এইচআইভিতে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা বিশ্বজুড়ে বর্তমানে প্রায় ৪ কোটি। এই মহামারি শুরু হওয়ার পর থেকে মারা গেছে ৪ কোটি ২০ লাখ মানুষ। কিন্তু বহু দশকের পর এবার প্রথমবারের মতো বিজ্ঞানী ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এইচআইভি নির্মূলের বাস্তব সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। ওই আশার নাম ‘লেনাকাপাভির’।
গত ১৮ জুন যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ঔষধ প্রশাসন (এফডিএ) ‘ইয়েজটুগো’ নামে পরিচিত লেনাকাপাভিরকে এইডস চিকিৎসায় ব্যবহারের অনুমোদন দিয়েছে। এটি বিশ্বের প্রথম ইনজেকশনযোগ্য প্রি-এক্সপোজার প্রফিল্যাক্সিস বা প্রিইপি ওষুধ। যেটা এইডস চিকিৎসায় বছরে দুবার ত্বকের নিচে ইনজেকশনের মাধ্যমে ব্যবহৃত হবে। এই ওষুধকে বলা হচ্ছে এইচআইভির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে একটি যুগান্তকারী সাফল্য।
ক্লিনিকাল ট্রায়ালে দেখা গেছে, এই ইনজেকশন যারা নিয়েছেন তাদের মধ্যে ৯৯ দশমিক ৯ শতাংশ এইচআইভি নেগেটিভ হয়েছেন। আর ওই ফলাফলের ওপর ভিত্তি করেই বিজ্ঞানীরা বলছেন, লেনাকাপাভির হতে পারে এক ‘গেম চেঞ্জার’।
বৈশ্বিক স্বাস্থ্য উদ্যোগ- ইউনিটেইডের প্যানডেমিক প্রিপেয়ারর্ডনেস অ্যান্ড রেসপন্স বিভাগের প্রধান কারমেন পেরেজ কাসাস বলেন, ‘এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। আমরা জানতাম ওষুধটি নিরাপদ। তবে এতটা কার্যকর হবে তা জানতাম না। এখন ট্রায়ালে প্রমাণিত হয়েছে, এটি এইচআইভি প্রতিরোধে সবচেয়ে কার্যকর পণ্যের একটি।’
দৈনিক ওষুধ নয়, বছরে দুটি ইনজেকশন
প্রচলিত প্রিইপি পদ্ধতিতে এইচআইভি প্রতিরোধের জন্য প্রতিদিন একটি করে ওষুধ খেতে হয়। কেউ কেউ আবার বিকল্প হিসেবে প্রতি দুই মাসে একটি ইনজেকশন নিয়ে থাকেন। কিন্তু নতুন ওষুধ লেনাকাপাভির এই নিয়ম বদলে দিয়েছে। বছরে মাত্র দুটি ইনজেকশনই এইচআইভি থেকে কার্যকর সুরক্ষা দিতে পারে। এই পদ্ধতি বিশেষভাবে উপকারী সেই সব মানুষের জন্য, যারা প্রতিদিন ওষুধ খাওয়ার নিয়ম মেনে চলতে পারেন না। অনেকের জীবনযাত্রা এমন, যেখানে নিয়মিত ওষুধ খাওয়া সম্ভব হয় না।
পেরেজ কাসাস বলেন, ‘প্রতিদিন ট্যাবলেট খাওয়ার বিষয়টি অনেকের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।’ তিনি বলেন, ‘অনেকে যাতায়াতের সমস্যা বা ওষুধের সহজলভ্যতার অভাবে ওষুধ ঠিকমতো খেতে পারেন না।’
দ্রুত ছড়িয়ে দেওয়ার প্রস্তুতি
লেনাকাপাভিরের আরেকটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো এটি এইচআইভির জীবন চক্রের একাধিক ধাপে কাজ করে, যেখানে বেশির ভাগ অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ কেবল একটিতে কাজ করে। ওষুধটি ইতোমধ্যেই বহু দেশে এইচআইভির চিকিৎসায় ব্যবহারের অনুমোদন পেয়েছে। পেরেজ কাসাস বলেন, ‘এই ওষুধটি যত দ্রুত সম্ভব ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছাতে হবে, যাতে তারা সংক্রমণ থেকে বাঁচতে পারে।’
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) আগামী ১৪ জুলাই লেনাকাপাভির বিষয়ে গাইডলাইন প্রকাশ করতে যাচ্ছে। ইউনিটেইড বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সঙ্গে অংশীদারত্বে ২০২৫ সালের মধ্যে নতুন পরিষেবা গ্রহণকারী দেশগুলোতে ওষুধ ছড়িয়ে দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
প্রধান সমস্যা দাম
লেনাকাপাভিরের সাফল্য কেবল বৈজ্ঞানিক দিক থেকেই নির্ভর করছে না। এর প্রসারের প্রধান বাধা হতে পারে এর উচ্চমূল্য। যুক্তরাষ্ট্রে লেনাকাপাভিরের বার্ষিক মূল্য ২৮ হাজার ডলার (প্রায় ৩৪ লাখ ৩৩ হাজার টাকা)। নির্মাতা প্রতিষ্ঠান গিলিয়েড বলছে, তারা কম দামের সংস্করণ তৈরির চেষ্টা করছে। কিন্তু নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশের জন্য এটি এখনো বড় প্রতিবন্ধকতা।
পেরেজ কাসাসের মতে, এটি ৪০ ডলারের (৫ হাজার টাকা) বেশি হলে তা অনেক দেশই সামাল দিতে পারবে না।
ইতোমধ্যে ইউনিটেইড এ ওষুধ উৎপাদনের জন্য বিনিয়োগ শুরু করেছে, যাতে খরচ কমিয়ে তা সহজলভ্য করা যায়।
অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও লাভজনক
এইচআইভি প্রতিরোধে লেনাকাপাভির ব্যবহার কেবল স্বাস্থ্যগত সাফল্যই নয়। এটি অর্থনৈতিক দিক থেকেও লাভজনক সিদ্ধান্ত হতে পারে। পেরেজ কাসাস বলেন, ‘প্রতিবছর ১৩ লাখ মানুষ এইচআইভিতে সংক্রমিত হচ্ছেন। তাদের সারা জীবনের চিকিৎসার খরচ প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত দাঁড়ায়। ওই তুলনায় লেনাকাপাভির অনেক বেশি সাশ্রয়ী হবে।’
পেরেজ কাসাসের মতে, এখন সবকিছু নির্ভর করছে এক প্রশ্নের ওপর- ‘এইচআইভি নির্মূলে যেসব প্রযুক্তি দরকার, তা আমাদের আছে। এখন প্রশ্ন হলো, ন্যায্য প্রবেশাধিকার আমাদের বৈশ্বিক এজেন্ডায় আছে কি না।’ যদি বিভিন্ন দেশ, দাতা সংস্থা এবং স্থানীয় সম্প্রদায়গুলো এই বাধাগুলো দূর করতে পারে, তাহলে এইচআইভি নিয়ন্ত্রণে বিশ্বের সামনে একটা সময়সীমা নির্ধারণ সম্ভব হতে পারে। সূত্র: আনাদোলু এজেন্সি।