আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে ঢাকা-৯ সংসদীয় আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সাবেক কেন্দ্রীয় জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্যসচিব ডা. তাসনিম জারার নাম ও ছবি ব্যবহার করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একাধিক ভুয়া পেজ থেকে ভুয়া বিজ্ঞাপন প্রচার করা হচ্ছে।
গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে তাসনিম জারার নাম ও ছবি ব্যবহার করে একটি ভুয়া ফেসবুক পেজ থেকে যৌন শক্তিবর্ধক পণ্যের বিজ্ঞাপন প্রচারের ঘটনা ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। কতিপয় ফেসবুক ব্যবহারকারী দাবি করেন, বিজ্ঞাপনটি তাসনিম জারার নিজ উদ্যোগে প্রচার করা হয়েছে। তবে রিউমর স্ক্যানারের অনুসন্ধানে প্রমাণ মেলে, বিজ্ঞাপনটি সম্পূর্ণ ভুয়া। তাসনিম জারার পরিচয়ে ভুয়া ফেসবুক পেজ তৈরি করে তার ছবি সম্পাদনার মাধ্যমে ফটোকার্ড তৈরি করে এই বিজ্ঞাপন প্রচার করা হয়। ঘটনাটির পর থেকে বিষয়টি নজরদারিতে রাখে রিউমর স্ক্যানার।
মেটার অ্যাড লাইব্রেরি বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রায় নিয়মিতভাবেই নতুন পেজ খুলে বা পুরোনো পেজের নাম পরিবর্তন করে তাসনিম জারাকে জড়িয়ে একই ধরনের ভুয়া বিজ্ঞাপন ফেসবুকে প্রচার করা হচ্ছে। রিউমর স্ক্যানারের অনুসন্ধানে ৫০টিরও বেশি এমন পেজ শনাক্ত হয়েছে, যেগুলো তাসনিম জারার নাম ও পরিচয় ব্যবহার করে বিভিন্ন যৌন স্বাস্থ্যপণ্যের বিজ্ঞাপন দিচ্ছিল। বিশ্লেষণে এসব পণ্যের উৎস ও সংশ্লিষ্টতারও তথ্য মিলেছে।
জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগাচ্ছে অসাধু চক্র
তাসনিম জারা দেশের সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম আলোচিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। চিকিৎসক হিসেবে পেশা শুরু করলেও বর্তমানে তিনি রাজনীতিতেও সক্রিয় ভূমিকা রাখছেন। ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস সম্পন্ন করার পর তিনি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে এভিডেন্স-বেইজড হেলথকেয়ার বিষয়ে মাস্টার্স করেন এবং ডিস্টিংশন অর্জন করেন। পাশাপাশি যুক্তরাজ্যের রয়্যাল কলেজ অব অবস্টেট্রিশিয়ানস অ্যান্ড গাইনোকোলজিস্টস থেকে ডিআরসিওজি ডিগ্রিও অর্জন করেন।
বাংলাভাষীদের জন্য প্রমাণভিত্তিক স্বাস্থ্যতথ্য সহজভাবে উপস্থাপনের লক্ষ্য নিয়ে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘সহায় হেলথ’। করোনাভাইরাস মহামারির সময় সাধারণ মানুষের জন্য সহজ ভাষায় স্বাস্থ্যবিষয়ক ভিডিও তৈরি করে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পান তিনি। বর্তমানে তার ফেসবুক পেজে প্রায় ৬৩ লাখ ফলোয়ার এবং ইউটিউবে ৪৮ লাখ সাবস্ক্রাইবার রয়েছে। তিনি এখনও নিয়মিতভাবে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে স্বাস্থ্যবিষয়ক কনটেন্ট তৈরি করে সচেতনতা ছড়িয়ে যাচ্ছেন।
২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর তাসনিম জারা জাতীয় নাগরিক পার্টির সিনিয়র যুগ্ম সদস্যসচিব হিসেবে রাজনীতিতে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত হন। এরপর থেকে তিনি পদযাত্রা ও জনসম্পৃক্ত কর্মসূচির মাধ্যমে প্রান্তিক মানুষের কাছেও পৌঁছে যান এবং রাজনৈতিক পরিসরেও উল্লেখযোগ্য জনপ্রিয়তা অর্জন করেন।
এই জনপ্রিয়তাকেই এখন কাজে লাগাচ্ছে একটি অসাধু চক্র। রিউমর স্ক্যানারের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, তার নাম ও ছবি ব্যবহার করে ভুয়া ফেসবুক পেজ খুলে ওজন কমানো, উচ্চতা বাড়ানো, পাইলস নিরাময় এবং যৌন শক্তিবর্ধক পণ্য বিক্রির বিজ্ঞাপন চালানো হচ্ছে।
যেভাবে চলছে এসব প্রচারণা
এমন ৫০টি ভুয়া ফেসবুক পেজ শনাক্ত করা হয়েছে, যেখানে নিয়মিতভাবে তাসনিম জারার নাম ও ছবি ব্যবহার করে এসব স্বাস্থ্যপণ্য প্রচার করা হচ্ছে। তার জনপ্রিয়তা ও বিশ্বাসযোগ্যতাকে কাজে লাগিয়ে এই পেজগুলো বিজ্ঞাপন ও পণ্যের বিক্রির মাধ্যমে অনলাইনে আর্থিক লাভের চেষ্টা করছে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এসব পেজের মধ্যে কিছু একেবারে নতুন করে তাসনিম জারার নামে খোলা হয়েছে, আবার কিছু পুরোনো পেজের নাম পরিবর্তন করে তার পরিচয়ে রূপান্তর করা হয়েছে। নাম পরিবর্তনের পর পেজের পুরোনো পোস্টগুলোও সম্পাদনা করে সেখানে তাসনিম জারার ছবি যুক্ত করা হয়। এরপর এসব পোস্ট অর্থের বিনিময়ে ফেসবুকে বিজ্ঞাপন হিসেবে প্রচার করা হয়, যেন ব্যবহারকারীরা তা বিশ্বাসযোগ্য বলে মনে করেন।
রিউমর স্ক্যানার প্রতিটি পেজের একটি পোস্ট বিশ্লেষণ করে দেখেছে, কোন পণ্য প্রচার করা হচ্ছে এবং সেখানে কী ধরনের উপাদান ব্যবহার হয়েছে। ৫০টি পোস্টের মধ্যে ৩১টিতে ‘Elite Forever’ নামের পণ্যের প্রচার চালানো হয়েছে। ‘Elite Pure’ ৬টি, ‘Slim & Care Juice’ ৭টি, ‘Piles Care’ ৪টি এবং ‘Slim Body’ পণ্য ২টি পেজে প্রচার করা হয়েছে।
এই ৫০টি পেজে মোট ৩ লাখ ৭২ হাজার ফলোয়ার রয়েছে। এর মধ্যে একটি পেজের ফলোয়ার সংখ্যা ৯৪ হাজার। ৫০টি পোস্টে মোট ১ লাখ ৬২ হাজার প্রতিক্রিয়া, ৮ হাজার মন্তব্য এবং ৩ হাজার শেয়ার পাওয়া গেছে। এর মধ্যে একটি পোস্টেই ৬১ হাজার প্রতিক্রিয়া রেকর্ড করা হয়েছে।
বিষয়বস্তু বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ৩৩টি পোস্টে তাসনিম জারার ছবি ব্যবহার করে ফটোকার্ড তৈরি করা হয়েছে, আর ১৭টি পোস্টে তার স্বাস্থ্যবিষয়ক ভিডিও সম্পাদনা করে বিজ্ঞাপন হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।
বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়াতে বট কমেন্টের ব্যবহার
মেটা প্ল্যাটফর্মে প্রচারিত এসব বিজ্ঞাপনকে বিশ্বাসযোগ্য দেখাতে পরিকল্পিতভাবে বট অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করা হচ্ছে। বিজ্ঞাপন পোস্টগুলোর নিচে কৃত্রিমভাবে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্য তৈরি করে ব্যবহারকারীদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা চলছে। যাতে সাধারণ ব্যবহারকারীদের মনে হয় পণ্যটি জনপ্রিয় ও কার্যকর।
দুটি ভাইরাল বিজ্ঞাপনসংবলিত পোস্ট বিশ্লেষণ করে রিউমর স্ক্যানার ১৮টি বট অ্যাকাউন্ট থেকে করা ২০টি মন্তব্য শনাক্ত করেছে। এই অ্যাকাউন্টগুলো চিহ্নিত করতে ফেসবুক প্রোফাইলের বয়স, বন্ধুসংখ্যা ও প্রোফাইল ছবির উৎস বিবেচনা করা হয়েছে। দেখা গেছে, সবগুলো অ্যাকাউন্টই নতুন এবং অধিকাংশের বন্ধুসংখ্যা ১০০-এর কম। মাত্র চারটি অ্যাকাউন্টে বন্ধু সংখ্যা ১০০-এর বেশি হলেও সর্বাধিক ৩৭৩ পর্যন্ত সীমাবদ্ধ।
প্রোফাইল ছবিগুলো বিভিন্ন উৎস থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। এর মধ্যে ৫টি ভারতীয় ডেটিং ওয়েবসাইট থেকে, ৭টি অ্যালামি, আইস্টক ও ফ্রিপিকের মতো স্টক ওয়েবসাইট থেকে এবং ৬টি ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ও লিংকডইনের অন্য ব্যবহারকারীর প্রোফাইল থেকে নেওয়া। এমনকি একটি অ্যাকাউন্টের প্রোফাইল ছবি ভারতীয় গণমাধ্যম দ্য সিয়াসাত ডেইলির ওয়েবসাইট থেকে নেওয়া হয়েছে।
আরও লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো, ৮টি অ্যাকাউন্ট নিজেদের প্রোফাইলেও একই ধরনের প্রচারণামূলক মন্তব্য পোস্ট করেছে। এ ছাড়া ২টি অ্যাকাউন্ট থেকে উভয় বিজ্ঞাপন পোস্টেই মন্তব্য করা হয়েছে।
বিজ্ঞাপন দেখে আগ্রহী হচ্ছেন অনেকে
এসব বিজ্ঞাপন মানুষ কতটা বিশ্বাস করছে বা সেগুলো মানুষের মনে আগ্রহ তৈরি করছে কি-না, তা বোঝার জন্য রিউমর স্ক্যানার চারটি বিজ্ঞাপনসংবলিত পোস্টের মন্তব্য বিশ্লেষণ করেছে। এর জন্য ৩০টি বাস্তব ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে করা মন্তব্য বাছাই করা হয়। বট অ্যাকাউন্টের উপস্থিতি আগেই শনাক্ত হওয়ায় এই ধাপে কেবল আসল ব্যবহারকারীদের মন্তব্য বিবেচনা করা হয়।
বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ৩০ জন মন্তব্যকারীর মধ্যে ২৫ জনই এসব পণ্যের প্রতি আগ্রহ দেখিয়েছেন। ২ জন কৌতূহলী মনোভাব প্রকাশ করেছেন, একজন ইতিবাচক ধারণা দিয়েছেন এবং একজন নেতিবাচক অভিজ্ঞতা শেয়ার করেছেন।
যারা আগ্রহ দেখিয়েছেন, তাদের অধিকাংশই পণ্যের দাম, কার্যকারিতা, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, অর্ডারের নিয়ম এবং তাসনিম জারার চেম্বারের ঠিকানা সম্পর্কে জানতে চেয়েছেন। কৌতূহলী মন্তব্যকারীরা মূলত সেবনপদ্ধতি ও ব্যবহারপূর্ব ফলাফল নিয়ে প্রশ্ন করেছেন। ইতিবাচক মন্তব্যগুলোর মধ্যে একজন জানিয়েছেন, পণ্যটির প্রয়োজন না থাকলেও তিনি তাসনিম জারাকে ধন্যবাদ জানাতে চান। অপর একজন জানিয়েছেন, তিন দিন আগে অর্ডার করেও এখনো পণ্যটি পাননি। অন্যদিকে, একমাত্র নেতিবাচক মন্তব্যকারী জানিয়েছেন, পাঁচ দিন ব্যবহার করার পরও কোনো ফলাফল পাননি।
এআই প্রযুক্তির অপব্যবহার
তাসনিম জারাকে ঘিরে পরিচালিত প্রচারণাগুলোর মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ব্যবহারও পাওয়া গেছে। ১৫ সেপ্টেম্বর তাসনিম জারার নামে পরিচালিত একটি ভুয়া ফেসবুক পেজ থেকে ‘Elite Forever’ নামের একটি পণ্যের বিজ্ঞাপনচিত্র প্রকাশ করা হয়। ওই ছবিতে তাকে পণ্যটি হাতে ধরে থাকতে দেখা যায়। ছবিটি ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করলে এর ডান কোণে গুগলের জেমিনি এআইয়ের জলছাপ দেখা যায়। পরবর্তীতে ‘Md Nayemur Rahman Ferdaus’ নামের এক ফেসবুক ব্যবহারকারীর প্রোফাইলে ছবিটির আসল সংস্করণ পাওয়া যায়। মূল ছবিতে তাসনিম জারার হাতে কোনো পণ্য ছিল না। অর্থাৎ, ছবিটি এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে সম্পাদনা করা হয়েছে।
এমন আরেকটি প্রচারণায়ও এআই ব্যবহারের প্রমাণ মেলে গত জুলাইয়ে। সে সময় মেটা অ্যাড লাইব্রেরিতে ‘Dr. Thasin Zara’ নামের একটি ফেসবুক পেজ থেকে তাসনিম জারার ছবিসহ অনুরূপ পণ্যের বিজ্ঞাপন শনাক্ত হয়। পেজটির নাম তার নামের সঙ্গে মিল রেখে তৈরি করা হলেও বানানে সামান্য পরিবর্তন রাখা হয়। পেজটির প্রোফাইল ছবির বিশ্লেষণে দেখা যায়, সেটিও তাসনিম জারার একটি ভিন্ন ছবির সাহায্যে এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে তৈরি করা হয়েছে। এআই কনটেন্ট শনাক্তকারী প্ল্যাটফর্ম সাইটইঞ্জিনে ছবিটি পরীক্ষা করে দেখা যায়, এটি কৃত্রিমভাবে তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা ৯৯ শতাংশ।
মেটার নীতিমালা লঙ্ঘন করেই চলছে এসব বিজ্ঞাপন
মেটা প্ল্যাটফর্মে কোনো বিজ্ঞাপন প্রকাশের আগে নির্দিষ্ট যাচাই প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়। জমা দেওয়া প্রতিটি বিজ্ঞাপন প্রথমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্ক্যান করে দেখা হয়, তা নীতিমালা অনুযায়ী অনুমোদনযোগ্য কি-না। প্রয়োজনে বিজ্ঞাপনগুলো ম্যানুয়াল রিভিউয়ের মাধ্যমে যাচাই করা হয়। সাধারণত ২৪ ঘণ্টার মধ্যে অনুমোদন বা বাতিলের সিদ্ধান্ত জানানো হয়, তবে প্রকাশের পরও যেকোনো বিজ্ঞাপন পুনরায় পর্যালোচনার আওতায় আসতে পারে।
মেটার বিজ্ঞাপন নীতিমালার ‘Unacceptable Business Practices (অগ্রহণযোগ্য ব্যবসায়িক আচরণ)’ অংশে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, বিজ্ঞাপনদাতারা এমন কোনো পণ্য, সেবা বা অফার প্রচার করতে পারবেন না, যা প্রতারণামূলক বা বিভ্রান্তিকর পদ্ধতিতে পরিচালিত হয়। বিশেষত, কোনো বিখ্যাত ব্যক্তির নাম, ছবি বা পরিচয় ব্যবহার করে মানুষের বিশ্বাস অর্জনের উদ্দেশ্যে ভুয়া বা বিভ্রান্তিকর বিজ্ঞাপন চালানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
এই ধরনের প্রচারণাকে মেটা নীতিমালায় ‘celeb bait’ বা সেলিব্রিটি প্রলুব্ধকরণ বিজ্ঞাপন হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে। বিভ্রান্তিকর এই বিজ্ঞাপন শনাক্তে মেটা ফেস রেকগনিশন প্রযুক্তি ব্যবহার করে। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে সন্দেহজনক বিজ্ঞাপনের ছবিগুলো সংশ্লিষ্ট সেলিব্রিটির প্রোফাইল বা অনুমোদিত মিডিয়া উপস্থিতির সঙ্গে তুলনা করা হয়, যাতে কোনো বিজ্ঞাপনে কারও ছবি বা পরিচয়ের অপব্যবহার শনাক্ত করা যায়।
তবুও মেটা অ্যাড লাইব্রেরিতে নিয়মিতভাবে তাসনিম জারার নাম ও ছবি ব্যবহার করে বিভিন্ন স্বাস্থ্যপণ্যের বিজ্ঞাপন প্রকাশিত হচ্ছে। এতে কেবল মেটার নিজস্ব নীতিমালা লঙ্ঘন হচ্ছে না, বরং তাদের বিজ্ঞাপন যাচাই ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন উঠছে।
নিজেদের সরকারি পেজ বলে দাবি
গত বছরের ১০ সেপ্টেম্বর এমন বিজ্ঞাপন প্রচার করা দুটি ফেসবুক পেজে পুলিশের হাতে আটক হওয়া এক ব্যক্তির ছবি প্রচার করে দাবি করা হয়, ‘আমাদের পেজ হলো সরকারি পেজ, তাই এইখানে কখনো মজা করার চেষ্টা করা ঠিক হবে না। মিথ্যা অর্ডার দিয়ে ২ বার প্রতারণা করেছে এবং ডেলিভারি ম্যানকে হয়রানি করেছে গত এক সপ্তাহ। আজ ১ সপ্তাহ পর তার পরিণতি।’ তবে ওই ছবির সন্ধান পাওয়া যায় চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের ফেসবুক পেজে গত বছরের ৮ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত একটি পোস্টে।
এ প্রচারণা নতুন নয়
২০২৩ সালের নভেম্বরে তাসনিম জারা তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে একটি পোস্টে জানান, তার নাম ও ছবি ব্যবহার করে ওজন কমানো, মোটা হওয়ার, পাইলসের চিকিৎসা, লম্বা হওয়ার ও যৌন রোগ নিরাময়ের মতো নানা পণ্যের বিজ্ঞাপন প্রচার করা হচ্ছে অনলাইনে। তিনি লেখেন, এসব প্রতারকদের কাজ এবং তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে তিনি সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান, কারণ এ ধরনের প্রতারণামূলক পণ্য শুধু আর্থিক নয়, শারীরিক ক্ষতিরও কারণ হতে পারে।
অর্থাৎ, তাকে জড়িয়ে বিভ্রান্তিকর বিজ্ঞাপন প্রচার নতুন নয়। তবে আগের তুলনায় এখন এ ধরনের বিজ্ঞাপনের সংখ্যা মেটা অ্যাড লাইব্রেরিতে উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে এবং প্রায় প্রতিনিয়তই তার নাম ব্যবহার করে নতুন নতুন পেজের বিজ্ঞাপন দেখা যাচ্ছে।
এসব পণ্যের পেছনে কারা
এসব বিজ্ঞাপনে প্রচারিত পণ্যগুলোর পেছনে ‘Elite Corporation’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। পণ্যগুলোর মোড়কেও এই প্রতিষ্ঠানের নাম উল্লেখ রয়েছে। বিজ্ঞাপনগুলোর লিংকে ক্লিক করলে ব্যবহারকারীরা বিভিন্ন ওয়েবসাইটে চলে যান, যেখানে পণ্যগুলো বিক্রির জন্য প্রদর্শিত হচ্ছে। এ ছাড়া তাসনিম জারার নাম ও ছবি ব্যবহার করে তৈরি একাধিক ভুয়া ওয়েবসাইট থেকেও একই ধরনের পণ্য বিক্রি করা হচ্ছে।
ওয়েবসাইটগুলোতে দাবি করা হয়েছে, পণ্যগুলো বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) কর্তৃক অনুমোদিত। সেখানে একটি নিবন্ধন সনদপত্রও সংযুক্ত রয়েছে, যেখানে ‘এলিট কর্পোরেশন’ নামের প্রতিষ্ঠানের ঠিকানা দেওয়া আছে চৌধুরীবাড়ি, শিকারপুর, পসছিত কুয়াইশ, হাটহাজারী, চট্টগ্রাম। সনদটি ২০২৪ সালের ২৩ এপ্রিল ইস্যু করা হয়েছে এবং এর মেয়াদ ২০২৭ সালের ২২ এপ্রিল পর্যন্ত। সনদে থাকা কিউআর কোড স্ক্যান করলে বিএসটিআইয়ের ওয়েবসাইটেও একই সনদ পাওয়া যায়। ওই সনদের তৃতীয় পৃষ্ঠায় ‘Elite Pure’ এবং ‘Elite Premium Daily Care’ নামের দুটি পণ্যের অনুমোদনের তথ্য দেখা যায়।
পরে অনুসন্ধানে ‘এলিট কর্পোরেশন’ নামের দুটি ওয়েবসাইট শনাক্ত করা হয়েছে: elitecorporationbd.com এবং elitecorpo.com। প্রথম ওয়েবসাইটে তাসনিম জারার ছবি ব্যবহার করে প্রচারিত বিজ্ঞাপনগুলোর মধ্যে ‘Elite Forever’, ‘Elite Pure’ এবং ‘Piles Care’ নামের পণ্যগুলো তালিকাভুক্ত অবস্থায় পাওয়া গেছে। দ্বিতীয় ওয়েবসাইটে কেবল ‘Elite Pure’ নামের পণ্যটি তালিকাভুক্ত রয়েছে।
প্রথম ওয়েবসাইটে কোনো যোগাযোগের তথ্য না থাকায় সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। দ্বিতীয় ওয়েবসাইটে দেওয়া ইমেইল ঠিকানায় যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
এসজি/