ফিলিস্তিনের রাফার বাইরে গত সপ্তাহের শেষে বুলডোজার দিয়ে একটি গর্ত খুঁড়ে ১৫ জন প্যারামেডিক এবং এক উদ্ধারকর্মীর মরদেহ পাওয়া যায়। মরদেহ গণকবরে খুঁজে পাওয়ার আগে তাদের পরিবার একটি যন্ত্রণাদায়ক অপেক্ষার ভেতর দিয়ে গেছেন।
অন্যদের জীবন বাঁচানোর জন্য যারা নিজেদের জীবন ঝুঁকির মধ্যে ফেলছেন তাদের এমন পরিণতির জন্য মোটেই প্রস্তুত ছিলেন না তাদের পরিবার।
নিহতদের মধ্যে ৪৫ বছর বয়সী প্যারামেডিক সালেহ মোয়ামারের গল্পটি বোধহয় সবচেয়ে করুণ। রেড ক্রিসেন্টের অ্যাম্বুলেন্স অফিসার এবং প্যারামেডিক সালেহ মোয়ামার এর আগেও দুই বার মৃত্যুর কাছাকাছি গিয়ে ফিরে এসেছিলেন।
তার ভাই বিলাল জানান, যুদ্ধের শুরুতে হাসপাতালে রোগীদের পরিবহনের দায়িত্ব পালন করার সময় তার গাড়িতে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী গুলি করে। তখন সালেহের বুকে হৃদপিণ্ডের কাছেই একটি গুলি লাগে। তারপর গুলিবিদ্ধ অবস্থাতেই প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে তিনি তার সহকর্মীদের নিয়ে রেডিওতে দেওয়া নির্দেশাবলী অনুসরণ করে গাড়িটিকে গুলি ছোঁড়ার রেখা থেকে সরে যান।
এর পর তিন মাস হাসপাতালে কাটিয়ে আবার কাজে ফিরেন। কাজের ফেরার কিছুক্ষণ পরেই রাফার কাছে একটি উদ্ধার অভিযানে তার অ্যাম্বুলেন্সে আবার গুলি চালানো হয়। এ সময় তার ডান কাঁধে গুলি লাগে।
পরে ২২ মার্চ রাতের শিফটে ডিউটিতে বের হওয়ার আগে সালেহ তার স্ত্রী, ছয় সন্তান এবং তার ভাইয়ের দুই সন্তানের জন্য প্রচুর গৃহস্থালী দরকারি জিনিসপত্র কিনে রেখে যান। দেখে মনে হচ্ছিল, যেন তার মনে হচ্ছে তিনি আর ফিরে আসবেন না...
এর আগে ২০০৮-০৯ সালে গাজায় ইসরায়েলি আগ্রাসন শুরু হওয়ার সময় সালেহ রেড ক্রিসেন্টে যোগ দেন। তিনি আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যবসায় প্রশাসন বিষয়ে পড়াশোনা করেন। কিন্তু গাজায় চলমান অস্থিরতা ও রক্তপাতের মধ্যে মানুষকে সাহায্য করার জন্য তাৎক্ষণিক কিছু করার আগ্রহ থেকে তিনি একজন প্যারামেডিক হিসেবে প্রশিক্ষণ নিতে শুরু করেন।
বিপদ সত্ত্বেও, নিরীহ জীবন বাঁচানোর জন্য তার প্রচেষ্টাই তাকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করে। এজন্য বেশিরভাগ সময় তিনি অ্যাম্বুলেন্স এবং জরুরি বিভাগে কাটাতেন। অ্যাম্বুলেন্সে কাজ শেষ করার পর, তিনি রেড ক্রিসেন্টের যানবাহন রক্ষণাবেক্ষণ বিভাগে যেতেন এবং সেখানকার নানা ধরণের বৈদ্যুতিক সমস্যা সমাধান করতেন। এমনকি তিনি আহতদের বাড়িতে গিয়ে তাদের খোঁজখবর নেওয়ার জন্য দল গঠন করতেন।
২৩ মার্চ ভোরে যখন রাফাহর তেল আল-সুলতান এলাকায় বিমান হামলায় লোকজন আহত হওয়ার খবর আসে। তখন সালেহ একটি অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে ঘটনাস্থলে যান। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ দেখে তিনি আরও অ্যাম্বুলেন্স ডেকে আহতদের উদ্ধার করে ঘাঁটিতে ফিরে আসেন।
ফিরে এসেই তিনি জানতে পারেন ঘটনাস্থলে পাঠানো আরেকটি অ্যাম্বুলেন্সের সঙ্গে রেডিও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।
এরপর নিখোঁজ মোট ১৩ জন প্যারামেডিক এবং উদ্ধারকর্মীকে খুঁজতে তিনি হাশাশিনে যান। এখানেই শেষবারের মতো তাদের জীবিত দেখা যায়। পরে তাদের সবার মরদেহ এই গণকবর থেকে উদ্ধার করা হয়।
আইডিএফ-এর বিমান হামলায় গত ২৪ ঘণ্টায় ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় নিহত হন ৮৬ জন ফিলিস্তিনি এবং আহত হন আরও অন্তত ২৮৭ জন। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে নিশ্চিত করেছে এসব তথ্য।
২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় অভিযান শুরু করে আইডিএফ। শুক্রবারের অভিযানের পর গত দেড় বছরে গাজা উপত্যকায় মোট নিহতের সংখ্যা ৫০ হাজার ৬০৯ জন এবং আহত এক লাখ ১৫ হাজার ৬৩ জন। এই নিহত এবং আহতদের ৫৬ শতাংশই নারী ও শিশু।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
দিনা/অমিয়/