প্রায় এক দশক পরে, রাশিয়া ও চীনের বিরোধিতা সত্ত্বেও পশ্চিমারা তেহরানের ওপর চাপ বাড়াতে জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞাগুলো আবার কার্যকর করেছে। ২০১৫ সালের ইরানে পারমাণু চুক্তির ইউরোপীয় স্বাক্ষরকারীরা চুক্তিটির ‘‘স্ন্যাপব্যাক’’ প্রক্রিয়াটি সক্রিয় করার পরে রবিবার (২৮ সেপ্টেম্বর) মধ্যরাতে নিষেধাজ্ঞাগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে পুনর্বহাল হয়।
এই নিষেধাজ্ঞার মধ্যে রয়েছে অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা, সম্পদ জব্দ, ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা এবং পারমাণবিক, ক্ষেপণাস্ত্র ও ব্যাংকিং নিষেধাজ্ঞা, যা বিপর্যস্ত ইরানের অর্থনীতির সমস্ত ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর ফলে আগামী মাসগুলোতে দেশটির ৯ কোটিরও বেশি মানুষকে এর মূল্য দিতে হবে। এই নিষেধাজ্ঞাগুলি জাতিসংঘের সকল সদস্য রাষ্ট্রের জন্য বাধ্যতামূলক এবং বেসামরিক ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রয়োগ করা হবে।
যুদ্ধ এবং অর্থনৈতিক উদ্বেগ
অস্থির আঞ্চলিক পরিস্থিতির কারণে অনেকের আশঙ্কা যে ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্র আরও সামরিক হামলা চালাতে পারে। জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞাগুলো আবার কার্যকর হওয়ার ফলে ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের হামলাকে আরও বৈধতা দিতে পারে একারণে যে, দেশ দুটো হামলা করে এমন অজুহাত দিতে পারে যে ইরান পরমাণু অস্ত্র নিয়ে জাতিসংঘের বিধি-নিষেধ মানছে না। এই হামলা যেকোনো সময় হতে পারে। খোদ ইরানিরাও এই হামলার আশঙ্কা করছেন।
গত জুনে এই দুটি দেশ ১২ দিন ধরে ইরানের ওপর হামলা চালিয়েছিল, যাতে ১ হাজারেরও বেশি ইরানি প্রাণ হারিয়েছিল এবং বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হয়েছিল। সঙ্গে ইরানের শীর্ষ পরমাণু বিজ্ঞানী, অধ্যাপক ও বিপ্লবী গার্ডের (আইআরজিসি) শীর্ষ জেনারেলদেরকেও হত্যা করে ইসরায়েল। প্রাণে বেঁচে যান ইরানের রাষ্ট্রপতি মাসুদ পেজেসকিয়ান ও সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লা আলী খামেনি।
অনেক ইরানি উদ্বিগ্ন যে ইসরায়েল এই নিষেধাজ্ঞাগুলিকে আবার হামলা করার অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করতে পারে, যেমনটি তারা জুনে বৈশ্বিক পারমাণবিক নজরদারি সংস্থার জারি করা প্রস্তাবটিকে যুদ্ধের অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করেছিল, যা ইসরায়েলি কর্মকর্তা ও জনসাধারণের মধ্যে উল্লাস এনেছিল।
নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের বাজারে অর্থনৈতিক উদ্বেগ দেখা যায়। নিষেধাজ্ঞায় বিশ্ব থেকে ক্রমবর্ধমান বিচ্ছিন্নতা ইরানের অর্থনীতিকে পিছিয়ে দিতে পারে, যা ইতোমধ্যেই ভঙ্গুর।
সপ্তাহের দ্বিতীয় কার্যদিবসে তেহরানের খোলা বাজারে প্রতি ইউএস ডলারের বিপরীতে ইরানি রিয়াল প্রায় ১.৩ মিলিয়ন বা ১৩ লাখে লেনদেন হয়।
এই হার রিয়ালের জন্য একটি সর্বকালের সর্বনিম্ন রেকর্ড, যা ইউরোপীয় শক্তিগুলো এক মাস আগে স্ন্যাপব্যাক প্রক্রিয়া চালু করার সময় প্রতি ডলারের বিপরীতে ১.০৬ মিলিয়ন ছিল।
তেহরানের গ্র্যান্ড বাজারে চীনা আমদানিকৃত বৈদ্যুতিক মোটর বিক্রেতা ৩৫ বছর বয়সী রুজবেহ বলেন, ‘‘পরিস্থিতি মোটেও স্থিতিশীল মনে হচ্ছে না। গত কয়েক বছরের মতোই, ডলার বাড়ার কারণে আমদানিকৃত পণ্য আরও দামি ও দুষ্প্রাপ্য হয়ে উঠবে।’’
তেহরানের কট্টরপন্থীরা জাতিসংঘের এই নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহালে সন্তুষ্ট বলে মনে হচ্ছে, সম্ভবত এর অর্থ হলো সেই পারমাণবিক চুক্তির সমাপ্তি। তারা এক দশক ধরে এই পরমাণু চুক্তির তীব্র বিরোধিতা করে একে ‘‘সম্পূর্ণ ক্ষতি’’ বলে দাবি করেছিল।
গত সপ্তাহে ইরানের কট্টরপন্থী ৭০ জন এমপি অতি দ্রুত পরমাণু অস্ত্র তৈরির দাবি জানিয়ে ন্যাশনাল সুপ্রিম কাউন্সিলে চিঠি দিয়েছে। তারা চান না কোনোভাবে পশ্চিমাদের সঙ্গে পরমাণু বিষয়ে দেন-দরবার করতে।
ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের অতি-রক্ষণশীল সদস্য এবং দীর্ঘদিনের ব্যর্থ প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী সাঈদ জালিলি গত সপ্তাহে দেওয়া একটি বক্তৃতার ভিডিও অনলাইনে পোস্ট করেন, যেখানে তিনি পারমাণবিক চুক্তি এবং পশ্চিমের সাথে সম্পর্ক স্থাপনের নিন্দা করেন।
তিনি কীভাবে এটি করবেন তা উল্লেখ না করেই বলেন, ‘‘আজ আমাদের শত্রুর অতিরিক্ত দাবিগুলোকে নিষ্ক্রিয় করতে হবে এবং তার আরও হুমকি প্রতিরোধ করতে হবে।’’
ইরানের বিচার বিভাগ শনিবার এক বিবৃতিতে জানিয়েছে যে তারা স্ন্যাপব্যাকের খবর নিয়ে অনলাইন কার্যক্রমের ওপর নজর রাখছে এবং মিডিয়া আউটলেটগুলোকে সতর্ক করেছে যে তারা কোনো ধরনের লঙ্ঘন করলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তারা বলেছে, বেশ কিছু নাম প্রকাশ না করা ওয়েবসাইট ও টেলিগ্রাম চ্যানেলের বিরুদ্ধে ‘‘দাম বৃদ্ধি নিয়ে উস্কানিমূলক বিষয়বস্তু প্রকাশ করে সমাজের মনস্তাত্ত্বিক নিরাপত্তাকে ব্যাহত করার’’ অভিযোগে মামলা শুরু করা হয়েছে।
রবিবার ইরানি সংবাদপত্রগুলিতে জনগণের উদ্বেগ প্রতিফলিত হয়েছে। সংস্কারপন্থী শার্গ (Shargh) দৈনিক পারমাণবিক চুক্তির ‘‘মৃত্যু’’-তে ব্যাঙ্গাত্মক শোক প্রকাশ করেছে এবং দেশের বৃহত্তম অর্থনৈতিক দৈনিক দোনিয়া-এ-একতেসাদ (Donya-e-Eqtesad) উল্লেখ করেছে যে মুদ্রাস্ফীতি ৪০ শতাংশের বেশি হওয়ায় তা ২৮ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে।
কাইহান (Kayhan), যার প্রধান সম্পাদক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি কর্তৃক নিযুক্ত, পরিস্থিতিকে হালকা করার চেষ্টা করে দাবি করেছে। খামেনি গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যেকোনো ধরনের আলোচনার সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছেন।
‘স্ন্যাপব্যাক’ ব্যবস্থার অপব্যবহারের অভিযোগ
যৌথ সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা (JCPOA- Joint Comprehensive Plan of Action) নামে পরিচিত পারমাণবিক চুক্তির একটি অংশ ছিল স্ন্যাপব্যাক প্রক্রিয়া, যা নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার বিনিময়ে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ রাখতে কঠোর সীমা লঙ্ঘন করলে শাস্তিস্বরূপ তৈরি করা হয়েছিল।
ইরান, চীন এবং রাশিয়া যুক্তি দিচ্ছে যে পশ্চিমারা এই ব্যবস্থার অপব্যবহার করেছে—যা ১৮ অক্টোবর শেষ হওয়ার কথা ছিল। কারণ ২০১৮ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প JCPOA থেকে সরে যান এবং একতরফা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন, যখন ইরান চুক্তির প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিল।
তেহরান এর এক বছর পরে ধীরে ধীরে বিধিনিষেধগুলো লঙ্ঘন করতে শুরু করে, তবে দাবি করে যে তারা কখনই পারমাণবিক বোমা তৈরি করতে চাইবে না।
কয়েক বছর ধরে একাধিক পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপের পরে, ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ৬০ শতাংশে উন্নীত হয়েছিল—তবে ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্র তাদের হামলার অজুহাতে যেমন দাবি করেছিল, ইরান বোমা তৈরির কোনো চেষ্টা করেনি।
যুদ্ধের পর আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (IAEA)-কে বেশিরভাগ সাইটে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি, ফলে ইরানের উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের ভবিষ্যৎ এবং এর ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর সঠিক ক্ষতি এখনও অস্পষ্ট।
সংকট এড়ানোর প্রচেষ্টা
ইরানের ইসলামী প্রজাতন্ত্রকে কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে দুর্বল অবস্থায় দেখে এবং ইউক্রেন যুদ্ধের জন্য রাশিয়াকে ড্রোন সরবরাহের অভিযোগে, যুক্তরাষ্ট্র এবং তার তিন ইউরোপীয় মিত্র—ফ্রান্স, জার্মানি ও যুক্তরাজ্য (E3)—চাপ প্রয়োগ করেছে এবং ইরানের অন্তর্বর্তীকালীন বোঝাপড়ার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে।
স্ন্যাপব্যাক স্থগিত করার জন্য গত শুক্রবার চীন ও রাশিয়ার পক্ষ থেকে বারবার আহ্বান এবং জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে তাদের পক্ষ থেকে আনা শেষ মুহূর্তের ভোট-ও প্রত্যাখ্যান করা হয়েছিল।
জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রেডরিখ মার্জ জুন মাসে ইসরায়েল যখন ইরানে হামলা চালাচ্ছিল, তখন বলেছিলেন যে ইসরায়েল ইরানকে আক্রমণ করে পশ্চিমের স্বার্থে ‘‘নোংরা কাজ’’ করছে।
পশ্চিমারা একসময় যাকে ইরানের একজন বৈধ প্রতিনিধি হিসেবে স্বীকার করেনি, সেই আরাগচি (ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রী) রবিবার বলেছেন যে পশ্চিমা দেশগুলো কূটনীতিকে ‘‘কবর দিয়েছে’’ এবং নিপীড়ন বেছে নিয়েছে।
তিনি এক্স-এ জোর দিয়ে বলেন, বন্ধ হয়ে যাওয়া নিষেধাজ্ঞাগুলো পুনরুজ্জীবিত করা যায় না, এবং যোগ করেন যে ইরান মনে করে পারমাণবিক চুক্তির মূল ভিত্তি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের (UNSC) রেজোলিউশনটি পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী অক্টোবরে মেয়াদোত্তীর্ণ হবে।
চীন ও রাশিয়াও একই অবস্থানে ছিল বলে মনে হচ্ছে। এই তিনটি দেশ গত মাসে জোর দিয়েছিল যে এই পদক্ষেপের কোনো আইনি ভিত্তি নেই।
মস্কো শুক্রবার নিউ ইয়র্কে UNSC-এর বৈঠকে কঠোর বক্তব্য রেখেছিল, যেখানে তারা জানায় যে নিষেধাজ্ঞাগুলো পুনরুজ্জীবিত করার যেকোনো প্রচেষ্টা ‘‘বাতিল এবং অকার্যকর’’ এবং তারা জাতিসংঘ সচিবালয়ের সঙ্গে ‘‘তাদের সম্পর্ক গুরুত্বের সঙ্গে পুনর্বিবেচনা করবে’’ বলেও হুমকি দেয়।
গত বৃহস্পতিবার, রাশিয়া এবং ইরান ইরানে বেশ কয়েকটি পারমাণবিক বিদ্যুৎ চুল্লি তৈরির জন্য ২৫ বিলিয়ন ডলারের একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছে।
মার্কিন নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও চীন বছরের পর বছর ধরে ইরানি তেলের বৃহত্তম ক্রেতা থেকেছে এবং বিচ্ছিন্ন ইরানের কাছ থেকে বড় ছাড় উপভোগ করছে।
এখন দেখার বিষয়, এই দুটি বিশ্বশক্তি বা ইরানের সীমিত অন্য কোনো মিত্র দেশ ইরানের সঙ্গে বড় ধরনের লেনদেন করে জাতিসংঘের দ্বিতীয় পর্যায়ের নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকিতে নিজেদের ফেলবে কি না।
‘যুক্তরাষ্ট্রের নীতি, ইসরায়েলের হাতে অর্পিত’
তেহরান-ভিত্তিক সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের গবেষক আলি আকবর দারেইনি বলেছেন যে ইউরোপীয় এবং যুক্তরাষ্ট্র ‘‘চরম শত্রুতা দেখিয়েছে’’ এবং পারমাণবিক বিস্তার রোধ চুক্তি (NPT)-কে হত্যা করেছে।
তিনি সংবাদ মাধ্যম আল জাজিরাকে বলেন, ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের নীতি ইসরায়েলের হাতে অর্পণ করেছে।
আকবর দারেইনি বলেন, অতীতে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে জড়াতে অস্বীকৃতি জানালেও, খ্রিস্টান ধর্মপ্রচারক ও জায়নবাদীরা, যার মধ্যে ইসরায়েলে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূতও রয়েছেন, ট্রাম্পকে ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের আগ্রাসী যুদ্ধে যোগ দিতে রাজি করাতে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছেন।
তিনি বলেন, ইরান বছরের পর বছর ধরে যেভাবে নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে চলেছে, সেভাবেই কাজ করবে, তবে ইরানের কাছে অন্যান্য বিকল্পও রয়েছে, যেমন—IAEA-এর পারমাণবিক স্থাপনাগুলির পর্যবেক্ষণ বন্ধ করে দেওয়া, NPT থেকে বেরিয়ে যাওয়া, বা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাহার না করেই সমস্ত NPT প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন বন্ধ করা।
‘‘আমেরিকার প্রধান অগ্রাধিকার হলো চীনকে মোকাবিলা করা এবং নিয়ন্ত্রণে রাখা। তা করার আগে, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলকে শীর্ষে রেখে একটি নতুন আঞ্চলিক শৃঙ্খলার মধ্যে আনতে হবে। এর প্রধান বাধা হলো ইরান, তাই তারা তাদের লক্ষ্য অর্জনের জন্য ইরানকে দুর্বল ও অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে।’’ সূত্র: আল জাজিরা
মাহফুজ/