ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় খাদ্যের পর এবার তীব্র জ্বালানিসংকট দেখা দিয়েছে। জ্বালানির অভাবে গাজার ২১ লাখ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা হুমকির মুখে পড়েছে। তারা এখন অনাহারের দ্বারপ্রান্তে। জাতিসংঘ বলছে, গাজায় জ্বালানিসংকট বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। ব্রিটিশ গণমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান গতকাল শনিবার এ-সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।
জাতিসংঘ গতকাল এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, গাজা উপত্যকাজুড়ে প্রয়োজনীয় পণ্য পরিবহন এবং ক্ষতিগ্রস্ত জনগণের জন্য রুটি উৎপাদনকারী বেকারিগুলোর নেটওয়ার্ক পরিচালনা বন্ধ হওয়ার পথে। এসব চালু রাখার জন্য জ্বালানি সরবরাহ প্রয়োজন। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, জ্বালানিসংকটের অর্থ হচ্ছে গাজায় ২১ লাখ মানুষের জীবনযাত্রা ভয়াবহ সংকটের মুখে পড়া। এসব মানুষ ‘অনাহারে’ পতিত হচ্ছেন।
সংবাদদাতারা বলছেন, জ্বালানিসংকটের কারণে গাজায় মানবিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। হাসপাতালগুলো অন্ধকারে নিমজ্জিত। ম্যাটারনিটি, শিশু হাসপাতাল এবং ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট (আইসিইউ) সেবা বন্ধ হওয়ার পথে। জ্বালানির অভাবে অ্যাম্বুলেন্সগুলো অচল হয়ে পড়েছে। সড়ক ও পরিবহনব্যবস্থা বন্ধ হওয়ার পথে। টেলিযোগাযোগব্যবস্থাও অচল হয়ে যাবে। জ্বালানি ছাড়া বেকারি এবং কমিউনিটি কিচেনগুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। নিরাপদ পানি ছাড়াই এখন বাসিন্দাদের চলতে হচ্ছে। রাস্তায় ময়লার স্তূপ জমে আছে, যা দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। জ্বালানির অভাবে এসব ময়লা পরিবহন করা যাচ্ছে না। এই অবস্থা থেকে নানান রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। পরিস্থিতি গাজাকে জীবনযাপনের একেবারে প্রান্তিক পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছে। একে একেবারে মৃত্যুর কাছাকাছি বলেও উল্লেখ করা যায়।
গত ১৩০ দিনের মধ্যে চলতি সপ্তাহে গাজায় জ্বালানি পৌঁছানোর পরিমাণ সামান্য। জাতিসংঘ একে স্বাগত জানালেও প্রয়োজনের তুলনায় তা যৎসামান্য বলে তারা জানিয়েছে।
আরও ২৮ ফিলিস্তিনি নিহত
এদিকে গতকাল শনিবার গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি বিমান হামলায় কমপক্ষে ২৮ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। নিহতদের চারজন শিশু। হাসপাতালের কর্মকর্তারা এ তথ্য জানিয়েছেন। শুক্রবার গভীর রাত থেকে শুরু হওয়া ইসরায়েলি বিমান হামলার পর মধ্য-গাজার দেইর আল-বালাহ এলাকায় কমপক্ষে ১৩ জন নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে দুই নারী এবং চার শিশু রয়েছে বলে আল-আকসা শহিদ হাসপাতালের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। নাসের হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, গাজার দক্ষিণাঞ্চলের খান ইউনিসে ইসরায়েলি বিমান হামলায় আরও চারজন নিহত এবং ১৫ জন আহত হয়েছেন। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, গত ৪৮ ঘণ্টায় ইসরায়েলি সৈন্যরা গাজা উপত্যকায় প্রায় ২৫০টি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায়।
ত্রাণ নিতে প্রাণ গেল ৭৯৮ ফিলিস্তিনির
জাতিসংঘ জানিয়েছে, গত ছয় সপ্তাহে ত্রাণকেন্দ্রে যাওয়া এমন অন্তত ৭৯৮ জন ফিলিস্তিনিকে হত্যা করা হয়েছে। বিতর্কিত এই ত্রাণকেন্দ্রগুলো পরিচালনা করছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সমর্থিত সংস্থা গাজা হিউম্যানিটারিয়ান ফাউন্ডেশন (জিএইচএফ)। গাজায় জিএইচএফ কার্যক্রম শুরু করে গত ২৬ মে। এর আগে টানা ১১ সপ্তাহ উপত্যকাটিতে ত্রাণ প্রবেশ বন্ধ রেখেছিল ইসরায়েল। জিএইচএফের ত্রাণকেন্দ্র এমন সব স্থানে গড়ে তোলা হয়েছে যেখানে ইসরায়েলি সেনা মোতায়েন রয়েছেন। সংস্থাটির দেওয়া খাবারের মান নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
ভেঙে যাচ্ছে যুদ্ধবিরতির আলোচনা
কাতারে ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যেকার যুদ্ধবিরতি এবং জিম্মি মুক্তি চুক্তি নিয়ে চলমান পরোক্ষ আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার পথে বলে জানিয়েছেন আলোচনার সঙ্গে যুক্ত ফিলিস্তিনি কর্মকর্তারা। বিবিসিকে একজন শীর্ষ ফিলিস্তিনি কর্মকর্তা বলেন, ‘ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর যুক্তরাষ্ট্র সফরের সময় ইসরায়েলের প্রতিনিধিরা শুধু সময়ক্ষেপণ করেছেন। ইসরায়েল দোহায় এমন একটি প্রতিনিধিদল পাঠিয়েছে যাদের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কোনো ক্ষমতাই নেই। বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার এবং মানবিক সহায়তা বিতরণের পদ্ধতি সম্পর্কিত প্রশ্ন।
গত বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্র ছাড়ার আগে নেতানিয়াহু বেশ আশাবাদী সুরে বলেন, ‘আমি আশা করি, কয়েক দিনের মধ্যেই আমরা একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে পারব। প্রস্তাবিত চুক্তির আওতায় সম্ভাব্য ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতির সময়কালে হামাসের হাতে থাকা জীবিত ২০ জন জিম্মির মধ্যে ১০ জনকে মুক্তি দেওয়া হবে। একই সঙ্গে মৃত ৩০ জন জিম্মির ১৫ জনের মৃতদেহ ফেরত দেওয়া হবে।’
গত রবিবার থেকে দোহায় ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে আট দফা পরোক্ষ আলোচনা হয়েছে। আলোচনায় মধ্যস্থতা করেন কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুর রহমান আল থানি এবং মিসরের গোয়েন্দা কর্মকর্তারা। যুক্তরাষ্ট্রের দূত ব্রেট ম্যাকগার্কও ছিলেন সেখানে। মধ্যস্থতাকারীরা ইসরায়েলি ও হামাস প্রতিনিধিদের মধ্যে মৌখিক ও লিখিত অসংখ্য বার্তা আদান-প্রদান করেছেন। সেখানে ইসরায়েলের সামরিক, নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক পর্যায়ের প্রতিনিধিরাও ছিলেন। তবে শুক্রবার রাতে আলোচনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ফিলিস্তিনের একাধিক কর্মকর্তা বিবিসিকে জানান, ‘এই আলোচনা এখন প্রায় ভেস্তে যাওয়ার পর্যায়ে রয়েছে।’ তারা বলেন, ‘দুই পক্ষের মধ্যে মূল দুটি বিষয়ে মতপার্থক্য রয়ে গেছে। সেই দুটি বিষয় হচ্ছে, গাজায় মানবিক সহায়তা পাঠানো এবং ইসরায়েলি বাহিনী কতটা পিছু হটবে তা নিয়ে।’
হামাস বলছে, গাজায় জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সংস্থার মাধ্যমে ত্রাণ ঢুকতে হবে এবং বিতরণও করতে হবে তাদের মাধ্যমেই। অন্যদিকে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত গাজা হিউম্যানিটারিয়ান ফাউন্ডেশনের (জিএইচএফ) মাধ্যমে ত্রাণ বিতরণ অব্যাহত রাখার পক্ষে চাপ সৃষ্টি করেছেন ইসরায়েলি প্রতিনিধিরা। মধ্যস্থতাকারীরা বলছেন, মানবিক সহায়তা বিতরণ নিয়ে কিছুটা অগ্রগতি হলেও এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক চুক্তি হয়নি। তবে সবচেয়ে বড় জটিলতা তৈরি হয়েছে গাজা থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার নিয়ে।
তুরস্কের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা আনাদোলু এজেন্সির খবরে বলা হয়েছে, গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় গত শুক্রবার জানিয়েছে, ২০২৩ সালের অক্টোবরে শুরু হওয়া গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলের গণহত্যামূলক যুদ্ধে এখন পর্যন্ত অন্তত ৫৭ হাজার ৮২৩ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।