লন্ডনের মেয়র সাদিক খান বলেছেন, ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার এমন আচরণ করেছেন যাতে প্রমাণ হয় তিনি “বর্ণবাদী, নারী বিদ্বেষী, যৌন বৈষম্যমূলক ও ইসলামবিদ্বেষী।”
গতকাল জাতিসংঘে দেওয়া বক্তব্যে ট্রাম্প সাদিক খানকে নিয়ে কটাক্ষ করার পর এমন প্রতিক্রিয়া জানান তিনি।
নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ভাষণ দিতে গিয়ে ট্রাম্প বলেন, লন্ডনে “এক ভয়ংকর মেয়র আছে, আর এর ফলে শহরটা বদলে গেছে, অনেক বদলে গেছে।” ট্রাম্প আরও দাবি করেন, “এখন তারা শরিয়াহ আইন চাইছে।”
বিবিসি লন্ডনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সাদিক খান বলেন, “মানুষ ভাবছে, আসলে এমন কী আছে এই মুসলিম মেয়রের মধ্যে—যিনি একটি উদার, বহু সংস্কৃতির, প্রগতিশীল এবং সফল শহরের নেতৃত্ব দিচ্ছেন—যে কারণে আমি ডোনাল্ড ট্রাম্পের মাথার ভেতর ভাড়া ছাড়া বসবাস করছি।”
তিনি যোগ করেন, “আমার মনে হয় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রমাণ করেছেন তিনি বর্ণবাদী, নারী বিদ্বেষী, যৌন বৈষম্যমূলক এবং ইসলামবিদ্বেষী।”
ইসলামবিদ্বেষ প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, “মানুষ যখন কিছু বলে, কিছু করে, কোনোভাবে আচরণ করে—তখন আপনাকে সেটাই বিশ্বাস করতে হবে।”
ট্রাম্প তাকে “ভয়ংকর মেয়র” বলায় জবাবে সাদিক বলেন, তিনি কৃতজ্ঞ যে রেকর্ডসংখ্যক মার্কিনি লন্ডনে আসছেন। তিনি আরও বলেন, বিভিন্ন মানদণ্ড অনুযায়ী লন্ডনকে “সংস্কৃতির দিক থেকে বিশ্বের এক নম্বর শহর” বলা হয়।
হোয়াইট হাউস এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য জানায়নি।
এ মাসের শুরুর দিকে ইংল্যান্ডের ন্যায়বিচারমন্ত্রী সারা স্যাকম্যান সংসদে বলেন, শরিয়াহ আইন “ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের আইনের অংশ নয়।” যুক্তরাজ্যে শরিয়াহ কাউন্সিলসহ কিছু ধর্মীয় আদালত থাকলেও সেগুলোর বেশিরভাগ কাজ ধর্মীয় বিয়ে বা আর্থিক বিষয়ক সালিশি নিয়ে। তবে সরকার স্পষ্ট করেছে, এসব রায় আইনত বাধ্যতামূলক নয়।
গত বুধবার মন্ত্রিসভার সদস্য প্যাট ম্যাকফ্যাডেন সাদিক খানের পক্ষ নিয়ে বলেন, লন্ডনের মেয়র আর মার্কিন প্রেসিডেন্টের “কিছুদিনের বিরোধ আছে” এবং ট্রাম্পের দাবি যে লন্ডন “শরিয়াহ আইন চাইছে” যা তিনি প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি বলেন, যুক্তরাজ্যে কেবল ব্রিটিশ আইনই কার্যকর।
অন্যদিকে ‘রিফর্ম ইউকে’ দলের নেতা নাইজেল ফারাজ বলেন, ট্রাম্পের ব্যাপারে “কখনও আক্ষরিক অর্থে কিছু নেওয়া উচিত নয়, তবে সবসময় গুরুত্ব দিয়ে নিতে হবে।” এলবিসি রেডিওতে এক ফোনালাপে তিনি যোগ করেন, “ট্রাম্প কি ঠিক বলেছেন যে লন্ডনে শরিয়াহ একটি ইস্যু? হ্যাঁ। এটা কি এখনই কোনো বড় সংকট? না। মেয়র কি সরাসরি শরিয়াহর সঙ্গে যুক্ত? না।”
তিনি বলেন, “আসলে ট্রাম্প যা বোঝাতে চেয়েছেন তা হলো পশ্চিমা সভ্যতা নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিতে আছে—নিজেদের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য আর পরিচয় হারানোর ঝুঁকি।”
স্যাকম্যান সংসদে আরও বলেন, “মানুষ যদি খ্রিস্টান, ইহুদি বা অন্য ধর্মীয় আদালতের মতো শরিয়াহ কাউন্সিলে যেতে চায়, সেটি ধর্মীয় সহনশীলতার অংশ, যা একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্রিটিশ মূল্যবোধ।” উদাহরণ হিসেবে তিনি জানান, ইংল্যান্ড চার্চের আদালত গির্জার সম্পত্তি ও যাজকদের অপরাধ সংক্রান্ত বিষয়ে কাজ করে। ইহুদি ধর্মীয় ট্রাইব্যুনাল ‘বেথ দীন’ স্বেচ্ছায় সালিশি পরিচালনা করে, আর রোমান ক্যাথলিক চার্চ আধ্যাত্মিক বিষয় ও বিয়ে বাতিলের মামলায় ট্রাইব্যুনাল চালায়।
এটাই প্রথম নয়, এর আগে বহুবার ট্রাম্প সাদিক খানকে আক্রমণ করেছেন। ২০১৯ সালে তিনি লন্ডনের মেয়রকে—যিনি ২০২৪ সালে টানা তৃতীয়বার নির্বাচিত হয়েছেন—“একেবারে পরাজিত লোক” বলে অভিহিত করেছিলেন। এর আগেও তিনি সাদিককে আইকিউ টেস্টের চ্যালেঞ্জ দেন এবং ২০১৭ সালের লন্ডন ব্রিজ হামলায় তার প্রতিক্রিয়ার সমালোচনা করেন।
গত জুলাইয়ে স্কটল্যান্ড সফরে ট্রাম্প সাদিককে “অভদ্র মানুষ” আখ্যা দেন এবং দাবি করেন তিনি “ভয়াবহ কাজ করেছেন।” তখন পাশে বসা ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টার্মার হস্তক্ষেপ করে বলেন, “তিনি কিন্তু আমার বন্ধু।” সূত্র: বিবিসি
মাহফুজ/