অগ্নিগর্ভ পাকিস্তানের বেলুচিস্তান প্রদেশ। শুক্রবার (৩০ মে) সন্ধ্যায় সুরাব শহরের দখল নিয়েছে বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মি (BLA)। বড়সড় অভিযান চালিয়ে বিএলএ-র বিদ্রোহীরা শহরের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দপ্তর নিজেদের দখলে নিয়েছে বলে খবর পাওয়া গিয়েছে।
পুলিশ ও কর্মকর্তারা জানান, শুক্রবার দক্ষিণ-পশ্চিম পাকিস্তানের একটি শহরের একটি উচ্চ-নিরাপত্তাসম্পন্ন এলাকায় কয়েক ডজন সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়। এসময় তারা বিভিন্ন ভবন দখল করে নেয়। এছাড়া তারা একজন সরকারি কর্মকর্তাকে তার বাড়িতে হত্যা করে এবং একটি ব্যাংক লুট করে পালিয়ে যায়।
বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মি সূত্রে খবর, তারা সুরাব শহরের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে পুলিশ স্টেশন, লেভি স্টেশন (স্থানীয় আধা-সামরিক বাহিনীর চৌকি), ব্যাঙ্ক এবং অন্যান্য সরকারি কার্যালয়।
সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল এক ভিডিও-তে দেখা যায়, শহরের বিভিন্ন জায়গায় আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে। আগুন ধরানো হয়েছে কয়েকটি পুলিশ স্টেশন এবং কয়েকটি সরকারি ভবনেও।
জানা গিয়েছে, এই অভিযান চলাকালীন একজন স্টেশন হাউস অফিসার (এসএইচও) নিহত হন। তাছাড়া পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনীর কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অস্ত্রশস্ত্র এবং সামরিক বিমান বাজেয়াপ্ত করার দাবি করেছে বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মি।
বিএলএ মুখপাত্র জয়ন্দ বালুচ এক বিবৃতিতে জানান, কোয়েটা-করাচি এবং সুরাব-গিদার এলাকার রাস্তায় অনবরত টহল দিচ্ছে বালোচিস্তান লিবারেশন আর্মি। যার ফলে শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে।
এই ঘটনায় পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে এখনও কিছু জানানো হয়নি। তবে বেলুচিস্তান সরকারের মুখপাত্র শাহিদ রিন্দ জানান, বালোচিস্তান লিবারেশন আর্মির সদস্যরা সুরাব দখল করে একটি ব্যাঙ্ক লুট করেছে এবং বেশ কয়েকটি সরকারি ভবন ও কর্মকর্তাদের বাসভবনে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে।
কেন এই সংঘর্ষ?
বেলুচিস্তান পাকিস্তানের বৃহত্তম প্রদেশ, যেটির দক্ষিণ-পশ্চিমে আফগানিস্তান, ইরান এবং আরব সাগর। এই অঞ্চলের স্বাধীনতার দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন চলছে এবং বালোচিস্তান লিবারেশন আর্মি হলো সেই আন্দোলনের অন্যতম প্রধান শক্তি।
কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে পাকিস্তান সরকা্র বালুচ নাগরিকদের বঞ্চনা এবং শোষণ করে আসছে এই অভিযোগ এনে পাকিস্তান থেকে আলাদা হয়ে পৃথক রাষ্ট্র গড়তে চাইছে বিএলএ বা বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মি । তাদের অভিযোগ এই অঞ্চলের প্রাকৃতিক সম্পদ, বিশেষ করে গ্যাস ও খনিজ পদার্থ ইসলামাবাদ অবৈধভাবে উত্তোলন করছে।
১৯৪৭ সালে ভারত-পাকিস্তান বিভক্তির সময়, বেলুচিস্তান কালাত খানের অধীনে একটি আধা-স্বায়ত্তশাসিত রাজ্য ছিল। বালুচ নেতারা অভিযোগ করেন, পাকিস্তান ১৯৪৮ সালে জোর করে এই অঞ্চলটি নিজেদের সাথে যুক্ত করে। যার ফলে সংঘাত ও বিদ্রোহের সূত্রপাত।
বেলুচিস্তানে ক্রমবর্ধমান বিদ্রোহ
গত এক বছরে বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মির হামলা আরও তীব্র হয়েছে। তারা পাকিস্তানের বিভিন্ন সামরিক শক্তি, চীনা প্রকল্প (যেমন চায়না-পাকিস্তান ইকোনমিক করিডর বা CPEC) এবং বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে হামলা চালিয়েছে।
তবে এবার তারা লড়াইয়ের কৌশল বদলেছে। সম্প্রতি গেরিলা হামলা থেকে সরে এসে অস্থায়ীভাবে শহর বা গুরুত্বপূর্ণ এলাকা দখলের মতো বড় অভিযানে নেমেছে বেলুচ আর্মি।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মিকে সমর্থন করেন স্থানীয়রা। ফলে পাকিস্তানের জন্য বেলুচিস্তান একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। পাশাপাশি এই হামলা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিভাজন বৃদ্ধির আশঙ্কা বাড়িয়ে তুলেছে।
এদিকে এই ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন পাক প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ এবং পাক সেনাপ্রধান আসিম মুনির। সূত্র: এবিসি নিউজ এবং টাইমস নাউ
সুলতানা দিনা/