যুক্তরাষ্ট্র ২০০৮ সালের পর এই প্রথম যুক্তরাজ্যে পরমাণু বোমা মোতায়েন করেছে। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের কাছে ইউরোপের নিরাপত্তার প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতির অঙ্গীকার প্রমাণের জন্যই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
১৬ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের একটি সামরিক বিমানকে ট্রান্সপন্ডার খোলা রেখে উড্ডয়ন করতে দেখা গেছে। ট্রান্সপন্ডার খোলা রেখে কোনো বিমান উড্ডয়ন করলে তার গতিবিধি শনাক্ত করা যায়। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক এবং উন্মুক্ত ডেটা সূত্রের তথ্যমতে, বিমানটি যুক্তরাষ্ট্রের পরমাণু অস্ত্রের গুদাম নিউমেক্সিকোর আলবুকুয়ের্ক এর কির্টল্যান্ড বিমানঘাঁটি থেকে যুক্তরাজ্যের লেকেনহিথ বিমানঘাঁটিতে উড়ে গেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের পরমাণু অস্ত্র স্থানান্তরের জন্য মুখ্য ভূমিকা পালনকারী বিমানগুলোর মধ্যে অন্যতম সি-১৭। প্যাসিফিক ফোরামের ইউরোপভিত্তিক সিনিয়র ফেলো উইলিয়াম আলবারকু বলেছেন, ফ্লাইটটি তৃতীয় কোনো দেশের ওপর দিয়ে যায়নি।
যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের মধ্যে পরমাণু অস্ত্রের অবস্থান বিষয়ে কোনো মন্তব্য না করার দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বাজেট পর্যালোচনায় দেখা গেছে, লেকেনহিথ ঘাঁটিতে পরমাণু অস্ত্রের নিরাপত্তায় দীর্ঘদিন ধরে কাজ চলছে, সেখানে এই কাজে লাখ লাখ ডলার ব্যয় করা হচ্ছে। পরমাণু স্থাপনার নিরাপত্তাকে পেন্টাগন সাধারণত ‘জামিন’ স্থাপনা হিসেবে বর্ণনা করে।
যুক্তরাষ্ট্রের বিমান যে পরমাণু অস্ত্র বহন করেছে, তা খুব সম্ভবত বি-৬১-১২ থার্মোনিউক্লিয়ার বোমা। স্নায়ুযুদ্ধের পর ইউরোপে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত পরমাণু অস্ত্র মোতায়েনের সংখ্যা বেড়েছে।
ফেডারেশন অব আমেরিকান সায়েন্টিস্টস নিউক্লিয়ার ইনফরমেশন প্রজেক্টের পরিচালক হ্যান্স ক্রিস্টেনসেন বলেন, খুবই জোরালো ইঙ্গিত আছে যে, যুক্তরাষ্ট্র পরমাণু অস্ত্র যুক্তরাজ্যে স্থানান্তর করেছে।
আলবারকু বলেছেন, ট্রান্সপন্ডার খোলা রেখে ফ্লাইট পরিচালনার অর্থ হলো, ইউরোপে পরমাণু সক্ষমতা যে কমানো হয়নি তা যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়াকে দেখাতে চায়। ন্যাটো কর্মকর্তারা তাৎক্ষণিকভাবে এ বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান।
যুক্তরাজ্যে যুক্তরাষ্ট্রের পরমাণু অস্ত্র ফিরে আসা কোনো ছোট ব্যাপার নয় উল্লেখ করে আলবারকু বলেন, ন্যাটোর অবস্থানকে শক্তিশালীকরণের দিকে নিয়ে যেতে আরও বড় কিছু করার ইঙ্গিত দিতেই এই অস্ত্র স্থানান্তর করা হয়েছে।
রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো সিদ্ধার্থ কুশল বলেছেন, পরমাণু অস্ত্র স্থানান্তর এই ইঙ্গিত দেয় যে, যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপে আরও সহজলভ্য পরমাণু অস্ত্র সরবরাহ করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং নিজের বাহিনীর জন্য বিকল্পের দুয়ার খোলা রাখছে।
কুশল আরও বলেন, রাশিয়ার অকৌশলগত পরমাণু অস্ত্র মোতায়েনের হুমকি মোকাবিলায় বি-৬১ মোতায়েন ভূমিকা পালন করবে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইউক্রেন ইস্যুতে ওয়াশিংটনের প্রস্তাব মেনে নিতে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ওপর চাপ দিয়ে আসছেন। তিনি এ জন্য রুশ প্রেসিডেন্টকে ৫০ দিন সময় বেঁধে দিয়েছেন। সোমবার ট্রাম্প বলেছেন, এই সময়সীমা এখন ১০ থেকে ১২ দিন।
যুক্তরাজ্য গত মাসে ঘোষণা দেয় যে, যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে দেশটি এক ডজন এফ-৩৫-এ জেট বিমান কিনবে। এই বিমানগুলো বি-৬১-১২ পরমাণু অস্ত্র বহনে সক্ষম। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এই বিমানগুলো ন্যাটোর পরমাণু মিশনে কাজ করার জন্য অপেক্ষমাণ থাকবে।
চলতি সপ্তাহে ব্রিটেনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের আপডেট নথিতে জানানো হয়েছে, ইউরোপে যুক্তরাষ্ট্রের মোতায়েন করা ন্যাটোর পরমাণু প্রতিরোধ ক্ষমতা উন্নয়নে কাজ করবে লন্ডন।
বুলেটিন অব দ্য অ্যাটোমিক সায়েন্টিস্টসের তথ্যমতে, বি-৬১-১২ থার্মোনিউক্লিয়ার গ্রাভিটি বোমা যে ওয়ারহেড বহন করতে সক্ষম তার পাল্লা দশমিক তিন কিলোটন থেকে শুরু করে ৫০ কিলোটন পর্যন্ত। এটি এফ-৩৫-এ বিমান থেকে শুরু করে ন্যাটোর জন্য যুক্তরাষ্ট্রের অন্য বিমানগুলোতেও বহন করা যায়। আগের বি-৬১ মডেলের পরিবর্তে বি-৬১-১২ আরও উন্নততর। ক্রিস্টেনসেনের তথ্যমতে, যুক্তরাজ্যে পরমাণু বোমা মোতায়েনের অর্থ হলো ন্যাটোর ৬টি দেশসহ ইউরোপের ৭ দেশে পরিপূর্ণভাবে পরমাণু বোমা মোতায়েন করা হলো।