ঢাকা ৭ আষাঢ় ১৪৩৩, রোববার, ২১ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
কুকুরেইয়ার ‘জেগে ওঠার ডাক’ স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে নামার আগে ব্রাজিল শিবিরে দুঃসংবাদ শেষ মুহূর্তের রোমাঞ্চে আইভরি কোস্টকে হারাল জার্মানি বিশ্বকাপ জয়ে যে দলকে এগিয়ে রাখলেন ইব্রাহিমোভিচ দুই গোল বাতিল, প্রথমার্ধে পিছিয়ে জার্মানি আইভরি কোস্টের মুখোমুখি জার্মানি, দেখুন একাদশ জোড়া রেকর্ডের সামনে মেসি সুইডেনকে ৫-১ গোলে উড়িয়ে দিল নেদারল্যান্ডস দ্বিতীয় ম্যাচের আগে ইংল্যান্ড শিবিরে ধাক্কা বিশ্ব বাবা দিবস আজ ধর্ষণের অভিযোগে ইমামকে গণপিটুনি, পরে পুলিশে হস্তান্তর ব্রায়ান ব্রোবির জোড়া গোলে প্রথমার্ধে এগিয়ে নেদারল্যান্ডস অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে নামার আগে আর্জেন্টিনা শিবিরে দুঃসংবাদ এক দিনে দ্রুততম দুই গোল নারী টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ: পাকিস্তানকে ২৩ রানে হারাল বাংলাদেশ উল্লাসের পরদিন ৪০ টন স্মৃতি ছুটিতে গ্রামে গিয়ে ডাকাত হামলায় আহত এসিল্যান্ডসহ ৬ জন মেসির ফাউল: ফিফায় আলজেরিয়ার নালিশ ঈশ্বরগঞ্জে আ.লীগের সাবেক এমপির ফ্যাক্টরিতে লুটপাট ১১ মামলার আসামি বহিষ্কৃত ছাত্রদল নেতা বুলবুল আটক বম সম্প্রদায়ের এক অসুস্থ নারীকে হেলিকপ্টারযোগে উদ্ধার করল সেনাবাহিনী উত্তরায় ভূমি গ্যালারিতে চিত্রপ্রদর্শনী দেখে মুগ্ধ মার্কিন রাষ্ট্রদূত রোনালদো-মেসিদের মতো খেলো, অলিম্পিকে ভালো ফল চাই: প্রধানমন্ত্রী ইরানের সঙ্গে চুক্তি করতে গোপনে মরিয়া ছিলেন ট্রাম্প প্রয়োজন হলে প্রধানমন্ত্রী ভারত সফরেও যাবেন: পররাষ্ট্র উপদেষ্টা রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে যুক্তরাজ্যকে নেতৃত্বের ভূমিকা অব্যাহত রাখার আহ্বান পররাষ্ট্রমন্ত্রীর অসাধারণ কৃতিত্ব: ৮ মাসে কোরআন হিফজ, সংবর্ধিত আল-আমীন ব্রাজিল ম্যাচ জেতায় মাথা ন্যাড়া করলেন আর্জেন্টিনার সমর্থক ফরিদপুরে ‘গে গ্রুপ’ ইস্যুতে ৩ জন আটক জামায়াত গণতন্ত্র বিশ্বাস করে না: মির্জা ফখরুল

জসীম উদ্‌দীন ও বাংলা-বাঙালির মুক্তিযুদ্ধ

প্রকাশ: ১৪ মার্চ ২০২৫, ১১:৪২ এএম
জসীম উদ্‌দীন ও বাংলা-বাঙালির মুক্তিযুদ্ধ
পল্লিকবি জসীম উদ্‌দীন

জসীম উদ্‌দীন তার সাহিত্য নির্মাণে অনেক বড় ভূমিকা পালন করেছেন। তার লেখায় দেশ ও দেশের মানুষের কথা এসেছে, তেমনি মুক্তিযুদ্ধনির্ভর লেখাগুলোও সমান গুরুত্বপূর্ণ। 

এগুলো পাঠ করলে মুক্তিযুদ্ধের ভয়াবহতা নতুন প্রজন্ম নতুন করে আবিষ্কারের সুযোগ পাবে।... 

জসীম উদ্‌দীন (১৯০৩-১৯৭৬) বাংলা ও বাঙালির কথা আপন ভাষায় কাব্য রচনা করে বিখ্যাত হয়ে আছেন। বাংলা কবিতায় দেশাত্মবোধ দেশপ্রেম ও রাজনৈতিক সচেতনতা সম্পর্কে সম্পূর্ণ সচেতন ছিলেন তিনি। তাকে বলা হয়ে থাকে পল্লীকবি। কিন্তু তিনি খাঁটি বাঙালি কবি; যিনি দেশ ও মাটির সঙ্গে মর্মে মর্মে মিশে রয়েছেন। তার প্রত্যেকটি চরিত্রের দেহে মাটি, ঘাস আর নদীর ঘ্রাণ লেগে আছে। গ্রামীণ মানুষকে হঠাৎ করে আধুনিক বানানোর কমপ্লেক্স তার ভেতরে কাজ করেনি। তার কবিতায় কোনো তাত্ত্বিক গভীরতা নেই, যা আছে তা এ দেশের বাঙালি পাঠককে আকৃষ্ট না করে পারেনি। সাধারণ মানুষের মাধুর্যময় চিত্রকল্প উপস্থাপন করতে গিয়ে তার কবিতা হয়ে উঠেছে গেঁয়ো যোগীর মতো। তাতে ক্ষতি নেই বরং তার ফলে জসীম উদ্‌দীনের কবিতার স্বাতন্ত্র্য সহজেই চোখে পড়ে; ‘এইখানে তোর দাদীর কবর ডালিম গাছের তলে/ তিরিশ বছর ভিজিয়ে রেখেছি দুই নয়নের জলে।’ রবীন্দ্রনাথের হাতেও ফুটে উঠেছে বাংলাদেশের গ্রাম, গ্রামীণ চিত্রকল্প; ‘আমাদের ছোট নদী চলে বাঁকে বাঁকে/ বৈশাখ মাসে তার হাঁটু জল থাকে।’ জসীম উদ্‌দীন রবীন্দ্রপরিমণ্ডলে আবর্তিত হয়েও একজন আলাদা কবি। তার আলাদা ঢঙের জন্যই রবীন্দ্রনাথ জসীম উদ্‌দীনের কবিশক্তিকে স্বীকার করেছেন, প্রশংশা করেছেন। বাংলা সাহিত্যে লোককবি মাটি ও মানুষের কথাকে যারা ফোক অভিধা দিয়ে থাকেন, অর্থাৎ তথাকথিত নাগরিক সমাজের এলিট বর্গ। দেশ ও দেশের মানুষের ইতিহাস ঐতিহ্য যারা চর্চা করেন, তাদের একটি বিশেষ বর্গ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। 

আচার্য দীনেশ চন্দ্র সেন তাকে বাংলার পল্লীগীতি, লোকসাহিত্য সংগ্রহের দায়িত্ব দিয়েছিলেন। তিনি সেগুলো সংগ্রহ করতে গিয়ে সাধারণ মানুষের সংস্পর্শে আসেন। এভাবে তিনি নির্মাণ আর সৃষ্টি করেছিলেন দেশের ইতিহাস-ঐতিহ্য। কবি হিসেবে দেশের মানুষের প্রতি দায় ও দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন। দীনেশ চন্দ্র সেন লিখেছেন; ‘‘আমি হিন্দু, আমার কাছে বেদ পবিত্র, ভগবত পবিত্র। কিন্তু ‘সোজন বাদিয়ার ঘাট’ পুস্তকখানি তাহার চাইতেও পবিত্র। কারণ ইহাতে আমার বাংলাদেশের মাটির মানুষগুলির কাহিনী আছে।’’ তার ‘রাখালী’, নক্সী কাঁথার মাঠ’, বালুচর, ধানখেত, সোজন বাদিয়ার ঘাট, রঙ্গিলা নায়ের মাঝি’ প্রভৃতি রচনা করেন। যেসব মানুষকে তিনি জানতেন, তারা সবাই ছিলেন মাটির সঙ্গে বাঁধা। সমকালে কলকাতাকেন্দ্রিক সাহিত্যবোদ্ধাদের মনোযোগ পেয়েছিলেন। যাকে বাদ দিলে, যাকে টান দিলে শেকড়শুদ্ধ উঠে আসে তেমনি আমাদের ঐতিহ্য আর আধুনিকতা। সেই কারণে আমরা উত্তর-আধুনিকদের ধারণাকেও দূরে সরিয়ে রাখি।  

যেখানে জসীম উদ্‌দীনের কবিসত্তাই আমাদের কাছে পুরানো- সেখানে মহান মুক্তিযুদ্ধনির্ভর তার সৃষ্টিকর্ম তো আড়ালে থেকেই যাবে, এটি স্বাভাবিক। ‘একুশের কবিতা’ নামক তার যে কবিতা তা এখনো একুশের মহৎ কবিতাগুলোর মতোই আধুনিক ও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন নামে-বেনামে তিনি অনেক লেখা লিখেছিলেন। তা দেশের গণ্ডি পেরিয়ে রাশিয়া, আমেরিকা, ভারতসহ বাংলা ও অন্যান্য ভাষায় অনূদিত হলে স্বাধীনতা আন্দোলনের স্বপক্ষে অবদান রাখতে সক্ষম হয়েছিল। একজন দেশপ্রেমিক শিল্পীর হৃদয়ে রক্তক্ষরণ। মহৎ যেকোনো শিল্পী দেশের দুর্দিনে নীরব থাকতে পারেননি। কবি-সাহিত্যিকদের তাদের হাতের কলমকেই যুদ্ধাস্ত্র করে কাঁপিয়ে দেন শত্রুশিবির। সৈয়দ হক বিদেশে, আল মাহমুদ, জহির রায়হান পশ্চিমবঙ্গে থেকে যুদ্ধ চালিয়ে যান, তেমনি শামসুর রাহমান কিংবা জসীম উদ্‌দীন দেশের মধ্যে থেকে জীবন বাজি রেখে দেশের মাটিতে যুদ্ধ করেন। জাতির জীবনে এ এক মহত্তম ঘটনা। বাস্তবতার প্রেক্ষিতে এসব কবিতা মুক্তিযুদ্ধনির্ভর উৎকৃষ্ট দলিল। বাংলার ঋতুবৈচিত্র্যহারা রূপসী বাংলায় আজ খানসেনাদের নির্মম অত্যাচারের অনন্য করুণ ছবি আঁকেন কবি। 

সে বাঙলা আজি বক্ষে ধরিয়া দগ্ধ গ্রামের মালা
রহিয়া রহিয়া শিহরিয়া উঠে উগরি আগুন জ্বালা
দস্যু সেনারা মরণ-অস্ত্রে বধি ছেলেদের তার 
সোনার বাঙলা বিস্তৃত এক শ্মশান কারাগার। [কবির নিবেদন]

পাকিস্তানিদের নির্মম বর্বরতা তিনি ‘নিষ্ঠুর এজিদের কারাগার’ হিসেবে একে ভাঙতে চেয়েছেন। আবার ‘ইসলামী ভাই’ কবিতায় তিনি পূর্ব-পশ্চিম একই ধর্ম বন্ধনে আবদ্ধ একথা বলতে তিনি ভোলেননি। কোরআন এক, রসুল এক এবং এদিক দিয়ে তিনি পশ্চিম পাকিস্তানিদের ভাই জ্ঞান করেছেন- ‘আপেল আনার সঙ্গে এনেছে’ মনে করে সরল বিশ্বাসে। সহসাই ভুল ভাঙে চিরকালীন সহজ-সরল বাঙালিদের। এ দেশীয়দের শয়তানরা ধর্মের অপব্যাখ্যা, কোরআন-হাদিসের অপব্যাখ্যায় স্বার্থ হাসিলের কাজ করেছে। যে যেমন পারে ব্যাখ্যা দাঁড় করায়, জোট বাঁধে ধর্মের দাওয়াই দিতে সুবিধা করার জন্য। 

রহিয়া রহিয়া রসুলের বাণী রেডিও টেলিও হতে
বিকৃত হয়ে ছড়ায়ে চলেছে বিষ বাষ্পের স্রোতে,
নর হন্তারা আজিকে হয়েছে শ্রেষ্ঠ ইমানদার
লুণ্ঠনকারী জালিম নিয়েছে দেশের শাসন ভার।
 
এত সরাসরি এত মাটিগন্ধা ভাষার আর কোন কবি যুদ্ধকালীন বাস্তবতা বর্ণনা করেছেন। তার মুক্তিযুদ্ধের এক কবিতায় বঙ্গবন্ধুর সাতই মার্চের ভাষণকে নিয়ে কবিতা লিখেছেন। আর স্বাধীনচেতা বাঙালিরা নিজেদের অধিকার আদায়ের সংগ্রাম চালিয়ে গেছেন। জসীম উদ্‌দীন ‘কি কহিব আর’ কবিতায় লিখেছেন;

‘এসব কাহিনি কহিবার মানা লিখিবার মানা হায়
কবির কলম বড় অবাধ্য না লিখে বাঁচা যে দায়।
 
মায়াঘেরা সে বাংলাদেশ যেন কংকাল; একাত্তরের মে মাসে ‘দগ্ধ গ্রাম’ শিরোনাম চিরকাল গ্রামকে ভালোবেসে লিখেছেন। মানুষের রক্তে-খুনে ছায়া-সুশীতল গ্রামগুলো আপন সৌন্দর্য হারিয়ে যেন মৃতপ্রায় মায়া। নির্মম সত্য মুক্তিযুদ্ধের সময় হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষই বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছিল। অসাম্প্রদায়িকতা বাঙালির কথা তিনি লিখেছেন; ‘গীতারা কোথায় যাবে?’ ‘মুক্তিযোদ্ধা’, ‘জাগিয়া তুলিবা আশ’ কবিতাগুলোতে কবির মানবতাবাদী চেতনার প্রকাশ ঘটেছে। বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার চেতনা কখনো পুরাতন হয় না, তেমনি ধুলোমাখা হতে পারে না রক্তের আঁচড়ে লেখা সাহিত্যকর্ম।

বৃষ্টি মনোমুগ্ধকর খুনি

প্রকাশ: ১৯ জুন ২০২৬, ১২:২৬ পিএম
বৃষ্টি মনোমুগ্ধকর খুনি
বই

ছয় ঋতুর এই দেশে বর্ষাঋতু ছাড়াও যে ঝুম বৃষ্টির অনুভূতি সৃষ্টি হতে পারে তা এমরান কবিরের পঞ্চম কাব্যগ্রন্থবৃষ্টি: মনোমুগ্ধকর খুনিনা পড়লে বোঝাই যেত না বর্ষার সময় ঝুম বৃষ্টিতে বারান্দায় বসে বই পড়লে যেমন অজান্তেই বৃষ্টির গতিময় ফোঁটা শরীরে পড়ে, শিহরণ জাগে আর নষ্টালজিয়ায় আক্রান্ত হয় মনএমরান কবিরের এই কাব্যপাঠে সে রকমই অভিজ্ঞতা হলো শব্দের মেঘেও যে বৃষ্টির ছটা থাকে তাও বুঝিয়ে দিল মেঘে গর্জন নেই তবে বর্ষণ আছে ফ্ল্যাপ থেকেই শুরু হয়েছে মেঘের ঘনঘটা, ‘তোমার ভূগোলে আসার পর/ ভেবে দেখ/ কীরূপ ছিল আমার জয়োল্লাস/ আজ ভূগোলের গোলে/ থামিয়ে রেখেছি গান/ ফেরার পথে নিয়ে যাব/ তোমার না-দেখানো-/ বৃষ্টির সোনালি আগুন/ যার জন্য অনেক আগেই আমি/ হয়েছিলাম খুন পুরো কাব্যে যেন এই শৈল্পিক খুনেরই প্রতিধ্বনি

এই বইয়ের উৎসমুখে একটি গদ্য শোভা পেয়েছে সেখানে লিখেছেন তিনি, ‘কোনো ঋতুই আমাদের কাছে পুরাতন হয়ে আসে না যতবারই আসে ততবারই যেন নতুন যেন ছন্দের সাথে ছন্দের সহবাস

কবিতায় বলেছেন তিনি, ‘বাতাস তখন আগুন আগুন,/ পলকে পলকে তার রমণীয় শিখা!’ বৃষ্টির আগে বাতাসের কাছে গ্রীষ্মের যে তীব্রতা তা কবি রমণীয় শিখার সঙ্গে তুলনা করেছেনমেঘ মেঘ গল্পকবিতাটি পড়ার সঙ্গে সঙ্গে  মনে ভেসে ওঠে, ‘বনের ভেতর বন, তাহার ভেতর পালকের গান, উড়ন্ত উচ্ছল তার নয়নের আসমান’–কী শৈল্পিক ছোঁয়ায় তিনি বর্ষাকে জীবন্ত করে তুলেছেন

বাংলার প্রকৃতি, বাংলার মানুষ, বাংলার বর্ষাকে তিনি যেন শব্দের ক্যামেরায় তুলে ধরেছেন এভাবে বাংলার মেঠোপথ ধরে হেঁটে যাওয়া, বর্ষার বৃষ্টি গায়ে মেখে বড় হওয়া এক জলময় চিরায়ত রোমাঞ্চকর বিজ্ঞাপন হয়ে উঠেছে, ‘বৃষ্টি: মনোমুগ্ধকর খুনি কবিতাগুলো

প্রায় প্রতিটি কবিতায় বর্ষার সঙ্গে এক রহস্যের চাঁদমুখ হয়ে ধরা পড়বে একটা চরিত্রঅধ্যাপিকা কে এই অধ্যাপিকা? তিনি বইটি উৎসর্গও করেছেন সেই অধ্যাপিকাকে অথচ তাকে সুনির্দিষ্ট করা দুরূহ বর্ষায় যেমন মেঘ থাকে, ঝড় থাকে, বৃষ্টি থাকে, বন্যা থাকে, বনের ভেতর হারিয়ে যাওয়া পথ থাকে, বৃক্ষের সঙ্গে বৃষ্টির অজ্ঞাত গল্প থাকে, ঠিক তেমনি কাব্যের বর্ণনায়, শব্দে, ভাবে চরিত্র বর্ষার মতোই রহস্য-রোমাঞ্চকর হয়ে ওঠে! কি জলকন্যা? একি বৃষ্টিবিলাসী নারী? কি কাব্যের পূর্ণতা? নাকি প্রকৃতির রূপক? নাকি কবির মনে সদা জেগে থাকা এক সৌন্দর্যের অনুপম মুখ? আবিষ্কারের জন্য পড়তে পড়তে বই শেষ হবে, রহস্যের শেষ হবে না, ‘অধ্যাপিকা,/ আপনি তো খুউব/ সরল অঙ্কের মতো/ তুমুল বৃষ্টিবাহিকা!’ কিংবাসবাই তো ছাত্র, রোদে রোদে থাকি বিস্মিত পাঠে/ তাপে তাপে বাষ্পীয় উত্তাপে, জানতে পারিনি একা/ আপনি এমন মেঘের মতোন উচ্ছল গায়িকা/ এমন ভেজা গান, গেয়ে যান/ ভিজে যায়/ সমস্ত অববাহিকা

মিথ মৈথুনকবিতায় তিনি আরও গাঢ় রহস্যের শ্যামল বনে বৃষ্টির ফোঁটার মতো করে বলে উঠলেন, ‘তার চেয়ে, অধ্যাপিকা/ সবুজ ঘাসের পাশে হাঁটতে থাকুন ধীরে/ আর তাকিয়ে দেখুন বারবার, কী যে অপরূপ রূপ বরষার

বর্ষার সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে বর্ষার জলে ভেজা ভেজা পথে চলতে থাকা এই নিগুঢ় প্রতীকী চরিত্রটি বর্ষাকে সবাই উপলব্ধি করলেও কবি এমরান কবিরের কাব্য যেন বর্ষার স্বচ্ছ আয়না; অতীত, বর্তমান, দেখা-অদেখা সব একসঙ্গে অধ্যাপিকার  প্রতিটি চরণে, শাড়ির ভাঁজে এসে পাঠক হৃদয়ে ভর করে

মাঠ-ঘাট, জলে ভরা নদী, দিঘি, কূলভাঙা নদী বেয়ে গেয়ে যাওয়া বর্ষার সুখের মাঝি, কাদাময় পথ, বৃষ্টির আলিঙ্গন, বর্ষায় অভাবি গৃহিণীর অনাহারে থাকা, জলে পাতিহাঁসের মতো অবাধ গোসল করা শিশুর দল, ঘরের কোনে নিভৃতে একাকি দুটো মনের এক শরীর হওয়ার রহস্যের খেলাসবই আছে কাব্যে

কাব্যে ছোট ছোট কবিতা থাকলেও শেষে আত্মমগ্ন বীজের প্রত্ন ধারাপাত শিরোনামীয় একটি দীর্ঘ কবিতা সন্নিবেশিত হয়েছে ৩০০ চরণেরও অধিক কবিতা পাঠককে এক অভূতপূর্ব শিল্পআস্বাদনের অভিজ্ঞতা দেবে, ‘একদম নিঃশব্দ একাকিনী/ একান্তে দাঁড়িয়ে, একান্তে শুধু/ তিনি শুদ্ধতম একাকিনী/ আঁচল কোমরে গুঁজে দাঁড়িয়ে থাকেন মাঠে/ সেই সবুজ কৃষাণী

বর্ষার বিপুল, বিস্তৃত বহুমুখী চরিত্র অবদানের সঙ্গে যেমন বহুবিধ আকাঙ্ক্ষা জড়িয়ে আছে তেমনি দীর্ঘ কবিতার সঙ্গে জড়িয়ে আছে কৃষাণীবাংলার চিরায়ত মাতৃরূপিণী অবয়ব তিনি মমতায় সংগ্রামে, শ্রমে শ্রান্তিতে, ত্যাগে তিতিক্ষায়, ভালোবাসায় রুক্ষতায় এক-একক-অদ্বিতীয় তিনি চির বিজয়িনী ভেতরে ভেতরে ক্ষয়ে যাওয়া ইমারতের মতো হলেও বাইরে তার হাসির ছটাযেন পাকা ধান

আমরা জানি বৃষ্টি আমাদের এই অঞ্চলের কৃষি, সভ্যতা সংস্কৃতির কতটাজুড়ে রয়েছে দীর্ঘ কবিতাটিতে তা উঠে এসেছে দারুণভাবে কবিতাটিতে রয়েছে অদ্ভুত আত্মগীতি রয়েছে মায়া মোহনার কথা, নরম মাটি কৃষাণ-কৃষাণীর নরম হৃদয়ের কথা, রয়েছে ধান গানের কথা উৎপাদন আর জেগে উঠবার কথাও সবচেয়ে রয়েছে এক অপরূপ সম্ভাবনার কথা সব মিলয়ে বৃষ্টির সঙ্গে আমাদের রোমান্টিকতা আর চিরায়ত বাংলার সম্বন্ধসূত্র উঠে এসেছে যার সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত রয়েছে আমাদের কৃষি, কৃষ্টি, সভ্যতা, সংগ্রাম, প্রেম, কাম আর আর্থ-সামাজিক অবস্থা

কৃষাণী, নাকি অধ্যাপিকাকে বড় হয়ে বর্ষার চির ছায়া হয়ে থাকবে, মেঘের কোলে রহস্য হয়ে থাকবে তা অনুভব করতে এই কাব্য পাঠের বিকল্প নেই! বর্ষা আসবে বারবার কিন্তু কাব্যিক খুনির বিচার হবে না

সৈয়দ আলী আহসান প্রথম কবি দেখা ও কয়েক টুকরো স্মৃতি

প্রকাশ: ১৯ জুন ২০২৬, ১২:২২ পিএম
প্রথম কবি দেখা ও কয়েক টুকরো স্মৃতি
আঁকা: নিয়াজ চৌধুরী তুলি

আমি তখন নবম বা দশম শ্রেণির ছাত্র আমাদেরলজিং টিচারকলেজে পড়েন একদিন তিনি জানালেন তাদের কলেজে একটি অনুষ্ঠান হবে, এতে যোগ দেবেন দেশের একজন বিখ্যাত কবি আমার মন খুব চাইছে কলেজের অনুষ্ঠানে যেতে

মাথার মধ্যে লেখালেখির পোকা নিঃশব্দে ওড়াউড়ি করে কাকপক্ষীও যেন টের না পায়, গোপনে কাগজকলম নিয়ে বসি লিখি কী লিখি জানি না একজন বিখ্যাত কবিকে দেখার সুযোগ হাতছাড়া করা যায় নালজিং সারকে খুব করে ধরলাম সার রাজিতার সঙ্গে অনুষ্ঠানে যাব কিন্তু বাবার অনুমতি লাগবে আমার বাবা কড়া মানুষ এমনিতে কোথাও যেতে দেন না কিন্তু আমার আবদারে রজি হলেন আমার সে কী আনন্দ!

হলভর্তি লোক ছাত্রছারা তো আছেই অভিভাবক, স্থানীয় গন্যমান্য অনেকেই উপস্থিত ভাগ্য ভালো, মঞ্চের কাছাকাছি বসার জায়গা পেয়ে গেলাম অনুষ্ঠানের মধ্যমণি দেশের বিখ্যাত কবি সৈয়দ আলী আহসান মুখে চাপদাড়ি, পোশাকে পরিপাটি তিনি যখন মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়ালেন, পুরো হল নীরব তিনি দীর্ঘ সময় বক্তৃতা করলেন কঠিন কঠিন বিষয় তার অনেক কথাই মাথায় ঢোকেনি ঢোকার কথাও নয় তার বাচনভঙ্গি খুবই আকর্ষণীয় বুঝি আর না বুঝি শুনতে ভালো লাগছে আমার মুগ্ধতাসামনাসামনি একজন কবিকে দেখছি খেয়াল করলাম, তিনি দুটি চশমা ব্যবহার করছেন একটা খুলে আর একটা পরছেন, সেটাও বদলাচ্ছেন কারণ কী! অনেক পরে জেনেছি, কাছে এবং দূরে দেখার জন্য আলাদা চশমা দরকার হয়

দীর্ঘ বক্তৃতা শেষে কবি নিজের লেখা কবিতা শোনালেন এই প্রথম মনে একটা খটকা লাগল, এটা আবার কেমন কবিতা!? পাঠ্যবইয়ে যে কবিতা পড়ি, এটা তো সেরকম না রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, জসীমউদ্দীন, সুফিয়া কামালএদের কবিতা পড়লে বা শুনলে মনে কেমন দোলা লাগে, এই কবির কবিতায় তেমন দোলা নেই

যাই হোক, কবিতা বুঝতে না পারলেও কবিকে ভালো লেগেছে সব থেকে বড় কথা একজন কবিকে জীবনে প্রথম সামনাসামনি দেখা! কবি সেদিন যে কবিতাটি পড়েছিলেন, নামআমার পূর্ব বাংলা

পরবর্তীত, কলেজের পাঠ্যসূচিতে সৈয়দ আলী আহসানেরআমার পূর্ব বাংলাকবিতাটি অন্তর্ভুক্ত ছিল পড়তে হয়েছে, ক্লাসে এটা নিয়ে স্যারের বক্তৃতা শুনতে হয়েছে, পরীক্ষার খাতায় উত্তর লিখতে হয়েছে আগে আমাদের কবিতা পাঠের অভিজ্ঞতায় ছিল ছন্দমিলের কবিতা আগেই উল্লেখ করেছি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, সুফিয়া কামাল, জসীমউদ্দীনের কবিতায় চরণান্তেমিল’-এর বিষয়টি প্রথম দেখলাম চরণান্তে মিল নেই মাইকেল মধুসূদন দত্তের কবিতায় ক্লাসে স্যার বললেন, এটা অমিত্রাক্ষর ছন্দ শিখলাম চরণান্তের মিল ছাড়াও কবিতা হয় স্যার আরও বললেন, মাইকেলের প্রায় কবিতাই ১৪ মাত্রার চরণে লেখা ১৪ মাত্রা মানে ১৪টি অক্ষর গুনে গুনে দেখলাম, তাই তো! প্রতি চরণে ১৪টি অক্ষরই তো আছে স্যার মাত্রা পর্ব সম্বন্ধেও বললেন ১৪ অক্ষর মানে ১৪ মাত্রা এই ১৪ মাত্রার চরণ আবার দুই ভাগে বিভক্ত প্রথম ভাগে মাত্রা, পরের ভাগে মাত্রা, এই হলো ১৪ শিখলাম মাত্রা আর পর্ব

এই সামান্য জ্ঞান নিয়ে সৈয়দ আলী আহসানের  আমার পূর্ব বাংলাকবিতাটি দেখার চেষ্টা করলাম কবিতাটি এরকম

আমার পূর্ব বাংলা এক গুচ্ছ স্নিগ্ধ,

       অন্ধকারের তমাল

অনেক পাতার ঘনিষ্ঠতায়,

      একটি প্রগাঢ় নিকুঞ্জ

সন্ধ্যার উন্মেষের মতে

সরোবরে অতলের মতো

কালো-কেশ সঞ্চয়ের মতো

বিমুগ্ধ বেদনার শান্তি

আমার পূর্ব বাংলা বর্ষার অন্ধকারে অনুরাগ

ঘুমের অলসতায় চোখ বুঁজে আসার মতো শান্তি

হৃদয় ছুঁয়ে-যাওয়া স্নিগ্ধ নীলাম্বরী

(অংশবিশেষ)

 কবিতার বিষয় দেশানুরাগ গভীর মুগ্ধ অনুভবে দেশকে দেখা গদ্য-ছন্দে লেখা অন্তমিল তো নেই-, নেই মাত্রা পর্ব-সমতা আঁটোসাঁটোভাবে কাব্যালংকার না মেনেও যে উল্লেখযোগ্য কবিতা হতে পারে, সৈয়দ আলী আহসানেরআমার পূর্ব বাংলাএর একটি উদাহরণ

 

দুই.

লেখালেখির এই জীবনে অনেকের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে কারও সঙ্গে কালেভদ্রে, কারও সঙ্গে মাঝেমাঝে, কারও সঙ্গে প্রায় নিত্য দেখাসাক্ষাৎ হয় সৈয়দ আলী আহসানের সঙ্গে দেখা হওয়াটা ছিল মাঝেমাঝে, প্রয়োজনে কেউ কেউ যেমন করেন, বয়সের দেওয়াল তুলে অনুজদের একটু দূরেই রাখেন সৈয়দ আলী আহসান ছিলেন এর বিপরীত বৈশিষ্ট্যের মানুষ অনুজদের তিনি সহজ আনন্দে গ্রহণ করতেন

একবার হলো কী, আমি রেডিওতে কবিতা পাঠের অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছিলাম শাহবাগ তখন রেডিওর প্রধান কেন্দ্র উপস্থিত হয়ে দেখি আমি যাদের সঙ্গে কবিতা পড়ব, তারা সবাই দেশের খ্যাতিমান কবি, আমি একমাত্র কবিযশঃপ্রার্থী তরুণ এক-দুজন তো তাচ্ছিল্য করল আমি মেনে নিয়েছি কারও কারও খ্যাতির অহংকার তো থাকতেই পারে রেওয়াজ অনুযায়ী অনুষ্ঠানের শেষ পর্ব পঠিত কবিতার ওপর আলোচনা অনুষ্ঠানের সঞ্চালক সৈয়দ আলী আহসান সেদিন আমার লেখার মৃদু প্রশংসাই করেছিলেন

বহুমাত্রিক লেখক সৈয়দ আলী আহসানের গ্রন্থসংখ্যা অনেক শুধু সংখ্যা বিচারে নয়, বিষয়-বৈচিত্র্যেও সমৃদ্ধ এর মধ্যে একটি বইয়ের কথা এখানে উল্লেখ করছি বইটির নামপ্রেম যেখানে সর্বস্ব উল্লেখ করার কারণ, এই বইটির আমিআঁতুড়-সাক্ষী

আমি তখন একটি সাপ্তাহিক পত্রিকায় যুক্ত ওই কাগজে সৈয়দ আলী আহসানের আনেক লেখা ছাপা হয়েছে যখনই চেয়েছি, সৈয়দ আলী আহসান লেখা দিয়েছেন তবে লেখাটি তৈরি হতোশ্রুতিলিখনপদ্ধতিতে

প্রেম যখানে সর্বস্বএকটি সংকলন গ্রন্থ এই সংকলন গ্রন্থের প্রায় সবকটি লেখারই আমি ছিলামশ্রুতি লেখক নির্দিষ্ট সময়ে যেতাম সৈয়দ আলী আহসানের কলাবাগান এলাকার বাসায় তিনি আগে থেকেই যেন প্রস্তুত থাকতেন আমি খাতাকলম নিয়ে বসতাম তিনি চোখ বুঁজে বলতেনধীর গতি, স্পষ্ট উচ্চারণ হাতের কাছে কোনোরেফারেন্সনেই তিনি বলে যাচ্ছেন সংশ্লিষ্ট সব তথ্যই তার মুখস্থ লেখার শেষ বাক্যটি বলে চোখ খুলতেন, বলতেন, চলবে তো? মননশীল আধুনিক কাব্যবোধ, চিত্রকলা, প্রেমানুভূতির বহুমাত্রিকতা ছিল লেখাগুলোর বিষয় ফরাসি সাহিত্যের আনুপূর্বিক খুঁটিনাটি, শিল্পকলার বাহ্যিক সৌন্দর্য অন্তর-ঐশ্বর্য তার ওইসব লেখায় বিস্তৃত চিত্রশিল্প বা ভাস্কর্য বিশ্লেষণেনারীবিষয়টি সৈয়দ আলী আহসানের লেখায় বিস্তৃত নতুন মাত্রা পেত বিশেষ করে নারীশরীরের সৌন্দর্য মাহাত্ম্য বর্ণনায় তার ভাষা-প্রাঞ্জলতায় শিল্পচেতনারূপ দ্যুতি ছড়াত

অসংকোচেই বলি, শ্রুতিলেখক হিসেবে আমি বেশ আনন্দই পেতাম

গ্রন্থকথা মিথ্যার চোরাস্রোত বয়ে যায়

প্রকাশ: ১৯ জুন ২০২৬, ১২:১১ পিএম
মিথ্যার চোরাস্রোত বয়ে যায়
বই

একটি সুন্দর জাতি গঠন করতে হলে অবশ্যই বই পড়তে হবে বই মানুষের সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ ঘটায় আমেরিকান কবি জেমস রাসেল বলেছেন, ‘বই হলো এমন এক মৌমাছি যা অন্যদের সুন্দর মন থেকে মধু সংগ্রহ করে পাঠকের জন্য নিয়ে আসে প্রসঙ্গে দুঃখ করে বাংলা ভাষার সবচেয়ে জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বলেছেন, ‘আমাদের দেশের লোক বই পড়েন বটে, কিন্তু পয়সা খরচ করে কিনে পড়েন না’…

আশির দশকের শেষপ্রান্তের কবি শামীম আহমদের এগারোতম কবিতার বইটি এবারের বইমেলায় এসেছে গ্রন্থে ছাপ্পান্নটি কবিতার পাঠোদ্ধার করা গেল তবে, শামীম আহমদের কবিতা স্বপ্রণোদিতভাবে একটি ভিন্ন পরিচয় নিয়ে আসে, তার কবিতা যারা নিয়মিত পড়েন তাদের কাছে সেটা উন্মোচিত হয় তার কবিতায় অসংখ্য পাশ্চাত্য প্রতীক, মিথ, চিত্রকল্প ব্যবহার হয় এবং বেশ দক্ষভাবে তবে বর্তমান আলোচ্য কাব্যগ্রন্থে এই স্বাভাবিক প্রবণতার স্বল্পতা লক্ষণীয় এবং কেন যেন কবি ভীষণ ক্রুদ্ধ হয়ে কবিতাগুলো লিখেছেন এবং বেশ সহজভাবে প্রকাশ করেছেনযেখানে শুধু বানিয়ার বাণিজ্য বিতানে/ বোধের বাণিজ্য হয় দেশাত্ববোধের মোড়কে,/ এই চটকদার বিজ্ঞাপনে/ আমি ভুলে যাই জন্মমূল মায়ের জঠরের সুতীব্র আর্তনাদ’ (আমি মাতৃভূমি: পৃ-৪৮)জংধরা জ্যোৎস্না দেখে প্রফুল্ল হওয়া নিরেট মূর্খতা/ এর চেয়ে মোমবৃক্ষের আলো নিষ্পাপ পবিত্র/ নিজকে পুড়িয়ে লীন হয়ে যায়/ আঁধারের যবনিকাপাতে’ (বর্তমান তারুণ্যের প্রতি: পৃ-৩৮) কবি universal true চাঁদের আলোকেও আজকের দেশ সমাজের অধোগতি দেখে পুরো ক্রোধে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেনরূপকের এই দেশে আমি বড্ড সন্দিহানপ্রতিকী আলখেল্লায়, দূর্যোধনের তীরের মতো/ চিকচিক করে দৃষ্টির ফলা/ কখন যে আঁচড়ে পড়ে মৃত্যুর সওদা নিয়ে কে জানে’ (সফেদ হাঙ্গর: পৃ-৪৬) চারপাশের অবক্ষয় দেখে কবি সন্দিহান কখন যে সমাজ, জনপদ কুজনের দ্বারা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়, তা কবি দিব্যদৃষ্টিতে foresee করতে পারছেন নিবেদিতপ্রাণ কবিই সমাজের এই অধঃপাত দেখতে পারেন কারণ কবি শিষ্টজন তিনি বলে ওঠেন, ‘হে বন্ধু আমার, তুমি কি দেখো নৈসর্গিক বিলাস?/ আমি সব দেখে চোখ বুজি/ নৈষ্ঠিক ঋষির মতো/ বুকের গভীরে পুঁতে রাখি আরাধনার বীজ’ (নৈষ্ঠিক ঋষি: পৃ-৪৭)ডানাভাঙা পায়রা/ হাওয়ায় খুঁজে ফেরে আঁততায়ীর মুখ.../ রোদের গায়ে কান্না, লেগেছিল রক্তের দাগ আজ মনে হয় সময়ের স্রোতে/ মিশে যাচ্ছে সব স্মৃতি’ (আঁততায়ীর মুখ: পৃ-৬২)

শামীম আহমদের কবিতার একজন নিয়মিত পাঠক হিসেবেই বলা যায়, তার কবিতায় থাকে প্রতীক, মিথ, চিত্রকল্প, উৎপ্রেক্ষা ইত্যাদি যা অত্যন্ত সুনিপুণভাবে তিনি প্রয়োগ করেন, যা অনেক বোদ্ধা কবির কাছেও ঈর্ষণীয় হয়ে দাঁড়ায় কিন্তু কাব্যের সামগ্রিক ছাপ্পান্নটি কবিতা পড়লে মনে হয় কবি চটজলদি কবিতাগুলো লিখে ফেলেছেন যার কাছে কবিতা লেখার সময় শক্তি চট্টোপাধ্যায়, নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, বুদ্ধদেব বসু, জীবনানন্দ, শহীদ কাদরী এসে টেবিলের চারধারে ঘিরে ধরেন, তার কাছ থেকে এত চটজলদি কবিতাগ্রন্থ পাঠক কামনা করে না এমনও হতে পারে দেশ সামাজিক পরিবেশের সাম্প্রতিক দৈনতা তাকে ক্রুদ্ধ করে তুলেছে তবুও তার কবিতা এক অনন্যতার জন্য আমাদের চিন্তাজগৎকে আচ্ছন্ন করে

সিলেটের ভাস্কর প্রকাশন মুদ্রণে রাজধানীর সেরা প্রকাশনকেও হার মানিয়েছে প্রচ্ছদ অত্যন্ত সুন্দর অঙ্কন করেছেন আল নোমান

কবিতা অনুবাদ হয় না মানুষের

প্রকাশ: ১৯ জুন ২০২৬, ১২:০৭ পিএম
আপডেট: ১৯ জুন ২০২৬, ১২:১১ পিএম
অনুবাদ হয় না মানুষের

সব মানুষই পরিব্রাজক

পানিপথের যুদ্ধ থেকে

            বিসমিল্লাহ খাঁর সানাই পর্যন্ত

 

যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা ছেড়ে

কোলাহল থেকে দূরে গিয়ে

কার্তুজও জানে

            কখনো না কখনো জাগতে হবে

 

জন্মসূত্রেই মানুষ শিখেছে হানাহানি

প্রয়োগও করছে

            প্রেমে কিংবা রাষ্ট্রতন্ত্রে

 

            মানুষ কখনোই অনূদিত নয়...

কবিতা স্মৃতির ভেতর

প্রকাশ: ১৯ জুন ২০২৬, ১২:০১ পিএম
স্মৃতির ভেতর

যে ঢেউ ঘুমায় না সমুদ্রের মন্থর বুকে, পাশ ফিরে খোঁজে সমসূত্র-ছেঁড়া ফেরারি ঢেউ; তার মতো একাকী রাত জেগে আছি বুকের উঠোনে সুতীব্র বেদনার মাশরুম ছিঁড়ে ছিঁড়ে পড়ে, চিতার কালো জোছনা ঝরে পড়ে নখরে নখরে

 

হরিণখোলা মুণ্ডেশ্বরীর জলে যে দেহাতি সন্ধ্যা বিসর্জন-বিসর্জন খেলে, তুমি তার মতো আমাকে বিসর্জন দিয়ে গেছ এই স্যাঁতসেঁতে শহরে কতকাল শাদা পালকের তারাদের কোন্ডর পাখিদের মতো ডানা মেলে নামতে দেখিনি শালিকদের চরাচরে

 

আহা, কী নিখুঁত পরিকল্পনা তোমার! তবুও আতপচালের গন্ধমাখা স্মৃতির ভেতর

সোনামুখী সুই দিয়ে সেলাই করে যাব ছেঁড়া ছেঁড়া মায়ার কাহন