লেবাননে বৃহস্পতিবার (২৪ অক্টোবর) হামলায় অন্তত তিনজন মারা গেছেন। নিহত তিনজনই দেশটির সামরিক বাহিনীর সেনা সদস্য বলে নিশ্চিত করেছে লেবানিজ সামরিক বাহিনী। তাদের দেওয়া তথ্যানুসারে, ইয়াতের গ্রামে আহতদের সরানোর কাজে নিয়োজিত ছিল ওই সেনা সদস্যরা। পরে ইসরায়েল হামলা চালালে তারা মারা যান।
এদিকে গাজায় গত বুধবার ইসরায়েলি হামলায় ৪২ জন মারা গেছেন। ইসরায়েলি বাহিনী উপত্যকার উত্তরাংশে অবরোধ তীব্র করেছে। হাসপাতাল ও শরণার্থী শিবির ঘিরে রেখেছে। চিকিৎসা কর্মী ও বাসিন্দারা জানিয়েছেন, তাদের দক্ষিণের দিকে সরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
প্যারিসের উদ্যোগ
বিশ্ব শক্তিরা বৃহস্পতিবার ফ্রান্সের প্যারিসে বসেছিল লেবাননের জন্য জরুরি মানবিক সহায়তার লক্ষ্যে অন্তত ৫০ কোটি ইউরো সংগ্রহ করতে। পাশাপাশি তারা যুদ্ধবিরতির জন্যও চাপ দিয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের মতো করে আলাদাভাবে চেষ্টা চালাচ্ছে। ফলে কূটনীতিকরা বলছেন, তারা তেমন দৃঢ় কোনো অগ্রগতি আশা করছেন না।
ফ্রান্সের সঙ্গে লেবাননের ঐতিহাসিক সম্পর্ক রয়েছে। আর এ কারণেই হয়তো ফ্রান্স ওয়াশিংটনের সঙ্গে মিলে যুদ্ধবিরতি নিশ্চিতের চেষ্টা চালিয়েছেন। তবে ফরাসিদের প্রভাব ওই অঞ্চলে আগেই সীমিত হয়ে এসেছে। বিশেষ করে সেপ্টেম্বরে ইসরায়েল হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে অভিযান শুরুর পর থেকে। ইসরায়েলের ওই অভিযানে লেবাননে ২০০০-এরও বেশি মানুষ মারা গেছেন। বাস্তুচ্যুত হয়েছেন কয়েক হাজার।
প্যারিসের পক্ষ থেকে যে সম্মেলনটির আয়োজন করা হয়েছিল, তাতে ৭০ জন প্রতিনিধি ও ১৫ আন্তর্জাতিক সংস্থা অংশ নিয়েছে। তবে প্রধান সারির মন্ত্রীদের সংখ্যা কম ছিল। লেবাননে নিযুক্ত ফ্রান্সের বিশেষ দূত জিন-ইভেস ড্রিয়ান সতর্ক করে দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘যদি এটি অব্যাহত থাকে, তা হলে লেবানন মৃত্যুর ঝুঁকিতে রয়েছে।’
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেন বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্য সফর করছেন। তিনিও যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়ন ও সংকট নিরসনের চেষ্টা চালাচ্ছেন। মার্কিন নির্বাচন ঘনিয়ে এসেছে। ফলে এটিই তার শেষ চেষ্টা।
লেবাননের প্রধানমন্ত্রী নাজিব মিকাতি ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী প্যারিসের সহায়তা উদ্যোগের সঙ্গে জড়িত হয়েছেন। তারাও ওই সম্মেলনে উপস্থিত হবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে ইসরায়েল বা ইরান কোনো দেশকেই আয়োজনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু গোটা আয়োজনটির সমালোচনা করেছেন।
ফ্রান্সের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুসারে, সম্মেলনের মাধ্যমে অন্তত ৫০ কোটি ইউরো সহায়তা সংগ্রহের চেষ্টা করা হচ্ছে। ওই অর্থ পাঁচ লাখ থেকে দশ লাখ বাস্তুচ্যুত মানুষের সহায়তায় ব্যয় হবে। তারা আরও জানিয়েছে, সংকট নিরসনে প্রতি মাসে ২৫ কোটি ইউরোর প্রয়োজন।
২০০৬ সালে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে পাস হওয়া প্রস্তাব ১৭০১-এর ভিত্তিতে সংঘাত নিরসনের আহ্বান জানাবেন উপস্থিতরা। ওই প্রস্তাবে দক্ষিণ লেবাননকে সেনা ও অস্ত্রমুক্ত রাখার কথা বলা হয়েছে।
সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি
গত বছরের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার আগে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক ও তা জোরদার করার প্রস্তুতি নিচ্ছিল সৌদি আরব। গাজা যুদ্ধের এক বছর পর সে চিত্র পাল্টে গেছে। সৌদি সরকার এখন তার পুরোনো শত্রু ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করছে।
নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে বিষয়টি। ইসরায়েল ও সৌদি আরবের যে চুক্তি হওয়ার কথা ছিল, তা যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক দূরে চলে গেছে। হামাস নেতা ইয়াহিয়া সিনাওয়ারকে হত্যার পর পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হয়েছে।
এমনিতে সৌদি আরব জোরালো কণ্ঠে বলছে, যেকোনো কূটনৈতিক চুক্তি তথা সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের আগে ইসরাইলকে অবশ্যই স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র হিসেবে মেনে নিতে হবে। সৌদি সরকারের ক্ষেত্রে এটা উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন।
এদিকে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা নিরসনে তেহরানের কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। সৌদি আরবও সফর করেছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। সফর করেছেন ইরাক ও ওমানেও। যার লক্ষ্য দেশগুলোর মধ্যে বিদ্যমান উত্তেজনা প্রশমন করা। এর বাইরে তিনি জর্ডান, মিশর ও তুরস্কও সফর করেছেন। ইরানি সংবাদমাধ্যম ‘ইরনা’ জানিয়েছে, গত ১২ বছরের মধ্যে এই প্রথম কোনো ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী মিশর সফর করলেন। সূত্র: রয়টার্স, এএফপি