ফ্রান্সে চার দশকেরও বেশি সময় ধরে কারাগারে থাকার পর, লেবাননের বামপন্থী কর্মী জর্জেস ইব্রাহিম আবদুল্লাহ শুক্রবার (২৫ জুলাই) কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছেন। ১৭ জুলাই প্যারিসের একটি আপিল আদালত তাকে অবিলম্বে ফ্রান্স ছেড়ে যাওয়ার শর্তে মুক্তি দেয়। এটি আধুনিক ইউরোপীয় ইতিহাসের দীর্ঘতম সময় রাজনৈতিক আটকের ঘটনা।
প্রায় ৪০ বছর কারাভোগের পর তাকে লেবাননের হেফাজতে রাজধানী বৈরুতে স্থানান্তর করা হয়েছে।
প্রায় জীবন সায়াহ্নে পা ফেলা ৭৪ বছর বয়সী ধূসর-দাড়িওয়ালা আবদুল্লাহর মুক্তিকে তার সমর্থকরা দীর্ঘদিনের অপ্রত্যাশিত একটি ন্যায়বিচার হিসেবেই দেখছে। কিন্তু তার নাম ইতিহাসের দূরবর্তী এবং জটিল একটি অধ্যায়ের কথা মনে করিয়ে দেয়।
প্যারিসে মার্কিন সামরিক অ্যাটাশে চার্লস রবার্ট রে এবং ইসরায়েলি কূটনীতিক ইয়াকভ বারসিমানটভ হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে আবদুল্লাহকে ১৯৮৪ সালে আটক করা হয় এবং ১৯৮৭ সালে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। যদিও তিনি সবসময়ই এই অপরাধে তার জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করেছেন।
কারাগারে থাকেও আবদুল্লাহ কখনো নিজের মতাদর্শের প্রতি দুর্বল হননি, বিশেষ করে তার প্রতিষ্ঠিত প্রতিরোধ আন্দোলন 'লেবানিজ আর্মড রেভোলিউশনারি ফ্যাকশনস' থেকেও নিজেকে দূরে রাখেননি।
এটি একটি মার্কসবাদী দল। ফিলিস্তিনি এবং প্যান-আরব সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোতে দলটির উল্লেখযোগ্য যোগসূত্র ছিল। তারা লেবাননের মাটি থেকে বিদেশি শক্তি - বিশেষ করে ইসরায়েলি শক্তিকে বিতাড়িত করার চেষ্টা করেছিল।
বছরের পর বছর ধরে আদালতের একাধিক রায়ে তার মুক্তির সুপারিশ করা সত্ত্বেও বিভিন্ন রাজনৈতিক চাপ - বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলেরের চাপের কারণে আবদুল্লাহ কারাগারেই ছিলেন। ১৯৯৯ সালে তার ন্যূনতম সাজা পূর্ণ হলেও তিনি কারাগারেই ছিলেন। এমনকি প্যারোলের জন্য একাধিক আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হয়।
সম্প্রতি প্যারিসের আপিল আদালত ২৫ জুলাই থেকে তার মুক্তির আদেশ দেয়। মুক্তির শর্ত দেওয়া হয়, তিনি ফরাসি ভূখণ্ড ত্যাগ করবেন এবং আর কখনো ফিরে আসবেন না।
নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে একজন ফরাসি ইতিহাসবিদ বলেন, 'কারো কারো কাছে তিনি একজন নায়ক, কারো কারো কাছে তা নন।'
আবদুল্লাহ উত্তর লেবাননের তার নিজ শহর কুবাইয়াতে -কেবল একজন স্বাধীন মানুষ হিসেবে নয়, বরং একজন প্রতিরোধ যোদ্ধা হিসেবে ফিরছেন। লেবাননে তাকে নিয়ে জনসাধারণ অনুষ্ঠান আয়োজনেরও পরিকল্পনা করছে।
তাকে স্বাগত জানাতে তার পরিবার থেকে শুরু করে দেশটির বিভিন্ন পেশার কর্মকর্তা, রাজনৈতিক নেতা, এবং তার মুক্তির প্রচারণায় লড়াই করা ছাত্রগোষ্ঠী, মিডিয়া ব্যক্তিত্ব, ট্রেড ইউনিয়নবাদী, মানবাধিকার সমর্থক, সাংস্কৃতিক কণ্ঠস্বর এবং ফ্রান্স এবং তার বাইরের কর্মীরা যারা তার মুক্তি লাভের ক্ষেত্রে চাপ সৃষ্টি করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন, তাদের সবাই উপস্থিত থাকবেন।
তার মুক্তিকে স্বাগত জানানো প্রথম রাজনৈতিক শক্তিগুলো মধ্যে আছে লেবাননের কমিউনিস্ট পার্টি।
এছাড়া, হিজবুল্লাহ আবদুল্লাহকে ‘প্রতিরোধের নায়ক এবং প্রত্যেক বন্দী যোদ্ধা এবং সম্মানিত ব্যক্তির প্রতীক যিনি অত্যাচারীদের মুখে মর্যাদার পতাকা তুলে ধরেছিলেন’ হিসাবে বর্ণনা করেছে।
লেবানিজ বাহিনীর যোগাযোগ প্রধান চারবেল জাব্বুর তাকে নিয়ে মন্তব্য করেন, আবদুল্লাহর মুক্তি প্রতীকীভাবে লেবাননের গৃহযুদ্ধের অধ্যায় বন্ধ করতে সাহায্য করছে। এবার যুদ্ধের যুগ শেষ - সম্পূর্ণরূপে শেষ হতে চলেছে। আবদুল্লাহ তার সাজা ভোগ করেছেন এবং মুক্তি পাচ্ছেন।
সুলতানা দিনা/