আমি ছোটগল্পও লিখি। করোনার সময় যখন বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ছিল, তখন আমি পুরো সময়টা লেখালেখিতে ব্যয় করেছি। আমি স্কুল-কলেজে সব সময় লেখালেখি করতাম এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়েও অনেক লিখেছি। এবারের বইমেলায় আমার তৃতীয় গল্পগ্রন্থের বই ‘অবগাহন’ প্রকাশিত হয়েছে। এর আগে দুটি বই বের হয়েছে। এর মধ্যে ‘লকডাউন মেমরি লেন’ অন্যতম। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলা সাহিত্যের গতি-প্রকৃতি গ্রন্থটিতে ১৫ জন অধ্যাপকের লেখার সঙ্গে আমার লেখাও প্রকাশিত হয়েছে।…
১৯৬৩ সালের ১ এপ্রিল কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন বঙ্গভাষা ও সাহিত্য-সাধনার লেখক ড. সুচরিতা বন্দ্যোপাধ্যায়। পিতা উমাপদ ব্যানার্জি ও মাতা মীনাক্ষী ব্যানার্জি। তার শৈশব, লেখাপড়া লেখক হিসেবে বেড়ে ওঠা সাহিত্য-সাধনার উজ্জ্বল আলোকচ্ছটা সবই পেয়েছেন কলকাতার আলো-বাতাস-মাটি থেকে। ছাত্রছাত্রী ও সাহিত্যপ্রেমীদের কাছে দুই বাংলায় তিনি সমান জনপ্রিয়। তিনি ১৯৮৩ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় বিএ (অনার্স) সম্পন্ন করেন। ১৯৮৫ সালে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একই বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৯১ সালে একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমফিল সম্পন্ন করেন। ২০০০ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভাষাতত্ত্বের ওপর পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গভাষা ও সাহিত্য বিভাগে অধ্যাপনায় নিয়োজিত আছেন কুড়ি বছরের অধিক কাল। বাংলা ভাষার সাহিত্যসম্ভারে তিনি এক ফুটন্ত গোলাপ। শিক্ষক হিসেবে তিনি ছাত্রছাত্রীদের কাছে রোল মডেল। কারণ তিনি ভীষণ সময়ানুবর্তী ও নিয়মানুবর্তী একজন শিক্ষক। গবেষকদের সঙ্গে তার রয়েছে প্রগাঢ় বন্ধুত্ব। তিনি একটা কথা তার ছাত্রছাত্রীদের বলেন, ‘তোমাকে শ্রদ্ধেয় হয়ে উঠতে হবে, যা ভালোবাসার মাধ্যমে
অর্জন করতে হয়। ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে অদ্ভুত দেওয়া-নেওয়ার বিষয় আছে, যেটা খুব কম শিক্ষকের মধ্যে আছে। পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, ভালোবাসা ও মমত্ববোধের মাধ্যমে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের বোঝাপড়া সহজ করতে হয়। তাহলেই আদর্শবান শিক্ষক হয়ে ওঠা যায়।’
আপনি এখন কী লিখছেন?
আমি এখন কলকাতার উনিশ থেকে একবিংশ শতক পর্যন্ত কলকাতা যে বদলে যাচ্ছে, এটা নিয়ে লিখছি। আধুনিক কবিতার ওপরও কাজ করছি। ইউজিসির প্রকল্প নিয়েও কাজ চলছে। এগুলোর কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর- নামটা উচ্চারণ করলেই আমার মনে পড়ে যায় তারই ‘অচলায়তন’ নাটকের একটি কথা- শোনপাংশুদের দল যে কথা বলেছিল দাদাঠাকুর সম্পর্কে ‘একলা মোদের হাজার মানুষ’ চরিত্র সম্পর্কে বলা কথাগুলো কী আশ্চর্যভাবে মিলে যায় স্বয়ং স্রষ্টা সম্পর্কেও। তার নামেই যে আছে সূর্য-সংকেত, তাই তার প্রতিভার সৌরকরে আমরা রূপময় পৃথিবীকে যেমন প্রত্যক্ষ করি, তেমনি তার কবিতার ভাবময়তায় আমাদের অনুভূতিজগৎ জেগে ওঠে। মেঘের মতোই তাঁর মনন ও শিল্পের সত্যস্বরূপ দেশের সীমানা পেরোনো আন্তর্দেশিক এক বিষয়। আর সত্যিই তো ‘গীতাঞ্জলি’ বাংলা সাহিত্যে যুগান্তকারী সেই গ্রন্থ, যার সূত্র ধরেই রবীন্দ্রনাথের নোবেলপ্রাপ্তি ও বিশ্বজয়। আমি তাই লেখার মধ্যে রবীন্দ্রনাথকে প্রতিনিয়ত আবিষ্কার করে চলেছি। রবীন্দ্র উপন্যাস নিয়ে ইতোমধ্যে আমার সম্পাদিত একটি বই প্রকাশিত হয়েছে ‘সৃষ্টির অন্দরে স্রষ্টার অন্তরে’।
আমি ছোটগল্পও লিখি। করোনার সময় যখন বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ছিল, তখন আমি পুরো সময়টা লেখালেখিতে ব্যয় করেছি। আমি স্কুল-কলেজে সব সময় লেখালেখি করতাম এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়েও অনেক লিখেছি। এবারের বইমেলায় আমার তৃতীয় গল্পগ্রন্থের বই ‘অবগাহন’ প্রকাশিত হয়েছে। এর আগে দুটি বই বের হয়েছে। এর মধ্যে ‘লকডাউন মেমরি লেন’ অন্যতম। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলা সাহিত্যের গতি-প্রকৃতি গ্রন্থটিতে ১৫ জন অধ্যাপকের লেখার সঙ্গে আমার লেখাও প্রকাশিত হয়েছে।
আরেকটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছে, তা হলো আধুনিক বাংলা ছোটগল্পের ওপর। সেটিও সম্পাদিত গ্রন্থ। এখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও গবেষকদের নিয়ে প্রায় ১০০টির ওপর গল্প নেওয়া হয়েছে। লেখার কাজ শেষ হয়েছে, আগামী বৈশাখে প্রকাশ পাবে।
আপনি এখন কী পড়ছেন?
আমি সব ধরনের বই পড়তে ভালোবাসি। বাংলা ভাষাকে ভালোবাসার কারণে বাংলা বেশি পড়তে ভালো লাগে। এ জন্য এ বিষয়ে পড়াশোনাটা এখন বেশি। কলেজে অধ্যাপনা করেছি প্রায় সাড়ে ৯ বছর। আজ প্রায় কুড়ি বছরেরও বেশি হয়ে গেল কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রছাত্রী পড়াচ্ছি। অনার্স থেকে পিএইচডি সব জায়গায় আমার যোগসূত্র রয়েছে, সে জন্য আমাকে প্রচুর পড়তে হয়। সেটি একাডেমিক পড়াশোনা। তবে এর বাইরে আজকাল একটু হালকা বই পড়তে ভালো লাগে। কারণ পড়াশোনার জন্য অনেক রেফারেন্স ও ভারী বই পড়তে হয়। তা ছাড়া আমার থ্রিলার বই পড়তে ভালো লাগে। সাম্প্রতিক সময় নিয়ে যারা লিখছেন, তাদের লেখা পড়তে আমার আগ্রহ। বদলে যাওয়া কলকাতা, করপোরেট কলকাতা নিয়ে পড়ছি। বিশেষত ট্রান্সজেন্ডারদের নিয়ে লেখা সামনে পেলেই পড়ে ফেলি। যে জায়গাগুলোতে আমার অপূর্ণতা রয়েছে, অজানা রয়েছে, সেই বিষয়গুলো জানার আগ্রহ দিনে দিনে বাড়ছে। ইদানীং কল্পবিজ্ঞানের বইও পড়ার তালিকায় যুক্ত হয়েছে।
খবরের কাগজ সাহিত্যপাতা ‘সুবর্ণরেখা’ এগিয়ে যাক আপন ভুবনে- লেখক হয়ে এই প্রত্যাশা রাখছি।
সাক্ষাৎকার: ড. সারিয়া সুলতানা, সহকারী সম্পাদক, খবরের কাগজ