জের্স রেয়েস নিষিদ্ধ গ্যংয়ের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্র থেকে নির্বাসিত করা ২৫১ জন ভেনেজুয়েলিয়ান অভিবাসীর মধ্যে একজন। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের এই দাবি রেয়েস এবং আরও অনেকেই অস্বীকার করেন।
সেগুলো তার জীবনের সবচেয়ে খারাপ ১২৫ দিন। বিদেশী কারাগারে বন্দী নির্যাতনের শিকার এই ব্যক্তি কখনো মুক্তি পাবেন কিনা সেটিও তখন তিনি জানতেন না। তিনি জানান,এল সালভাদরের নিজেকে তিনি একজন জীবন্মৃত ভাবতেন।
রেয়েস সেকোটে তার চার মাসের আটক থাকার যন্ত্রণাদায়ক অভিজ্ঞতার বর্ণনা করতে গিয়ে জানান, এই কারাগারে বন্দীদের ঘন ঘন প্রহরীরা মারধর করত। তাদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে দেয়া হতো না। এছাড়া, কখনও কখনও তাদেরকে আইনজীবীর সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ দেয়া হতো না।
তিনি জানান, একজন কারা কর্মকর্তা তাদের বলেছিলেন, ‘এই পৃথিবীর নরক তাদের স্থায়ী আবাসস্থল হবে।’
নির্বাসিত এই অভিবাসী জানান, প্রতিদিন ভোর ৪টার দিকে একবার তাদের গোসল করার অনুমতি দেওয়া হতো। এমনকি পান করার জন্য তাদের আলাদা করে বিশুদ্ধ পানি দেওয়া হতো না, সাধারণ কাজে ব্যবহারের পানিই তাদের পান করা লাগতো।
অনেক সময় রক্ষীরা তার সেলে ঢুকে মারধর করতো এবং শাস্তি হিসেবে তাকে একটি ছোট কক্ষে পাঠিয়ে দিতো বলেও তিনি জানান।
এদিকে, অভিবাসীদের নির্যাতনের দাবির বিষয়ে সিএনএন সালভাদোরান প্রেসিডেন্টের সঙ্গে যোগাযোগ করে এখনও কোনও প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। অথচ অতীতে, দেশটির সরকার দাবি করে তারা জাতীয়তা নির্বিশেষে তাদের হেফাজতে থাকা ব্যক্তিদের মানবাধিকারকে সম্মান করে এবং তাদের কারা ব্যবস্থা নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলার মান মেনে চলেন।
সিএনএন-এর সাথে কথা বলা বেশ কয়েকজন সাবেক বন্দি অভিযোগ করেছেন, পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করার দাবিতে অনশন এবং ধর্মঘট করার জন্য প্রায়শই রক্ষীরা তাদের মারধর করেছে এবং এমনকি রাবার বুলেট দিয়ে গুলি করেছে।
রেয়েস জানান, অর্থনৈতিক নিরাপত্তাহীনতার কারণে তিনি গত বছর ভেনেজুয়েলা ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয়ের জন্য আবেদন করেছিলেন। কিন্তু মার্চ মাসে, মার্কিন হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ তাকে অবৈধভাবে দেশে থাকা এবং কুখ্যাত গ্যাং ট্রেন ডি আরাগুয়ার সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে অভিযুক্ত করে। তারা দাবি করে, তার ট্যাটু টিডিএ গ্যাংয়ের সদস্য হওয়ার প্রমাণ দেয়। তার ট্যাটুগুলোর সঙ্গে কুখ্যাত গ্যাং ট্রেন ডি আরাগুয়ার ট্যাটু খুবই সামঞ্জস্যপূর্ণ।
কিন্তু রেয়েস জানান, যে ট্যাটুতে তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয় তাতে একটি মুকুট এবং ফুটবল আছে, যা তার প্রিয় দল রিয়াল মাদ্রিদের প্রতিনিধিত্ব করে।
অন্যদিকে, সিএনএন যাচাই করে জানায়, রেয়েসের তার নিজের দেশে কোনও অপরাধমূলক রেকর্ড নেই।
গত ১৬ মার্চ সেকোটে পাঠানো ভেনেজুয়েলার অভিবাসীদের প্রথম দলটি দুই সপ্তাহ বাইরের জগৎ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন ছিল এবং অন্য কেউ তাদের পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত কিনা সেটিও তারা জানত না।
কিন্তু মার্চের শেষে, ভেনেজুয়েলার বন্দীদের একটি দ্বিতীয় দল এই কারাগারে এসে পৌঁছায়। তাদের কাছ থেকে, রেয়েস প্রথমবারের মতো জানতে পারেন যে, তাদের গল্প বিশ্বব্যাপী মনোযোগ আকর্ষণ করছে এবং তাদের আত্মীয়রা তাদের মুক্তির জন্য মরিয়া হয়ে লড়াই করছে।
আটক হওয়ার দুই মাস পর, রেড ক্রসের সদস্যরা বন্দীদের সঙ্গে দেখা করার সময় আরেকটি আশাব্যঞ্জক বার্তা আসে। সংস্থাটি তাদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছিল। আটক অভিবাসীরা কয়েকটি সংগঠনের মাধ্যমে ছোট ছোট বার্তার মাধ্যমে তাদের কথাগুলো নোট করে তাদের পরিবারের কাছে পৌঁছে দিত।
পরে, কারাকাস এবং ওয়াশিংটন ভেনেজুয়েলায় আটক ১০ জন মার্কিন নাগরিক এবং কয়েক ডজন রাজনৈতিক বন্দীর বিনিময়ে এল সালভাদর থেকে ২৫২ জন ভেনেজুয়েলা অভিবাসীর মুক্তির নিশ্চয়তা দেয়।
অবশেষে, মঙ্গলবার (৫ আগস্ট) রাতে রেয়েস মাচিকেসে ফিরে আসেন। আত্মীয়স্বজন এবং প্রতিবেশী সহ প্রায় ৬০০ জনের একটি গর্জনকারী জনতা তাকে স্বাগত জানায়। এদিন তার বাড়িটি হাতে আঁকা ব্যানার এবং তার প্রিয় ক্লাব রিয়াল মাদ্রিদের ফুটবল-থিমযুক্ত বেলুন দিয়ে সাজিয়ে দেয়া হয়।
সুলতানা দিনা/