাছে মতিউরের মরদেহ হস্তান্তরের জন্য কবর খননের সময় কবরের ওপর যে ফলক দেখা যায়, তা ওই আনুষ্ঠানিকতার জন্য পাকিস্তান বিমানবাহিনী নতুনভাবে স্থাপন করেছিল বলে জানান ইমরান। 

কবরস্থানে প্রবেশদ্বারে দাবি করা কোনো শব্দচয়নের ব্যবহার কখনও ছিল কি-না সে প্রশ্নও ছিল ইমরানের কাছে। তিনি জানান, পাকিস্তান বিমানবাহিনী বেস মাশরুরের কবরস্থানের চারপাশে কোনো প্রাচীর ছিল না, এখনও নেই। এই কবরস্থানে প্রবেশের জন্য কখনোই কোনো ফটক ছিল না, না পুরো কবরস্থানের জন্য, না ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমানের কবরে যাওয়ার জন্য।’

১৯৭৫ সাল থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত পাকিস্তান বিমানবাহিনীর পাইলট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন কায়সার তুফাইল। তিনি ২০১২ সালে নিজের একটি ব্লগসাইটের লেখায় মতিউরের ঘটনাটির বিস্তারিত বর্ণনা দেন। তবে এই লেখায় কবরের বিষয়টির উল্লেখ ছিল না। 

কায়সার তুফাইলের সঙ্গে পরবর্তী সময়ে আলাপকালে তিনি রিউমর স্ক্যানারকে বলেন, “আমি ২০০৩ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত মাশরুর বিমানঘাঁটির বেস কমান্ডার ছিলাম এবং আমি কখনো এমন কোনো মন্তব্য (যেমন ‘এখানে ঘৃণিত একজন গাদ্দার ঘুমিয়ে আছে’) শুনিনি।”

কায়সার তুফাইল জানান, এর আগে তিনি ১৯৮২-৮৫ এবং ১৯৯২-৯৪ সালে দুই দফায় মাশরুর বিমানঘাঁটিতে কর্মরত ছিলেন। সে সময়গুলোতেও তিনি এমন কোনো অপমানজনক মন্তব্য কবর বা কবরস্থানের গেটে লেখা আছে বলে শোনেননি। 

কায়সার বলছিলেন, ‘মতিউর রহমানের কবরটি নির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত ছিল না, কেবল একটি নম্বর দেওয়া ছিল, তাই কেউ জানত না এটি কার কবর।’

এ বিষয়ে জানতে কয়েক দফায় মতিউর রহমানের স্ত্রী মিলি রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করলেও তিনি এ ব্যাপারে মন্তব্য করতে রাজি হননি। তাছাড়া, পাকিস্তানের আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরেও (আইএসপিআর) এ বিষয়ে যোগাযোগের চেষ্টা করে সাড়া পাওয়া যায়নি। 

অর্থাৎ, বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের মরদেহ পাকিস্তানে সমাহিত থাকাকালীন তার কবরের ওপর বা প্রবেশপথে বেঈমান বা সমজাতীয় শব্দ/বাক্য লেখা থাকার বহু বছর ধরে প্রচালিত যে দাবি, সমস্ত তথ্য-ছবি বিশ্লেষণ ও পর্যালোচনা করে সে দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।  

এসজি/

বাংলাদেশ-ভারতে সাম্প্রদায়িক অপতথ্যের অভিন্ন ছক

প্রকাশ: ২৩ মে ২০২৬, ০৫:৫৯ পিএম
বাংলাদেশ-ভারতে সাম্প্রদায়িক অপতথ্যের অভিন্ন ছক
ছবি: রিউমর স্ক্যানার

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশের বিভিন্ন স্থানে রাজনৈতিক হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। এ সময় বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের বাসাবাড়ি ও স্থাপনাও হামলার শিকার হয়। পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে ব্যাপক সাম্প্রদায়িক অপতথ্য ছড়িয়ে পড়ে। সে সময় রিউমর স্ক্যানার বেশ কিছু এক্স অ্যাকাউন্ট শনাক্ত করে, যেগুলো বাংলাদেশের বিভিন্ন ঘটনাকে সাম্প্রদায়িক রূপ দিয়ে প্রচার করেছে।

প্রায় দুই বছর পর, চলতি বছরের মে মাসে ভারতের কয়েকটি রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতার ঘটনাকে ঘিরেও একই ধরনের অপতথ্য ছড়াতে দেখা যায়। তবে এবার মূল প্ল্যাটফর্ম ছিল ফেসবুক এবং অপপ্রচারে সক্রিয় ছিল বাংলাদেশি প্রোফাইলগুলো। চলতি মাসের প্রথম ২১ দিনে রিউমর স্ক্যানারের শনাক্ত করা সাম্প্রদায়িক অপতথ্যের প্রায় ৮০ শতাংশই বাংলাদেশি অ্যাকাউন্ট থেকে ছড়ানো হয়েছে। এতে প্রশ্ন উঠেছে- ভারতীয়দের পূর্ববর্তী অপপ্রচারের প্রতিক্রিয়ায় কি এবার বাংলাদেশিরাও ‘পাল্টা বয়ান’ তৈরিতে নেমেছে?

রাজনৈতিক অস্থিরতা থেকে সাম্প্রদায়িক বয়ান: ২০২৪-এর এক্স ট্রেন্ড

রিউমর স্ক্যানারের অনুসন্ধানে দেখা যায়, ২০২৪ সালের ৫ থেকে ১৩ আগস্ট পর্যন্ত মাত্র নয় দিনে অন্তত ৫০টি এক্স অ্যাকাউন্ট বাংলাদেশের পরিস্থিতিকে সাম্প্রদায়িক রূপ দিয়ে অপতথ্য প্রচার করেছে। শনাক্ত হওয়া কনটেন্টগুলোর ৮০ শতাংশই ছিল ভিডিওভিত্তিক। এর মধ্যে প্রায় ৩০ শতাংশ ভিডিও ছিল পুরোনো বা ভিন্ন ঘটনার, আর বাকি ভিডিওগুলো সরকার পতনের পর সংঘটিত বিভিন্ন ঘটনাকে ধর্মীয় নিপীড়নের প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করে। শনাক্ত হওয়া অ্যাকাউন্টগুলোর প্রায় ৭২ শতাংশ নিজেদের ভারতভিত্তিক হিসেবে পরিচয় দিয়েছে।

অনুসন্ধানে আরও দেখা যায়, পুরোনো, ভিন্ন দেশের বা অপ্রাসঙ্গিক ছবি-ভিডিওকে ‘বাংলাদেশে হিন্দু নির্যাতন’ দাবিতে প্রচার করা হয়েছে। কোথাও রাজনৈতিক সহিংসতাকে ধর্মীয় নিপীড়ন হিসেবে দেখানো হয়েছে, আবার কোথাও ভুল পরিচয় ব্যবহার করে নির্দিষ্ট সম্প্রদায়কে টার্গেট করা হয়েছে। ‘গণহত্যা’ বা ‘পরিকল্পিত হামলা’র মতো উসকানিমূলক শব্দও ব্যবহার করা হয়। শুধু বেনামি অ্যাকাউন্ট নয়, ভারতীয় মূলধারার গণমাধ্যম, ভেরিফায়েড প্রোফাইল ও রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় কিছু পরিচিত অ্যাকাউন্ট থেকেও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানোর নজির পাওয়া যায়।

বিধানসভা নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা ও বাংলাদেশি প্রোফাইলের অপতথ্য

ভারতের কয়েকটি রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতাকে কেন্দ্র করে মে মাসজুড়ে সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক সাম্প্রদায়িক অপতথ্য ছড়ায়। রিউমর স্ক্যানারের ফ্যাক্টচেক বিশ্লেষণে অন্তত ২৮টি অপতথ্যের সঙ্গে বাংলাদেশি প্রোফাইলের সম্পৃক্ততার প্রমাণ মিলেছে। এর মধ্যে ১৩টি কনটেন্টে ভিন্ন ঘটনার ভিডিও বা ছবি সাম্প্রতিক সাম্প্রদায়িক সহিংসতার দাবি করে প্রচার করা হয়। এছাড়া পাঁচটি ছিল ভিন্ন দেশের কনটেন্ট এবং দুটি ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ঘটনার ফুটেজ ব্যবহার করা হয়েছে। অন্তত পাঁচটি কনটেন্টে সাজানো বা স্ক্রিপ্টেড ঘটনার উপস্থিতিও পাওয়া গেছে।

প্ল্যাটফর্ম বিশ্লেষণে দেখা যায়, অপতথ্য ছড়ানোর প্রধান মাধ্যম ছিল ফেসবুক। শনাক্ত হওয়া ২৮টি অপতথ্যই এই প্ল্যাটফর্মে ছড়ানো হয়। পাশাপাশি ১১টি ইনস্টাগ্রামে, পাঁচটি ইউটিউবে, দুটি করে এক্স ও থ্রেডসে এবং একটি টিকটকে প্রচারিত হয়েছে। কয়েকটি ক্ষেত্রে বাংলাদেশের মূলধারার গণমাধ্যমেও ভুয়া দাবি ছড়িয়ে পড়ে।

ফ্যাক্টচেক অনুযায়ী, কোথাও পুরোনো সহিংসতার ভিডিওকে ‘নির্বাচনের পর মুসলিমদের ওপর হামলা’ হিসেবে প্রচার করা হয়েছে, আবার কোথাও বিদেশি ঘটনার ফুটেজকে ভারতের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি বলে চালানো হয়েছে। বেশিরভাগ পোস্টেই ধর্মীয় পরিচয় ও আবেগনির্ভর ভাষা ব্যবহার করে ঘটনাগুলোকে সাম্প্রদায়িক রূপ দেওয়ার চেষ্টা দেখা গেছে।

বাংলাদেশ থেকে ভারত: সংকটকেন্দ্রিক সাম্প্রদায়িক অপতথ্যের অভিন্ন কৌশল

২০২৪ সালের ৬ আগস্ট ‘Akshit Singh’ নামের একটি ভারতীয় এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে দাবি করা হয়, বাংলাদেশে ১০ হাজারের বেশি হিন্দু নিহত হয়েছে। পরে যাচাই করে দেখা যায়, এ দাবির কোনো ভিত্তি নেই। একইভাবে চলতি মে মাসে বাংলাদেশি কিছু ফেসবুক প্রোফাইল ও পেজ দাবি করে, ভারতে সহিংসতায় ‘৭২ ঘণ্টায় ৪৮৭ মুসলিম নিহত’ হয়েছে। কিন্তু যাচাইয়ে দেখা যায়, ৪ থেকে ১৩ মে পর্যন্ত সহিংস ঘটনায় অন্তত ১৩ জন নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে মাত্র একজন মুসলিম।

দুই ক্ষেত্রেই বাস্তব ঘটনাকে অতিরঞ্জিত করে ধর্মীয় আবেগ উসকে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে। একদিকে “১০ হাজার হিন্দু নিহত”, অন্যদিকে “৭২ ঘণ্টায় ৪৮৭ মুসলিম নিহত”- উভয় দাবিই ছিল ভিত্তিহীন। অর্থাৎ, বাস্তব ঘটনার সঙ্গে অতিরঞ্জিত ও বিভ্রান্তিকর তথ্য যুক্ত করে ধর্মীয় সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে ভয়, ক্ষোভ ও সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা তৈরির চেষ্টা করা হয়েছে।

২০২৪ ও ২০২৬ সালের অপতথ্য প্রচারণার মধ্যে আরও বেশ কিছু মিল রয়েছে। উভয় ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক সহিংসতা বা অস্থিরতাকে ধর্মীয় নিপীড়নের রূপ দেওয়া হয়েছে। পুরোনো বা প্রসঙ্গবহির্ভূত ছবি-ভিডিও ব্যবহার, ভুল পরিচয় আরোপ এবং আবেগনির্ভর ভাষা ছিল অপপ্রচারের প্রধান কৌশল। ‘গণহত্যা’, ‘পরিকল্পিত হামলা’, ‘মুসলিম নিধন’ বা ‘হিন্দু নির্যাতন’-এর মতো শব্দ ব্যবহার করে জনমনে ক্ষোভ ও ভয় তৈরির প্রবণতাও ছিল স্পষ্ট।

তবে প্রচারণার ধরনে কিছু পার্থক্যও দেখা গেছে। বাংলাদেশকে ঘিরে ২০২৪ সালের অপতথ্যে এক্স ছিল প্রধান প্ল্যাটফর্ম এবং ভারতীয় ভেরিফায়েড অ্যাকাউন্ট ও গণমাধ্যমের সক্রিয়তা বেশি ছিল। অন্যদিকে ভারতের নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা নিয়ে বাংলাদেশি প্রোফাইলগুলোর অপপ্রচারে ফেসবুকভিত্তিক নেটওয়ার্কের ভূমিকা বেশি দেখা গেছে। পাশাপাশি ইনস্টাগ্রাম, ইউটিউব, থ্রেডস ও টিকটকেও একই বয়ান ছড়ানো হয়।

পাল্টা প্রোপাগান্ডার চক্র

বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ ও ভারতকে ঘিরে সাম্প্রতিক সাম্প্রদায়িক অপতথ্যের প্রবণতা মূলত এক ধরনের পাল্টা প্রোপাগান্ডার ধারাবাহিকতা। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের জার্নালিজম অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সাঈদ আল-জামান একে ‘ডিজিটাল প্রতিশোধপরায়ণতা’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। 

তার ভাষায়, “এক দেশের ব্যবহারকারীরা অন্য দেশের ঘটনাকে রাজনৈতিক বা সাম্প্রদায়িক প্রোপাগান্ডার উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করছে।”

ভারতীয় সাংবাদিক অর্ক ভাদুড়ীর পর্যবেক্ষণও একই ধরনের। তার মতে, ২০২৪ সালে বাংলাদেশের ঘটনাকে ঘিরে ভারতীয় এক্স অ্যাকাউন্টগুলোর অপপ্রচার এবং ২০২৬ সালে ভারতের সহিংসতাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশি প্রোফাইলগুলোর অপতথ্য- দুটিই একই কৌশলের পুনরাবৃত্তি। তিনি বলেন, বাস্তব সংকটকে ভিত্তি করে দুই দেশেই অর্ধসত্য, বিকৃত তথ্য ও মিথ্যা নির্মাণ করে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, পুরোনো ভিডিও, ভিন্ন দেশের ছবি বা প্রসঙ্গবহির্ভূত কনটেন্ট ব্যবহার করে সাম্প্রদায়িক বয়ান তৈরি করা হচ্ছে। ‘ভুক্তভোগী বনাম নির্যাতনকারী’ ধরনের আবেগনির্ভর কাঠামো তৈরি করে মানুষের অনুভূতিকে প্রভাবিত করা হচ্ছে।

সাঈদ আল-জামানের ভাষায়, “পুরোনো ভিডিও বা প্রসঙ্গবহির্ভূত ছবি হলেও সেটি বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়, যদি তা নিজের গোষ্ঠীর বয়ানের সঙ্গে মিলে যায়।”

অর্ক ভাদুড়ীর মতে, বাংলাদেশে ইসলামপন্থি এবং ভারতে হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীগুলোর ‘মোডাস অপারেন্ডি’ অনেকটাই একই ধরনের। 

তার ভাষায়, “ফেক নিউজ ছড়ানোর ক্ষেত্রেও আমরা দুই দেশের মধ্যে এক ধরনের অদ্ভুত ঐক্য দেখছি।”

বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক মেরুকরণ, আবেগনির্ভর কনটেন্ট এবং সোশ্যাল মিডিয়া অ্যালগরিদম- এই তিনটি উপাদান অপতথ্য ছড়ানোর গতি বাড়িয়ে দেয়। ধর্মীয় উত্তেজনামূলক কনটেন্ট বেশি প্রতিক্রিয়া পায় বলেই অ্যালগরিদমও সেগুলো আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়।

তাদের সতর্কবার্তা, অনলাইন গুজব কেবল ভার্চুয়াল জগতের সমস্যা নয়; এটি বাস্তবেও সংঘর্ষ ও সহিংসতার কারণ হতে পারে। একই সঙ্গে এ ধরনের অপতথ্য বাংলাদেশ ও ভারতের মানুষের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি অবিশ্বাস, ঘৃণা ও বিভাজন তৈরি করছে। বিশ্লেষকদের মতে, দক্ষিণ এশিয়ায় সাম্প্রদায়িক সম্পর্ক ও তথ্য-পরিবেশের জন্য এটি এখন বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।

থালাপতি বিজয়ের নামে মিথ্যা প্রচার

প্রকাশ: ১৩ মে ২০২৬, ০১:০৫ পিএম
থালাপতি বিজয়ের নামে মিথ্যা প্রচার
তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী চন্দ্রশেখর জোসেফ বিজয় ওরফে থালাপতি বিজয়

ভারতের তামিলনাড়ুর নবনির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রী চন্দ্রশেখর জোসেফ বিজয় ওরফে থালাপতি বিজয়ের নামে প্রচারিত ‘আমার রাজ্যে যদি কোনো হিন্দু মুসলিমদের ওপর অত্যাচার করে, তাহলে এর ফল বিশ্বে ইতিহাস হয়ে যাবে। কাউকে ছাড় দেবো না কে কোন ধর্মের সেটা বড় কথা নয় নাগরিকের অধিকার সবার’ শীর্ষক মন্তব্যটি মিথ্যা বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান রিউমর স্ক্যানার।

এই দাবিতে দেশের একাধিক গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে কালবেলা, চ্যানেল আই, ডিবিসি নিউজ, আমার দেশ, এনটিভি, ইত্তেফাক, মানবজমিন, মাছরাঙা টিভি, জাগোনিউজ২৪, সময়ের আলো, খবরের কাগজ, নয়া দিগন্ত, গ্লোবাল টিভি, এনপিবি নিউজ, দৈনিক সংগ্রাম, বার্তা বাজার, বাংলা টিভি, আমার সংবাদ, টাইমস টুডে, ঢাকা প্রকাশ, বায়ান্ন টিভি, বাংলাদেশ টাইমস, জনবাণী, বিডি২৪রিপোর্ট, দ্য নিউজ, সুখবর।

রিউমর স্ক্যানার জানায়, থালাপতি বিজয় এই মন্তব্য করেননি। প্রকৃতপক্ষে, ফেসবুকের অসমর্থিত পেজ থেকে অন্তত ৯ মে থেকে দাবিটি ছড়ানোর পর, যাচাই ছাড়াই গণমাধ্যমেও সেটি ব্যাপকভাবে প্রচার করা হয়।

থালাপতি বিজয় আলোচিত দাবি সংক্রান্ত কোনো মন্তব্য করেছেন কিনা তা জানতে কিওয়ার্ড সার্চ করে ভারতীয় গণমাধ্যম দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়ার ওয়েবসাইটে ১১ মে ভোরে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন পাওয়া যায়। প্রতিবেদনে বলা হয়, শপথের পর দেওয়া বক্তব্যে সংখ্যালঘুদের উদ্দেশ্যে বিজয় বলেছেন, তার সরকার তাদের পাশে থাকবে। তিনি বলেন, ‘আপনারা বিজয়কে শতভাগ বিশ্বাস করতে পারেন। আমি হিন্দু, মুসলিম ও খ্রিস্টান-সবারই সমান।’ 

তার এমন বক্তব্যে আলোচিত দাবি সংক্রান্ত কোনো তথ্য মেলেনি।

অমিয়/

এসএসসির ভুয়া প্রশ্ন বিক্রির ফাঁদ: টেলিগ্রাম চক্রে পরীক্ষার্থীর নাম

প্রকাশ: ১০ মে ২০২৬, ১২:২৯ পিএম
এসএসসির ভুয়া প্রশ্ন বিক্রির ফাঁদ: টেলিগ্রাম চক্রে পরীক্ষার্থীর নাম
ছবি: রিউমর স্ক্যানার

প্রতিবছরের মতো এবারও এসএসসি পরীক্ষা ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশ্নফাঁসের গুজব ছড়িয়ে পড়েছে। তবে এবার প্রতারণার ধরনে এসেছে নতুন মাত্রা। ফেসবুক গ্রুপ ও টেলিগ্রাম চ্যানেলকে কাজে লাগিয়ে পরীক্ষার্থীদের কাছে ‘ফাঁস হওয়া প্রশ্ন’ বিক্রির প্রলোভন দেখানো হচ্ছে। বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি করতে ব্যবহার করা হচ্ছে এআই প্রযুক্তিতে সম্পাদিত প্রশ্নপত্রের ছবি। এরপর টেলিগ্রাম বটের মাধ্যমে পরীক্ষার্থীদের কাছ থেকে নেওয়া হচ্ছে টাকা।

রিউমর স্ক্যানার ইনভেস্টিগেশন ইউনিটের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, এই প্রতারণাচক্রে ব্যবহৃত মোবাইল নম্বর, টেলিগ্রাম বটের ইউজারনেম এবং সংশ্লিষ্ট ডিজিটাল কার্যক্রম বিশ্লেষণ করে এক এসএসসি পরীক্ষার্থীর সম্ভাব্য সম্পৃক্ততার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।

তারিখ ২৯ এপ্রিল, ২০২৬। চলমান এসএসসি পরীক্ষার মাঝেই পরদিনের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) পরীক্ষাকে ঘিরে শুরু হয় নতুন ধরনের প্রতারণার তৎপরতা। ২৮ এপ্রিল দুপুর থেকেই ফেসবুকে ‘Ssc 2026 প্রশ্ন ফাঁস গ্রুপ’ নামের একটি গ্রুপে আইসিটি প্রশ্ন দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে শেয়ার করা হচ্ছিল টেলিগ্রামের লিংক।

‘Raja Roy’ নামের একটি ভুয়া ফেসবুক প্রোফাইল থেকে ২৯ এপ্রিল সকাল পর্যন্ত এ–সংক্রান্ত মোট ১৭টি পোস্ট করা হয় গ্রুপটিতে। পোস্টগুলোতে দাবি করা হচ্ছিল, টেলিগ্রাম চ্যানেলে যোগ দিলেই পাওয়া যাবে পরীক্ষার প্রশ্ন।

তবে অনুসন্ধানে দেখা যায়, প্রচারিত প্রশ্নের ছবিটি ছিল সম্পূর্ণ ভুয়া। ছবির বানান ভুল ও অস্বাভাবিক লেখার ধরন বিশ্লেষণ করে নিশ্চিত হওয়া যায়, এটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছে। আরও যাচাই করে রিউমর স্ক্যানার দেখতে পায়, ২০২৫ সালের এসএসসির আইসিটি প্রশ্নপত্রের ছবিকে এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে সম্পাদনা করেই নতুন এই ভুয়া প্রশ্ন তৈরি করা হয়েছে।

ফেসবুকের পোস্টগুলোতে টেলিগ্রামের যে লিংক দেওয়া ছিল সেটি মূলত একটি চ্যানেল। টেলিগ্রাম চ্যানেলটির নাম SSC Question Sell। সাবস্ক্রাইবার ৩৮০০-এর বেশি। গত ২৭ এপ্রিল এটি খোলা হয়। সেদিনই ‘Ssc 2026 প্রশ্ন ফাঁস গ্রুপ’ নামের ফেসবুক গ্রুপটিতে চ্যানেলটির প্রচারণা শুরু হয় Raja Roy নামের ভুয়া প্রোফাইলটি থেকে। কিছুটা কৌশল নিয়ে প্রথমে প্রশ্ন চেয়ে পোস্ট করা হয় প্রোফাইলটি থেকে। কয়েক ঘণ্টা পর একই প্রোফাইল থেকে টেলিগ্রামের আলোচিত চ্যানেলটি থেকে প্রশ্ন পাওয়া গেছে জানিয়ে পোস্ট করা হয়। এরপর থেকে নিয়মিত এই প্রোফাইল টেলিগ্রাম চ্যানেলটির প্রচারণা চালিয়ে আসছে এই গ্রুপে। 

২৭ এপ্রিল থেকেই সংশ্লিষ্ট টেলিগ্রাম চ্যানেলে বিভিন্ন বার্তার মাধ্যমে পরীক্ষার্থীদের প্রশ্ন পাওয়ার প্রলোভন দেখানো হচ্ছিল। বিশেষ করে ২৯ এপ্রিল, আইসিটি পরীক্ষার আগের পুরো দিনজুড়ে সেখানে ধারাবাহিকভাবে ‘প্রশ্ন দেওয়া হবে’ দাবি করে বার্তা প্রকাশ করা হয়।

এসব পোস্ট ও মেসেজে আইসিটি বিষয়ের এআই-সম্পাদিত ভুয়া প্রশ্নপত্রের ছবির একটি অংশ ব্যবহার করা হয়, যাতে সেটিকে বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়। একই সঙ্গে জানানো হয়, প্রশ্ন পেতে হলে ১০০০ টাকা পরিশোধ করতে হবে এবং যোগাযোগ করতে হবে @Joyesh_Bot ইউজারনেমযুক্ত ‘Redwan’s_Method_Crackers’ নামের একটি টেলিগ্রাম বট আইডিতে।

রিউমর স্ক্যানার ইনভেস্টিগেশন ইউনিটের একজন প্রতিনিধি অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে ওই বট আইডিতে যোগাযোগ করলে প্রথমেই জানতে চাওয়া হয়- কোন শিক্ষা বোর্ডের প্রশ্ন প্রয়োজন। প্রতিনিধি ঢাকা বোর্ডের কথা জানালে প্রতারক পক্ষ থেকে জানানো হয়, সেদিন রাত ১০টায় একটি আলাদা প্রাইভেট গ্রুপে প্রশ্ন সরবরাহ করা হবে। এর বিনিময়ে দাবি করা হয় ৯০০ টাকা।

নম্বর চাওয়ার পর এই বিকাশ নম্বর (01718974531) দেওয়া হয়। রিউমর স্ক্যানার ইনভেস্টিগেশন ইউনিট নম্বরটি বিভিন্ন মাধ্যমে যাচাই করে দেখেছে। ট্রু কলারে নম্বরটির বিপরীতে ‘Gour Sundor Kaku’ নাম পাওয়া যাচ্ছে। বিকাশে একই নম্বরের পরিচয়ধারী হিসেবে ‘Gour Sundar Biswas’ নাম রয়েছে। নিকনেম ব্যবহার হচ্ছে ‘Scammer 1’। সার্চ ইঞ্জিন গুগলের বদৌলতে একই নম্বর বাংলাদেশ জাতীয় তথ্য বাতায়নের ওয়েবসাইটে যশোরের সিদ্দিপাশা ইউনিয়নের পেজেও পাওয়া যাচ্ছে। সেখানে এই নম্বরের বিপরীতে ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা পদে থাকা গৌর সুন্দর বিশ্বাস নামে এক ব্যক্তির নাম উল্লেখ রয়েছে। 

প্রাথমিক অনুসন্ধানে মোবাইল নম্বরটির বিপরীতে সম্ভাব্য মাধ্যমগুলোয় একই নাম পাওয়ার প্রেক্ষিতে নম্বরটি ফেসবুকে সার্চ করে এই নামে একটি প্রোফাইল খুঁজে পেয়েছে রিউমর স্ক্যানার ইনভেস্টিগেশন ইউনিট। 

যাচাই করে দেখা যায়, ‘গৌর সুন্দর বিশ্বাস’ নামের এই প্রোফাইলটি অন্তত ২০২২ সাল থেকে সক্রিয় রয়েছে ফেসবুকে। ওই বছর বিভিন্ন টিভি সিরিয়ালের লিংকের একটি গ্রুপের এডমিন হয়ে নিয়মিত সেখানে পোস্ট করা হতো। 

২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত অনলাইনে বিভিন্ন শিক্ষা সহায়তা প্ল্যাটফর্মে সক্রিয় দেখা যায় প্রোফাইলটিকে, নিয়মিত পোস্ট করা হতো পড়াশোনা সংক্রান্ত সমস্যার সমাধান চেয়ে।

এই প্রোফাইল থেকে শিক্ষা সহায়তা প্ল্যাটফর্ম টেন মিনিট স্কুলের একটি ফেসবুক গ্রুপে ২০২৪ সালের এপ্রিলে করা একটি পোস্ট নজরে আসে রিউমর স্ক্যানার ইনভেস্টিগেশন ইউনিটের, যাতে বলা হয়, পোস্টদাতার নাম জয়েশ বিশ্বাস (Joyesh Biswas)। তিনি নোয়াপাড়া শংকরপাশা সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে। ওই সময়ে সে নবম শ্রেণিতে পড়ছিল। এই পোস্টেও একই মোবাইল নম্বরটি দেওয়া ছিল। 

নোয়াপাড়া শংকরপাশা সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়টি যশোরের অভয়নগরে অবস্থিত। বিদ্যালয়টির ওয়েবসাইট থেকে তার পরিচয় নিশ্চিত হতে পেরেছে রিউমর স্ক্যানার ইনভেস্টিগেশন ইউনিট।  

টেন মিনিট স্কুলের গ্রুপটি এবং আরেক শিক্ষা সহায়তা প্ল্যাটফর্ম Redwan’s Method-এর একটি গ্রুপে গত বছরের ডিসেম্বরে জয়েশ তার এসএসসির টেস্ট পরীক্ষার একাডেমিক ট্রান্সক্রিপ্টের ছবি পোস্ট করে। এসব পোস্ট থেকে জানা যায়, জয়েশ এ বছর এসএসসি পরীক্ষা দিচ্ছে।  

জয়েশের বিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ ফলাফল পর্যালোচনায় বোঝা যায়, সে মেধাবী একজন শিক্ষার্থী। তার ইনস্টাগ্রাম প্রোফাইল ঘেঁটে গেমিংয়ের নেশা থাকার বিষয়টি লক্ষ্য করা গেছে। তার সঙ্গে গৌর সুন্দর বিশ্বাসের সম্পর্কের বিষয়ে ওপেন সোর্স অনুসন্ধানে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, টেলিগ্রামে বট প্রোফাইলটির ইউজার নেম তারই নামে এবং বটের নাম রাখা অনলাইনের একটি শিক্ষা সহায়তা প্ল্যাটফর্মের নামে যেখানে সে নিজেও শিক্ষার্থী ছিল। যদিও এই অনুসন্ধান চলাকালীন এই নাম বদলে ফেলা হয়। বর্তমান নাম, ‘বাংলাদেশ শিক্ষাবোর্ড (Payment)।’

আজ রবিবার সকাল পর্যন্ত টেলিগ্রামের চ্যানেলটিতে এসএসসির ছয়টি বিষয়ের প্রশ্ন ফাঁসের ভুয়া দাবি ছড়ানো হয়েছে। এসব প্রশ্ন পেতে সর্বনিম্ন ৫০০ টাকা থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ৩০০০ টাকা পর্যন্ত চাওয়া হয়েছে। এমনও দেখা গেছে, একই বিষয়ের প্রশ্নের জন্য তিনবার তিন পরিমাণ (প্রথমে ২০০০, পরে ১২০০, সবশেষে ১০০০) অর্থ চাওয়া হয়েছে। এ সংক্রান্ত মেসেজগুলোয় ব্যবহার করা হচ্ছে এআই দিয়ে সম্পাদনা করে তৈরি ভুয়া প্রশ্ন। 

এসএসসির প্রশ্নফাঁসের গুজবকে কেন্দ্র করে প্রযুক্তিনির্ভর প্রতারণার নতুন ও উদ্বেগজনক এই প্রবণতা দুশ্চিন্তার তৈরি করছে শিক্ষা সংশ্লিষ্ট মহলে। এআই দিয়ে ভুয়া প্রশ্নের ছবি তৈরি, টেলিগ্রাম বট ব্যবহার করে অর্থ লেনদেন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমন্বিত প্রচারণা-সব মিলিয়ে প্রতারকরা এখন আরও কৌশলী ও সংগঠিত হয়ে উঠছে। উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এ ধরনের কর্মকাণ্ডে পরীক্ষার্থীদের সম্পৃক্ততার ইঙ্গিতও মিলছে, যা শিক্ষার্থীদের মধ্যে দ্রুত অর্থ উপার্জনের প্রবণতা ও অনলাইন প্রতারণায় জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিকে সামনে আনছে। পরীক্ষার্থী ও অভিভাবকদের উদ্বেগকে পুঁজি করে পরিচালিত এসব কার্যক্রম শুধু আর্থিক ক্ষতির ঝুঁকিই তৈরি করছে না, বরং শিক্ষাব্যবস্থা ও পরীক্ষাপদ্ধতির প্রতি আস্থাও দুর্বল করে দিচ্ছে।

শেখ হাসিনার হজে যাওয়ার ভিডিও প্রচার, যা জানা গেল ফ্যাক্ট চেকে

প্রকাশ: ২১ এপ্রিল ২০২৬, ০৫:২৫ পিএম
শেখ হাসিনার হজে যাওয়ার ভিডিও প্রচার, যা জানা গেল ফ্যাক্ট চেকে
ছবি: রিউমর স্ক্যানার

ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে আশ্রয়ে নেওয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতের দিল্লি বিমানবন্দর হয়ে পবিত্র হজ পালন করতে সৌদি আরব যাচ্ছেন, এমন একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে প্রচার করা হয়েছে।

ভিডিওতে বিমানবন্দরের ভেতরের দৃশ্য দেখে বোঝা যাচ্ছে, এটি হজযাত্রীদের যাত্রার জন্য নির্ধারিত একটি টার্মিনাল। ছবির কেন্দ্রে সাদা শাড়ি ও মাথায় ওড়না পরা শেখ হাসিনা দাঁড়িয়ে রয়েছেন। তার গলায় একটি আইডি কার্ড ঝুলছে এবং হাতে তসবিহ ধরা। হাতে ঝোলানো একটি ছোট ব্যাগ, যেখানে ‘Hajj 2024’ লেখা দেখা যায়। এটি ইঙ্গিত করে তিনি হজ পালনের উদ্দেশ্যে ভ্রমণ করছেন। কিন্তু ২০২৪ লেখা দেখে খটকা লাগা স্বাভাবিক।

আরেকটি ভিডিওতে শেখ হাসিনাকে চারপাশ থেকে ঘিরে রেখেছেন চারজন সশস্ত্র নিরাপত্তাকর্মী, পেছনের দিকে আরও কয়েকজন হজযাত্রী দেখা যাচ্ছে, যারা সাদা ইহরাম পোশাক পরা এবং লাগেজসহ এগোচ্ছেন। সবমিলিয়ে, হজযাত্রার একটি পরিবেশ ফুটিয়ে তোলা হয়েছে ছবিটিতে। ফেসবুকে ‘শেখ হাসিনা জয় বাংলা’ নামের একটি পেজে ছবিটি রিলস আকারে পোস্ট করে ক্যাপশনে বলা হচ্ছে, ‘দিল্লি এয়ারপোর্ট থেকে হজ্ব করার উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা’।

এসব ভিডিও যাচাই করতে গিয়ে রিউমর স্ক্যানার গুগলের বিশেষ শনাক্তকরণ প্রযুক্তির শরণাপন্ন হয়। ছবিটি সিন্থআইডি দিয়ে বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এই ছবিটির পুরো অংশ বা অনেকটা অংশই গুগল এআই ব্যবহার করে তৈরি বা এডিট করা হয়েছে।

শুধু এই ছবিই নয়, শেখ হাসিনার হজযাত্রা দাবিতে আরও দুইটি ছবি এবং একটি ভিডিও প্রচার করা হয়েছে, যা পরবর্তীতে আসল দাবিতে ছড়িয়েছে আওয়ামীপন্থি বিভিন্ন পেজে।

এসব কনটেন্ট যে এআই দিয়ে বানানো তা প্রাসঙ্গিক বিশ্লেষণে সহজেই বোঝা যায়। কিন্তু এসব পোস্টের কমেন্ট পর্যালোচনা করলে বোঝা যায়, অসংখ্য মানুষ এসব কনটেন্টকে বাস্তব ধরে নিয়ে মতামত দিচ্ছেন।

এ বছর প্রথম হজ ফ্লাইট যাত্রা করে গত ১৭ এপ্রিল। ভারতে পরদিন ১৮ এপ্রিল সে দেশের প্রথম হজ ফ্লাইট ছেড়ে গেছে দিল্লি থেকে। সেদিনই দুপুরে শেখ হাসিনার আলোচিত ছবিটি ছড়াতে দেখা যায়। 

১৯ এপ্রিল সকালে আরেকটি ছবি প্রচার করা হয়। দাবি করা হয়, শেখ হাসিনা সৌদি বিমানবন্দরে পৌঁছেছেন। বিশ্লেষণ বলছে, এটিও এআই দিয়ে তৈরি হওয়া ছবি। 

সফরের ধারাবাহিক কার্যক্রম হিসেবে এরপর সৌদি বাদশাহর আমন্ত্রণে শেখ হাসিনার ভোজের দৃশ্য ‘সৌদি বাদশার বিশেষ আমন্ত্রণে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে শেখ হাসিনা।’ শিরোনাম দিয়ে পোস্ট করা হয়েছে পেজে। এই পোস্টটি ভাইরাল হয়েছে অবশ্য ভিন্ন ক্যাপশনে। একাধিক পেজে ছবিটি দিয়ে বলা হচ্ছে, “সৌদী জুবরাজের আমন্ত্রণে একসঙ্গে খাবার খাচ্ছেন শেখ হাসিনা ! জুবরাজ বলেছেন হাসিনাকে সম্মানের সাথে বাংলাদেশে না ফিরতে দিলে কঠিন পদক্ষেপ দিবে সৌদি সরকার!” 

গুগল জেমিনি জানাচ্ছে, এআই দিয়ে তৈরি ছবিটি বিশ্লেষণে প্রেক্ষাপট, ব্যক্তিদের মুখাবয়ব ও অঙ্গভঙ্গি এবং খাবার ও টেবিলের ডিটেইলস সংক্রান্ত অসঙ্গতি চোখে পড়ে। এ ধরনের এআই-তৈরি কনটেন্টকে সাধারণ মানুষ সত্য ধরে নেওয়ার ফলে বাস্তবতা ও কল্পনার সীমা ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে, অপতথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে এবং জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে।

অমিয়/

হামের টিকা নিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর মন্তব্য মিথ্যা: রিউমর স্ক্যানার

প্রকাশ: ৩০ মার্চ ২০২৬, ০৪:১১ পিএম
হামের টিকা নিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর মন্তব্য মিথ্যা: রিউমর স্ক্যানার
ছবি: রিউমর স্ক্যানার

গত আট বছর দেশে হামের টিকা দেওয়া হয়নি বলে সাংবাদিকদের কাছে যে মন্তব্য করেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল, তা ভুল বলছে তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান রিউমর স্ক্যানার।

অনুসন্ধান করে রিউমর স্ক্যানার দেখেছে, ২০২০ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২১ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত দেশব্যাপী হাম-রুবেলার টিকাদান কর্মসূচি হয়েছিল। ইউনিসেফের প্রবন্ধ থেকে বিষয়টি নিশ্চিত হয় এই তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠানটি। 

গতকাল (২৯ মার্চ) সাংবাদিকদের কাছে এক বক্তব্যে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘মিজেলসের (হাম) রোগী অনেক বেড়েছে। আট বছর আগে মিজেলসের ভ্যাকসিন দেওয়া হয়েছে। এরপর আর এই ভ্যাকসিন কোনো গভর্নমেন্ট দেয় নাই। আমরা কিন্তু এর মধ্যে ৬০৪ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছি। পারচেজ কমিটি পাশ হয়েছে।’

স্বাস্থ্যমন্ত্রীর মন্তব্যের সত্যতা যাচাই করতে গিয়ে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত জাতিসংঘ শিশু তহবিলের (ইউনিসেফ) ওয়েবসাইটে প্রকাশিত একাধিক প্রবন্ধ সামনে আসে।

২০২১ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত একটি প্রবন্ধ অনুযায়ী, ২০২০ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২১ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত হামের টিকাদান কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়েছিল বাংলাদেশে।

ইউনিসেফের প্রবন্ধে জানানো হয়, ‘সম্প্রতি দেশজুড়ে ৩ কোটি ৬০ লক্ষ শিশুকে হাম ও রুবেলার টিকা দেওয়ার বিশাল কাজটি যারা সম্পন্ন করেছেন এমন হাজার হাজার বাংলাদেশি স্বাস্থ্যকর্মীর মধ্যে ইয়োচুঙ্গু একজন। ইউনিসেফ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহায়তায় বাংলাদেশ সরকার এই টিকা অভিযানটি সম্পন্ন করে।’

সেখানে আরও বলা হয়, ‘২০২০ সালের মার্চ মাসে এই কর্মসূচি শুরু হওয়ার কথা থাকলেও কোভিড-১৯ মহামারির কারণে এটি স্থগিত করা হয়। এমনকি ২০২০ সালের ডিসেম্বরে একবার চালু করার পরে এটি স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল ছিল যে, এবারের কার্যক্রম অন্যবারের চেয়ে ভিন্নতর হবে। অবশেষে টিকা দেওয়ার জায়গাগুলিতে ভিড় এড়াতে তিন সপ্তাহের পরিকল্পিত কার্যক্রমকে ছয় সপ্তাহব্যাপী চালানো হয়।’

এ বিষয়ে ফেসবুকেই ২০২০ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২১ সালের জানুয়ারির মধ্যে অসংখ্য পোস্ট খুঁজে পেয়েছে রিউমর স্ক্যানার, যেগুলোতে সেসময় হাম-রুবেলা ক্যাম্পেইনের আওতায় শিশুদের টিকা দেওয়ার সময়ের ছবিসহ আনুষ্ঠানিক তথ্যের উল্লেখ পাওয়া যায়।

স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দাবি যে সত্য নয় তা স্বীকার করেছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তাও। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তারা একটি জাতীয় দৈনিককে জানান, এটি সত্য নয়; টিকা ইপিআইয়ের নিয়মিত কার্যক্রমের অংশ এবং সব সময় দেওয়া হয়। নিয়মিত টিকা দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো শিশু যেন বাদ না পড়ে, তাই কয়েক বছর পরপর ক্যাম্পেইন করা হয়।

সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) উপ-পরিচালক মো. শাহরিয়ার সাজ্জাদ বলেন, ‘অনেক শিশু ৯ মাস বয়সে প্রথম ডোজ নেওয়ার আগেই আক্রান্ত হচ্ছে। তাই টিকাদানের সময়সূচি পুনর্বিবেচনা করা হচ্ছে। বাংলাদেশ সর্বশেষ ২০২০ সালে ক্যাম্পেইন চালিয়েছে; ২০২৪ সালে করার পরিকল্পনা থাকলেও তা হয়নি। এপ্রিলে নতুন ক্যাম্পেইন হওয়ার কথা রয়েছে। গ্যাভির সহায়তায় সারা দেশে হামের টিকাদান ক্যাম্পেইন চালু করার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।’

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী, প্রতি চার বছর অন্তর ফলোআপ হাম টিকাদান ক্যাম্পেইন পরিচালিত হয়, যাতে বাদ পড়া শিশুদের টিকার আওতায় আনা যায়। 

সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) বাইরেও বেসরকারি হাসপাতাল বা ক্লিনিকে হামের টিকা পাওয়া যায়। সাধারণত বেসরকারি পর্যায়ে এমএমআর (মিজেলস, মাম্পস, রুবেলা) টিকা দেওয়া হয়, যা হামের পাশাপাশি মাম্পস ও রুবেলা থেকেও সুরক্ষা দেয়। চলতি বছরও এমন টিকা দেওয়ার পোস্ট পাওয়া গেছে ফেসবুকে। 

টিকাদান কর্মসূচি নিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং বাংলাদেশের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের টিকা বিভাগের (ইপিআই) নিজস্ব ড্যাশবোর্ড রয়েছে, যেখানে বছরভিত্তিক বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত পাওয়া যাচ্ছে। 

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এ সংক্রান্ত ডাটাবেজ থেকে জানা যায়, অন্তত ২০১৪ সাল থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে প্রতিবছরই এই টিকার প্রথম ও দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া হয়েছে। এই হার কখনোই ৭০ শতাংশের নিচে নামেনি। তবে ২০২৫ সালের কোনো তথ্য এই ডাটাবেজে নেই। 

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের টিকা বিভাগের (ইপিআই) নিজস্ব ড্যাশবোর্ডের তথ্য বলছে, ২০১৭ সাল থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে হামের টিকাদান হার কখনোই ৮১ শতাংশের নিচে নামেনি। তবে ২০২৫ সালে এই হার দাঁড়িয়েছে ৫৬ দশমিক ৫ শতাংশে। 

তবে টিকা কার্যক্রমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তির বক্তব্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ড্যাশবোর্ডের তথ্য অসম্পূর্ণ।

অর্থাৎ, গত ৮ বছরে হামের টিকা সরকার দেয়নি বলে যে দাবি ছড়াচ্ছে তা সঠিক নয়। সুতরাং, গত আট বছরে দেশে হামের টিকা দেওয়া হয়নি বলে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুলের দাবিটি মিথ্যা।

অমিয়/