বিমানবন্দর টাওয়ার থেকে সবে পাইলটকে জানানো হয়েছে 'একটি অতিথি পাখির পাল আপনার রুটে উড়ে আসছে, সাবধানে অবতরণ করুন।' সঙ্গে সঙ্গেই পাইলটের পক্ষ থেকে ভেসে আসলো বিপদজনক সংকেত, কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে রানওয়েতে ছিটকে পড়ল বিমান। সব শেষ হয়ে গেল চোখের সামনেই।
এভাবেই বিমান দুর্ঘটনার বর্ণনা দিচ্ছিলেন দক্ষিণ কোরিয়ার মুয়ান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ওয়াচ টাওয়ারে থাকা ফ্লাইট ওপারেটর।
বছর শেষ হতে বাকি আর মাত্র দুই দিন। তারপরই আসবে নতুন বছর, নতুন দিনের আলোয় মেতে উঠবে বিশ্ববাসী। নতুন পরিকল্পনা, নতুন স্বপ্ন আর আগামী দিনের প্রত্যাশা নিয়ে নতুন বছরকে স্বাগত জানানোর কথা থাকলেও এক বিমান দুর্ঘটনা সে আশার প্রদীপ নিভিয়ে দিল নিমিষেই।
দক্ষিণ কোরিয়াবাসীর সঙ্গে শোকে কাতর পুরো বিশ্ব। ২০২৪ এর বিদায়লগ্নে বছরের সবচেয়ে ভয়াবহ বিমান দুর্ঘটনার কবলে পড়েছে দক্ষিণ কোরিয়া। কেবল বছর নয় বলা যায় গেল দুই যুগে এতো ভয়াবহ বিমান দুর্ঘটনা দেখেনি দক্ষিণ কোরিয়া।
রবিবার (২৯ ডিসেম্বর) কোরিয়ার স্থানীয় সময় সকাল ৯টায় ক্রু ও পাইলটসহ ১৮১ জন বহনকারী জেজু এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইট দেশটির মুয়ান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে খুব বাজেভাবে আছড়ে পড়ে বিধ্বস্ত হয়। ২২১৬ নম্বরধারী এই ফ্লাইটের বিমানটি ছিল বোয়িং ৭৩৭ সিরিজের একটি এইট এএস উড়োজাহাজ (Boeing 737-8AS)। এই দুর্ঘটনায় বিমানে থাকা ১৮১ জনের ১৭৯ জনই ঘটনাস্থলে নিহত হয়েছেন। সৌভাগ্যক্রমে রক্ষা পেয়েছেন মাত্র দুইজন ক্রু। তাদের গুরতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যম সূত্রে জানা গেছে, উদ্ধারের সময় সেই দুই ক্রু এতোটাই আতঙ্কিত ছিলেন যে উদ্ধারকারীদের তারা বলছিলেন 'এভাবে বেঁচে থাকার চেয়ে মরে যাওয়া শ্রেয়, আফসোস, আমরা কেন বেঁচে গেলাম, যাত্রীদের কাউকে আমরা রক্ষা করতে পারলাম না।' বিভিন্ন সূত্র বলছে বেঁচে যাওয়া দুই ক্রু হয়তো প্রাণ ফিরে পেয়েছেন ঠিকই কিন্তু তারা আর কখনোই হয়তো স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবেন না।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া দুর্ঘটনার ভিডিওতে দেখা গেছে, অবতরণের সময় ল্যান্ডিং হুইল না খোলায় বিমানটি রানওয়েতে ছিটকে পড়ে। ভারসাম্য হারিয়ে বিমানটির একপাশের দেয়াল রানওয়েতে ঘষা খায় আর মুহুর্তেই উড়োজাহাজটিতে আগুন লেগে যায়।
বেঁচে যাওয়া দুই ক্রু, নিহত ব্যক্তিদের পরিবার, দুর্ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ও কর্তৃপক্ষের বরাত দিয়ে বিমানে শেষ মুহুর্তে কী ঘটেছিলো সেটি তুলে ধরেছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম।
দক্ষিণ কোরিয়ার স্থানীয় সংবাদমাধ্যম ইয়োনহাপ নিউজ জানিয়েছে, 'বিমানটি অবতরনের আগে বেশ নিচুতে উড়ছিল। এসময় অতিথি পাখির একটি পাল এসে উড়োজাহাজের ডানায় ধাক্কা দেয়। এর পাঁচ মিনিটের মধ্যেই ভয়াবহ বিস্ফোরণ হয়ে বিমানটি আগুন ধরে রানওয়েতে পড়ে থাকতে দেখা যায়।'
ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, দুর্ঘটনার আগে বিমানটির এক যাত্রী পরিবারের সদস্যের কাছে এসএমএস পাঠিয়ে লিখেছেন, 'হাঁসের একটি পাল বিমানে ধাক্কা দিয়েছে, পাইলট আপ্রাণ চেষ্টা করছেন, কী হতে যাচ্ছে জানিনা, আর হয়তো তোমাদের কাছে ফেরা হবে না।'
যুক্তরাষ্ট্রের বার্তা সংস্থা সিএনএন তাদের এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, দুর্ঘটনায় নিহত হওয়া এক থাই নাগরিকের স্ত্রী তাদের বলেছে 'আমি কখনোই ভাবিনি তাকে আমি শেষ বারের মতো দেখছি। আমি ভাবতেও পারছিনা তাকে আমি আর কোনোদিনও দেখব না। আমি বিশ্বাস করি সে অবশ্যই আমার কাছে ফিরে আসবে। সে আমাকে অপেক্ষা করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে গেছে।'
বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েট প্রেসকে দেওয়া এক সাক্ষাতকারে অপর এক থাই নাগরিক বুনচুয়ে ডুয়াংমানি তার মেয়ে জংলুককে নিয়ে বলেছেন, 'আমি শুনেছি যে আজ সকালে কোরিয়ায় বিমানটি বিস্ফোরিত হয়েছে। কিন্তু আমি মোটেও আশা করিনি যে আমার মেয়ে এই ফ্লাইটে থাকবে।'
সবচেয়ে হৃদয়বিদারক শব্দগুলো হয়তো মৃত্যুর আগ মুহুর্তে উচ্চারণ করছিলেন খোদ পাইলট নিজেই। কোরিয়া এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষের বরাতে জানা গেছে টাওয়ার থেকে বার্তা পাঠানোর সঙ্গে সঙ্গেই পাইলট ফিরতি বার্তায় বলছিলেন, 'সবাই আমাকে ক্ষমা করে দিয়েন, আমি আমার যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছি। আমার আশেপাশে কোনো জলাশয় নেই যেখানে আমি বিমানটিকে ভাসিয়ে দিতে পারব। আমি আমার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। আমি আমাকে নিয়ে ভাবছি না, কিন্তু আমার সঙ্গে ১৭৫ জন যাত্রী ও ৫ জন ক্রু। তাদের পরিবার আছে। আমাদের সবার নিশ্চিত মৃত্যু হতে পারে। ঈশ্বর ছাড়া আমাদের রক্ষার কেউ নেই। আমার মেয়েকে বলে দিও আমি অনেক দূরে ঘুরতে যাচ্ছি। আমার স্ত্রীকে আমার ভালোবাসা জানিও।' এর পরই রেডিওর সিগনাল বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পাইলট হয়তো আরও কিছু বলার চেষ্টা করছিলেন কিন্তু তা আর বুঝা যায়নি।
বিমানটি থাইল্যান্ডের ব্যাংকক থেকে যাত্রা করেছিল। যেখানে সিংহভাগ যাত্রী ছিলেন দক্ষিণ কোরিয়ার অধিবাসী। স্থানীয় ফায়ার সার্ভিস থেকে জানানো হয়েছে, এ দুর্ঘটনার তদন্তে কয়েক বছর সময় লাগতে পারে এবং এর কারণ সম্পর্কে অনুমান করে কোনো মন্তব্য না করার জন্য স্থানীয় কর্মকর্তাদের অনুরোধ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
এর আগে সর্বশেষ ১৯৯৭ সালে দক্ষিণ কোরিয়ায় একটি বিমান দুর্ঘটনায় ২২৯ জনের মৃত্যু হয়েছিল। সে দুর্ঘটনার পর থেকে দক্ষিণ কোরিয়া তাদের বিমান রক্ষণাবেক্ষণে ব্যাপক জোর দেয় এবং সে সময় থেকে এখন পর্যন্ত দক্ষিণ কোরিয়ার বিমান সংস্থাগুলিকে 'শিল্পের সেরা অনুশীলন' হিসাবে বিবেচনা করা হয়। বিশ্বব্যাপীই তাদের বিমান এবং এয়ারলাইন্স উভয়কেই 'উত্তম নিরাপত্তা নির্দেশক' হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। কিন্তু এই এক দুর্ঘটনা তাদের সব অর্জনকে যেন ধূলিসাৎ করে দিল।
বছরের শেষটা এমন দেখতে হবে এমনটা কাম্য ছিলনা বিশ্ববাসীর।
সিফাত/