যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির বাদানুবাদের পর হোয়াইট হাউসের পরিবেশ ছিল অত্যন্ত নাটকীয়। এরই মধ্যে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার ঝড় উঠেছে।
ইউরোপের দেশগুলো পৃথকভাবে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। রাশিয়াও বসে নেই। রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, জেলেনস্কির প্রতি যথেষ্ট সংযম দেখিয়েছেন ট্রাম্প।
সংবাদমাধ্যম সিএনএনকে যুক্তরাষ্ট্রের এক কর্মকর্তা জানান, গত শুক্রবার হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে নজিরবিহীন ওই বাদানুবাদের পর ট্রাম্প তার মন্ত্রী ও কর্মীদের নিয়ে একটি কক্ষে চলে যান, অন্যদিকে জেলেনস্কি ও তার দল চলে যান অতিথিদের জন্য নির্ধারিত পৃথক একটি কক্ষে। তখন পর্যন্ত জেলেনস্কি জানতেন যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে খনিজ নিয়ে চুক্তি হতে চলেছে। পুরোটাই যে বদলে গেছে, সে বিষয়ে তখনো তিনি আঁচ করতে পারেননি।
ট্রাম্প নিজের জন্য নির্ধারিত কক্ষে যাওয়ার পর তার মন্ত্রীদের সঙ্গে আলোচনা করেন এবং তিনি জানান, জেলেনস্কি যেভাবে কথা বলেছেন তাতে তিনি অসম্মানিত বোধ করেছেন। পাশাপাশি ট্রাম্প মন্তব্য করেন, জেলেনস্কি শান্তি চান না।
এরপর যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা মাইক ওয়াল্টজকে পাঠান জেলেনস্কিদের কাছে। তারা গোটা ইউক্রেনীয় দলকে চলে যেতে বলেন। ইউক্রেনীয় দল এ সময় ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাতের অনুমতি চাইলেও তা মেলেনি। তাদের সেভাবেই বিদায় নিতে হয় হোয়াইট হাউস থেকে। এমনকি দুপুরে হোয়াইট হাউসে খাওয়ার কথা ছিল জেলেনস্কি ও তার দলের। আয়োজনও ছিল। তাদের খেতেও বলা হয়নি।
ট্রাম্পকেই দুষলেন ১৪ মার্কিন গভর্নর
জেলেনস্কির সঙ্গে বাগ্বিতণ্ডায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকেই দুষলেন যুক্তরাষ্ট্রের ১৪ ডেমোক্র্যাটিক গভর্নর। তারা ইউক্রেনের সঙ্গে সংহতিও প্রকাশ করেছেন।
সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের ১৪ ডেমোক্র্যাটিক গভর্নর যৌথ বিবৃতি দিয়ে জেলেনস্কির পক্ষে দাঁড়ান। গভর্নররা বলেছেন, পুতিনের কথা বিশ্বাস না করার জন্যই জেলেনস্কিকে তিরস্কার করেছেন ট্রাম্প ও ভ্যান্স। আর এ কাজের জন্য ওভাল অফিস ব্যবহার করেছেন রিপাবলিকান দলের ক্ষমতাসীনরা।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, রাশিয়ার আক্রমণের পর জেলেনস্কি তার জাতির জন্য এবং তার জনগণের স্বাধীনতার জন্য লড়াই করছেন। তার কাজকে ক্ষুণ্ন করার পরিবর্তে বিশ্বমঞ্চে আমেরিকানদের শক্তিশালী গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ রক্ষা করতে হবে।
ডেমোক্র্যাটিক পার্টির অর্ধেকেরও বেশি গভর্নর বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন কেন্টাকির অ্যান্ডি বেশিয়ার, নিউইয়র্কের ক্যাথি হোচুল, পেনসিলভানিয়ার জশ শাপিরো, মিনেসোটার টিম ওয়ালজ এবং মিশিগানের গ্রেচেন হুইটমার।
জেলেনস্কির সঙ্গে এ আচরণের আরও প্রতিক্রিয়া এসেছে ডেমোক্র্যাট শিবির থেকে। তারা ইউক্রেন ও জেলেনস্কির পক্ষে দাঁড়িয়েছেন। সিনেটর চাক শুমার, রিপ্রেজেন্টেটিভ হাকিম জেভিস, সিনেটর জিন শাহিন, রিপ্রেজেন্টেটিভ গ্রেগরি মিকস, সিনেটর ট্যামি ডাকওর্থসহ আরও অনেকেই নিজ নিজ বিবৃতিতে বিষয়টি নিয়ে নিজেদের মতামত তুলে ধরেছেন।
ইউরোপের দেশগুলো ইউক্রেনের পাশে
এদিকে পুরো বিষয়টি গোটা বিশ্বে আলোচনা-সমালোচনার ঝড় তুলেছে। কেউ ট্রাম্পের পক্ষ নিয়েছেন, কেউ আবার জেলেনস্কির পক্ষ। তবে ইউরোপের দেশগুলো দাঁড়িয়েছে ইউক্রেনের পাশে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিবেশী দেশ কানাডাও ইউক্রেনের পক্ষে টুইট করেছে।
কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এক পোস্টে লিখেছেন, রাশিয়া অবৈধভাবে ও অন্যায্যভাবে ইউক্রেনে অনুপ্রবেশ করেছে। তিন বছর ধরে ইউক্রেনীয়রা সাহস ও প্রতিরোধের সঙ্গে লড়ে যাচ্ছেন। তারা গণতন্ত্র, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের জন্য লড়ছেন, যা আমাদের সবার কাছে মূল্যবান। কানাডা ন্যায্য ও দীর্ঘমেয়াদি শান্তি অর্জনে ইউক্রেনীয়দের পাশে থাকা অব্যাহত রাখবে।
জার্মানির চ্যান্সেলর ওলাফ শলৎস বলেছেন, ইউক্রেনের নাগরিকদের চেয়ে বেশি আর কেউ শান্তি কামনা করে না! পাশাপাশি তিনি জানিয়ে দেন, ইউক্রেন জার্মানি ও ইউরোপের ওপর নির্ভর করতে পারে।
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ বলেছেন, ‘রাশিয়া এখানে আগ্রাসী ভূমিকা পালন করেছে। ইউক্রেন আগ্রাসনের শিকার হয়েছে। আমি মনে করি, তিন বছর আগে ইউক্রেনকে সহায়তার ও রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের সিদ্ধান্ত নিয়ে ঠিক করেছি এবং আমরা এটি করা অব্যাহত রাখব।’
ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি বলেছেন, প্রতিটি বিভক্তি পশ্চিমকে দুর্বল করছে এবং তাদের পক্ষে কাজ করছে যারা তারা আমাদের সভ্যতার পতন দেখতে চায়। তিনি আরও বলেন, বিভক্তি কারও জন্যই সুফল বয়ে আনবে না।
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কেইর স্টারমারের মুখপাত্র জানিয়েছেন, ইউক্রেনের জন্য তাদের অটুট সমর্থন এবং দেশটি যাতে সার্বভৌমত্ব ও সুরক্ষার ভিত্তিতে দীর্ঘমেয়াদি শান্তি অর্জন করতে পারে, সে জন্য তাদের ভূমিকা অব্যাহত থাকবে।
ইউক্রেনের পক্ষে আরও বিবৃতি দিয়েছেন অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি অ্যালবানিজ, ডেনমার্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লার্স লোকে রাসমুসেন, ইউরোপিয়ান কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডের লিয়েন, মলদোভার প্রেসিডেন্ট মায়া সান্ডু ও স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো শ্যানচেজ।
অন্যদিকে হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর অরবান নিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, দৃঢ় ব্যক্তিরা শান্তি প্রতিষ্ঠা করে, দুর্বল ব্যক্তিরা যুদ্ধে জড়ায়। আজ ডোনাল্ড ট্রাম্প শান্তির জন্য সাহসের সঙ্গে দাঁড়িয়েছিলেন। যদিও তা অনেকের জন্যই হজম করা কঠিন ছিল। ধন্যবাদ, প্রেসিডেন্ট।
এদিকে হোয়াইট হাউস থেকে বিদায় নেওয়ার পর জেলেনস্কিও টুইট করেছেন। সে টুইটে তিনি ধন্যবাদ জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রকে, যুক্তরাষ্ট্রের জনসাধারণকে এবং দেশটির প্রেসিডেন্টকে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এক পোস্টে জেলেনস্কি লিখেছেন, ‘ধন্যবাদ আমেরিকা, ধন্যবাদ আপনাদের সমর্থনের জন্য, সফরের জন্যও ধন্যবাদ। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট, কংগ্রেস ও আমেরিকান জনসাধারণকেও ধন্যবাদ। ইউক্রেন ন্যায্য ও দীর্ঘমেয়াদি শান্তি চায় এবং আমরা ঠিক সেটির জন্যই কাজ করছি।’
তিনি আরও লিখেছেন, ‘আমাদের জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যে ইউক্রেনের কথা সবাই শুনবে এবং কেউ এ বিষয়ে ভুলে যাবে না। যুদ্ধ চলাকালেও নয়, পরেও নয়। ইউক্রেনের মানুষের জন্য এটি জানা গুরুত্বপূর্ণ যে তারা একাকী নন, তাদের স্বার্থও প্রতিটি দেশে, বিশ্বের প্রতিটি কোনায় রক্ষা হচ্ছে।’
বাদানুবাদ চলাকালে জেলেনস্কিকে লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স অভিযোগ করেছিলেন যে তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে ধন্যবাদ দিচ্ছেন না। তার কথার উত্তরে জেলেনস্কি বলেন, ‘আমি ধন্যবাদ দিয়েছি।’ এ কারণেই হয়তো বাদানুবাদের পর করা টুইটে চারবার ধন্যবাদ দিয়েছেন জেলেনস্কি।
জেলেনস্কিকে নিজ আচরণের জন্য ক্ষমা চাইতে হবে, এমন রবও উঠেছে এরই মধ্যে। যুক্তরাষ্ট্রের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ও দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও পৃথকভাবে জানিয়েছেন, তাদের কিছু করার নেই। এ সমস্যার সমাধান হতে পারে শুধু জেলেনস্কির ক্ষমা চাওয়ার মধ্য দিয়ে।
হোয়াইট হাউস থেকে বিদায় নেওয়ার পর জেলেনস্কি ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, তিনি ক্ষমা চাইবেন না। তবে জেলেনস্কি এটিও মেনে নিয়েছেন যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রকাশ্যে বিবাদ দুই দেশের জন্যই ভালো কিছু বয়ে আনবে না। সূত্র: বিবিসি, সিএনএন, রয়টার্স