ইউরোপের নেতারা গত বৃহস্পতিবার প্রতিরক্ষায় আরও খরচ বাড়ানোর বিষয়ে এবং ইউক্রেনের পাশে দাঁড়াতে একমত হয়েছেন। ব্রাসেলসে ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিরক্ষা সম্মেলনে এ সিদ্ধান্ত হয়।
ইউরোপের দেশগুলো আশঙ্কা করছে যে, ইউক্রেন যুদ্ধের পর ইউরোপের যেকোনো দেশে আক্রমণ করে বসতে পারে রাশিয়া। এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেন ও ইউরোপের পাশ থেকে সরতে শুরু করেছে।
ইউক্রেনে সহায়তা দেওয়া আপাতত বন্ধ রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র। ইউরোপকেও বলেছে প্রতিরক্ষা খাতে খরচ বৃদ্ধি করতে। এ রকম একটি বাস্তবতার মধ্য দিয়েই অনুষ্ঠিত হলো ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিরক্ষা সম্মেলন।
বৈঠকে সভাপতিত্ব করেছেন আন্তোনিও কস্টা। তিনি বলেন, ‘আজ আমরা দেখিয়েছি যে ইউরোপীয় ইউনিয়ন চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড়াচ্ছে, ইউরোপের জন্য প্রতিরক্ষা তৈরি করছে এবং ইউক্রেনের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়াচ্ছে।
ব্রাসেলসের বিশেষ প্রতিরক্ষা সম্মেলনে পোলিশ প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্ক বলেছেন, ‘ইউরোপের অবশ্যই এই চ্যালেঞ্জ নিতে হবে, এই হাতিয়ারের দৌড়ে দৌড়াতে হবে এবং জিততে হবে। … ইউরোপের একত্রে রাশিয়ার যেকোনো সামরিক বাহিনীর, অর্থের ও আর্থিক সংঘাতের মোকাবিলা করার বাস্তবিক সক্ষমতা রয়েছে।’
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ গত বুধবার ফরাসি ভোটারদের বলেছেন যে, রাশিয়া তাদের দেশ ও ইউরোপের জন্য হুমকি। পাশাপাশি তিনি এটিও জানান, এখন যা যা হচ্ছে এটি শুধুই প্রথম পদক্ষেপ।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের সম্মেলনের পর মাখোঁ বলেন, ‘ইউক্রেনে যা-ই হোক না কেন, আমাদের ইউরোপে স্বয়ংক্রিয় প্রতিরক্ষা সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে।’
ইউরোপীয় ইউনিয়নের নেতারা ইউক্রেনের সমর্থনের পক্ষেও বিবৃতি দিয়েছেন। তবে সে বিবৃতিতে হাঙ্গেরির জাতীয়তাবাদী নেতা ভিক্টর অরবানের সম্মতি ছাড়া সবাই সম্মত হয়। অরবান ট্রাম্পের মিত্র হিসেবে পরিচিত। এ ছাড়াও সে মস্কোর সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করছে।
ওই বিবৃতিতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৭ দেশের মধ্যে ২৬টির নেতারা উল্লেখ করেছেন, ইউক্রেনকে ছাড়া ইউক্রেন বিষয়ে কোনো আলোচনা হওয়া সম্ভব নয়। পাশাপাশি তারা দেশটিকে সহায়তা দেওয়া বজায় রাখার প্রতিশ্রুতিও দেন বিবৃতিতে।
কস্টা বলেন, ‘আমরা এখানে ইউক্রেনের প্রতিরক্ষায় এসেছি।’ এ সময় তাকে ও ইউরোপীয় কমিশনের চেয়ারম্যান উরসুলা ভন ডের লিয়েনকে হাসতে দেখা যায়। তারা ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকেও সম্মেলনে আন্তরিকভাবে স্বাগত জানায়।
কতটা কঠিন হবে
গত কয়েক দশক ধরে প্রতিরক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভর করেছে ইউরোপ। সেটি থেকে সরে আসা সহজ হবে না। তহবিলে যে ঘাটতি তৈরি হবে, সেটি কীভাবে সবাই ভাগ করে নেবে, তা নিয়ে এখনো বিস্তর আলোচনার জায়গা রয়েছে। পাশাপাশি ফ্রান্সের পারমাণবিক প্রতিরক্ষা কীভাবে ইউরোপ ব্যবহার করবে সেটি নিয়েও সিদ্ধান্ত হওয়া বাকি।
গত বছর ইউক্রেনে যত সহায়তা গেছে, তার ৪০ শতাংশেরও বেশি ওয়াশিংটন একাই দিয়েছে। সামরিক জোট ন্যাটোর বরাতে জানা গেছে এ তথ্য। এখন ইউক্রেনকে সহায়তা দিতে চাইলেও হুট করে সে শূন্যতা পূরণ সম্ভব নয়। তবে কিছু নেতা এখনো আশা ধরে রেখেছেন। তারা মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্রকে হয়তো ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে।
জার্মানির বিদায়ী চ্যান্সেলর ওলাফ শলৎজ বলেছেন, আমাদের অবশ্যই ঠাণ্ডা মাথা ও বুদ্ধিমত্তা দিয়ে নিশ্চিত করতে হবে যে, আসন্ন মাস ও বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন অব্যাহত থাকে, কারণ ইউক্রেনও প্রতিরক্ষার জন্য তাদের সমর্থনের ওপরে নির্ভরশীল।
এদিকে মাখোঁ বলেছেন, ফ্রান্স নিজের পারমাণবিক অস্ত্রের সুরক্ষা সুবিধা অন্যান্য ইউরোপীয় অংশীদারের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার বিষয়ে আলোচনা করতে রাজি। বিষয়টিকে সতর্ক কিন্তু, ইতিবাচকভাবেই নিয়েছেন উপস্থিতরা।
লিথুয়ানিয়ার প্রেসিডেন্ট গিতানাস নসেদা বলেন, এ ধরনের পারমাণবিক সুরক্ষা রাশিয়ার বিপরীতে সত্যিই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। পোল্যান্ড জানায়, এই প্রস্তাবটি নিয়ে আরও আলোচনা করা যায়।
অন্যদিকে চেক রিপাবলিকের পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে জড়িত রাখার প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি নিয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়।
যুক্তরাষ্ট্র যা বলছে
ট্রাম্প গত বৃহস্পতিবার বলছেন, ইউরোপকে অবশ্যই নিজেদের সুরক্ষার জন্য আরও বেশি দায়িত্ব নিতে হবে। ওয়াশিংটন ন্যাটো মিত্রদের রক্ষা করবে কি না সে প্রশ্নেও তিনি সংশয় প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ইউরোপ খরচ না বৃদ্ধি করলে এ রকমটি হবে না।
এদিকে ইউরোপ প্রতিরক্ষা খাতে খরচ বৃদ্ধিতে আগ্রহী। জার্মানির প্রতিরক্ষা ব্যয়ের জন্য ঋণ করার একটি মাত্রা দেওয়া ছিল সাংবিধানিকভাবে। সেটি তারা সরকারিভাবে গত মঙ্গলবার তুলে নেওয়ার চিন্তা করেছে।
এ ছাড়া নরওয়ে ইউক্রেনকে চলতি বছর সহায়তা দেওয়া দ্বিগুণেরও বেশি বাড়াবে বলে জানিয়েছে। ইউক্রেনও নিজেদের প্রতিরক্ষা খাতের খরচ বৃদ্ধি করবে। সূত্র: রয়টার্স